default-image

দুই দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেশের অর্থনীতির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের আশাবাদী করে তুলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশ্লেষণে বাংলাদেশের অর্থনীতি ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ১৯৭১ সালে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থা থেকে সাড়ে চার দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে যে অগ্রগতি সাধন করেছে, তা উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে এক দশক ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার গড়ে ৬ শতাংশের ওপরে রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরে প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ অতিক্রম করে ৮ শতাংশের 

কাছাকাছি পৌঁছেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, প্রবৃদ্ধির হারের এই ঊর্ধ্বগতির মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতির কিছু অন্তর্নিহিত সমস্যা আড়ালে পড়ে যাচ্ছে কি না। অন্য কথায় প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু উচ্চমাত্রার প্রবৃদ্ধির হারই বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো সমাধান করতে সক্ষম কি না। এ কথা উল্লেখ্য যে বাংলাদেশের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের অবস্থান থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠে যাবে। বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিভিন্ন দেশে যে ধরনের বাণিজ্য–সুবিধা পেয়ে থাকে, উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠে গেলে সেসব সুবিধা হারাবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অধীনে ২০৩০ সাল নাগাদ বেশ কিছু কঠিন অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর সঙ্গে লক্ষ্য রয়েছে ২০৩০ সাল নাগাদ একটি উচ্চ–মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত বিশ্বের কাতারে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ।

একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা দরকার,  উল্লিখিত লক্ষ্যগুলো অর্জন করা সহজ বিষয় নয়। সেগুলো অর্জন করতে হলে গতানুগতিক প্রক্রিয়ার বাইরে অসাধারণ কিছু প্রয়াসের প্রয়োজন হবে। কেন গতানুগতিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের পক্ষে ওই লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা সম্ভব নয়, বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য প্রবৃদ্ধির গুণগত মানের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে প্রবৃদ্ধির গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। দুটি বিষয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুণগত মানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রথমটি হচ্ছে কর্মসংস্থান এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে বৈষম্য। এটি উদ্বেগের বিষয় যে এক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঊর্ধ্বমুখী হওয়া সত্ত্বেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য বেশি নয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাপেক্ষে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে বেশ ধীরগতিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ ও ২০১৭ সালের মধ্যে যেখানে বার্ষিক গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৬ শতাংশ, সেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার মাত্র শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এ সময়ের মধ্যে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে প্রায় আট লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়ে থাকতে পারেন। এঁদের মধ্যে বেশির ভাগই নারী শ্রমিক। তৈরি পোশাক খাতে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে চলেছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও শ্রম প্রতিস্থাপক প্রযুক্তির কারণে পোশাক খাতে কর্মসংস্থান কমছে।

আরও একটি উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, যুব বেকারত্ব এবং যুব বয়সী একটি বিশালসংখ্যক জনগোষ্ঠী কোনো শিক্ষা, কাজ অথবা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। কয়েক বছরে শিক্ষিত যুব বেকারত্বের হার কমার বদলে বেড়েছে এবং এ পরিস্থিতি নানা রকম অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশের শ্রমবাজারে আরও একটি চ্যালেঞ্জ হলো বিশাল অনানুষ্ঠানিক খাতের উপস্থিতি, যা কর্মপরিবেশের মানের উন্নয়নে বড় ধরনের অন্তরায়। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) সাম্প্রতিক গবেষণায় এটা উঠে এসেছে যে আন্তর্জাতিক কর্মপরিবেশের
মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশে মাত্র ১০ শতাংশ কাজ শোভন কাজ। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আরও একটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণে একধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে এবং পোশাক খাত ছাড়া অন্য কোনো শিল্প খাতে এখনো বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিকের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়নি।

কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চালক ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ। বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশের বেশি ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ। এক দশকে পরিমাণের দিক থেকে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়লেও জিডিপির অনুপাতে এ খাতের বিনিয়োগ একধরনের স্থবির অবস্থায় রয়েছে। প্রবৃদ্ধির হার বাড়িয়ে দুই অঙ্কের ঘরে নিতে হলে বিনিয়োগের হার জিডিপির অনুপাতে বর্তমানে ৩১ শতাংশ থেকে প্রায় ৪০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। এর অর্থ হচ্ছে, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের হার জিডিপির অনুপাতে বিদ্যমান ২৩ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশের ওপরে নিতে হবে। এটা খুব বড় একটা চ্যালেঞ্জের বিষয়।

ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের স্থবিরতার বড় কারণ হলো অবকাঠামোগত সমস্যা, ঋণের প্রাপ্যতার অভাব, ঋণের উচ্চ সুদের হার, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক নীতির সংস্কারের অভাব। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ সহজে ব্যবসা করার সূচক বা ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ১৯০টি দেশের মধ্যে ১৭৬তম। বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত এবং ব্যবসার খরচের পরিমাণে বড় ধরনের হ্রাস ঘটাতে না পারলে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ানো সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দ্বিতীয় যে বিষয়টি প্রবৃদ্ধির গুণগত মানের সঙ্গে সম্পর্কিত, তা হলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য। গত এক দশকে অর্থনৈতিক সাফল্যের বিপরীতে আয়বৈষম্য বেড়েছে। সরকারি হিসাবেই আয়বৈষম্যের যে চিত্র সাম্প্রতিক সময়ে আমরা পাই, তা উদ্বেগের পর্যায়ে পৌঁছেছে। বৈষম্যের অর্থনৈতিক দিকটি যেমন প্রকট, সামাজিক দিকটিও ভয়াবহ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অধিকার ও সুযোগের ক্ষেত্রে বিশাল বৈষম্য বিদ্যমান। আঞ্চলিক বৈষম্যও বেড়েছে অনেক। সর্বশেষ খানার আয় ও ব্যয় নির্ধারণ জরিপে দেখা যায়, দারিদ্র্যের হারে অঞ্চলভেদে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। দেখা যাচ্ছে, উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে দারিদ্র্যের হার অনেক বেশি। এ কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সরকারি খরচের হার জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশে খুবই কম এবং পৃথিবীতে সবচেয়ে কম হারের দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই অবস্থায় বড় ধরনের আশু পরিবর্তন জরুরি। এ কথা অনস্বীকার্য যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে এত কম সরকারি খরচ করে ২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নয়।

সামনের দিনগুলোতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা আরও গতিশীল করা এবং প্রবৃদ্ধির সুফল সবার মধ্যে বণ্টনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সুশাসনের দৃশ্যমান উন্নতি প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাত, শেয়ারবাজার, কর অবকাঠামো এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

ড. সেলিম রায়হান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং ‘সানেম’-এর নির্বাহী পরিচালক


আরও পড়ুন... 

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0