default-image

জরুরি স্বাস্থ্যসেবাসংক্রান্ত সক্ষমতার সীমা যতটুকু, কোভিড-১৯-এর ভয়াবহতা তাকে ছাড়িয়ে গেছে বহু আগেই। অর্থনীতি, সামাজিক ও উন্নয়নসংশ্লিষ্ট ভবিষ্যতের প্রতিটি বিষয়ে এর ছাপ পড়তে যাচ্ছে। আমাদের তৎপরতা আরও দ্রুত হওয়া দরকার। দরকার কার্যকর সমন্বয় এবং গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার বুঝে জরুরি ক্ষেত্রে সহায়তা নিশ্চিত করা।

কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা বা জাতীয় ও বৈশ্বিক অর্থনীতি পর্যন্ত সব পর্যায়ে যথাযথ করণীয়টি ঠিক করে ফেলা দরকার। সামনের সারিতে থাকা কর্মী ও মালিকপক্ষের সঙ্গে সরকারের সামাজিক সংলাপ এ ক্ষেত্রে জরুরি। যেন ১৯৩০ সালের পুনরাবৃত্তি ২০২০ সালে এসে না হয়।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাবে, বিশ্বজুড়ে অন্তত আড়াই কোটি মানুষ বেকার হয়ে যাবেন। কর্মীদের আয় কমবে ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের মতো। অবশ্য যে কঠিন ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, তাতে বাস্তবতা আরও ভয়াবহ হতে পারে।

চলমান মহামারি বড় নির্দয়ভাবে আমাদের শ্রমবাজারের ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখিয়ে দিয়েছে। সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কমে গেছে কর্মঘণ্টা। চলছে কর্মী ছাঁটাই। বন্ধ হয়ে গেছে দোকানপাট, রেস্তোরাঁ। ফ্লাইট ও হোটেল বুকিং বাতিল। কাজকর্ম যা হচ্ছে, বেশির ভাগই ঘরে বসে। গোটা পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে অর্থনীতিতে ব্যাপক ধসের। পেশার ধরন যাঁদের আগে থেকেই অনিশ্চিত, চাকরি হারানোর তালিকায় তাঁরাই সবার আগে, যেমন বিক্রয়কর্মী, ওয়েটার, রাঁধুনি, কুলি-মজুর বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী।

আমরা এমন এক বিশ্বে বাস করি, যেখানে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন কেবল বেকার-ভাতার সুবিধা পান। সেখানে কর্মী ছাঁটাই মানে লাখ লাখ পরিবারের জন্য ব্যাপক বিপর্যয়ের অশনিসংকেত। সেবা খাত ও উৎপাদন খাতে যেসব কর্মী কাজ করেন, তাঁদের বেশির ভাগই সবেতন অসুস্থতার ছুটি পান না, কাজেই অসুস্থ হলেও তা উপেক্ষা করেই তাঁদের কাজে যোগ দিতে হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খণ্ডকালীন কর্মী, দিনমজুর ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের সব সময়ই প্রচণ্ড চাপ বা দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় জীবিকা নির্বাহ নিয়ে। আর এ কারণেই আমাদের প্রত্যেককেই এখন ভুগতে হবে। শুধু যে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়বে তা নয়, দীর্ঘ মেয়াদে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের চক্রটিও প্রসারিত হবে, সন্দেহ নেই।

এখন সরকারগুলো যদি ব্যবসা-বাণিজ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা, শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ কর্মীদের সুরক্ষার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, তাহলে হয়তো আমরা লাখ লাখ কর্মসংস্থান ও প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখার একটা সম্ভাবনা দেখতে পাই। সামনের দিনগুলোতে আমাদের সমাজ ও অর্থনীতি কতখানি সবল থাকবে, তার প্রায় পুরোটাই নির্ভর করছে তাদের এ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপে।

সদ্য সূচিত অর্থনৈতিক মন্দা যেন প্রলম্বিত হতে না পারে, সে জন্য দরকার একটি অভূতপূর্ব ও সম্প্রসারণযোগ্য অর্থ ও মুদ্রানীতি। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, এই দুর্যোগের সময়গুলো পার করার জন্য মানুষের পকেটে যেন পর্যাপ্ত অর্থ থাকে, যাতে ঠিকঠাক জীবিকা নির্বাহ করা যায়। এর অর্থ উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা, যারা লাখ লাখ কর্মসংস্থানের উৎস, তীব্র মন্দার সময়ও তাদের সুরক্ষা দিতে হবে, যাতে পরিস্থিতি ভালো হলে তারা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। যাঁরা আত্মকর্মসংস্থান, খণ্ডকালীন বা অস্থায়ী চাকরিতে যুক্ত এবং যাঁদের বেকার-ভাতা বা স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা নেই, এ ধরনের দুর্বল শ্রেণির মানুষের পাশেই সবার আগে দাঁড়াতে হবে।

বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো ভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী বক্ররেখার গ্রাফ টেনে সমান করার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমাদের কিন্তু নজর রাখতে হবে লাখ লাখ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর দিকে, যাঁদের বড় অংশ নারী, নিজের জীবন ও পরিবারের ওপর ঝুঁকি নিয়ে যাঁরা অকাতরে অসুস্থ মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। পরিবহন খাতের কর্মী, যাঁরা স্বাস্থ্যপণ্য ও জরুরি সামগ্রীর পরিবহন ও সরবরাহের কাজে নিয়োজিত, তাঁদের সুরক্ষার বিষয়টিও ভাবতে হবে। ঘরে বসে কাজ বা টেলি-ওয়ার্কিংয়ের ধারণাটি অবশ্য বর্তমানের সংকটকালে কর্মী ও কার্যক্রম সক্রিয় রাখতে নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে। তার পরও কাজের পরিধি নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বোঝাপড়াটা দরকার, কারণ বাড়িতে বসে কাজের পাশাপাশি বাচ্চা দেখাশোনা, বয়স্ক পরিচর্যা ও নিজের যত্নটাও গুরুত্বপূর্ণ।

অনেক দেশ এরই মধ্যে সমাজ ও অর্থনীতি চাঙা রাখতে নানা ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছে, যাতে কর্মী ও কর্মদাতা পর্যন্ত এক ধরনের অর্থপ্রবাহ তৈরি হয়। এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা বাড়াতে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের সঙ্গে সংলাপে যাওয়া ভালো, যাতে মানুষকে নিরাপদ রাখা ও কাজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাস্তবসম্মত পন্থা নেওয়া যায়।

এসব ব্যবস্থার মধ্যে থাকতে পারে মজুরি সহায়তা, ভর্তুকি, নিয়মিত কর্মীদের সাময়িক ছাঁটাইয়ের ক্ষতিপূরণ, আত্মকর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কর অবকাশ ও ব্যবসায়ীদের জন্য আর্থিক সহায়তা।

তবে আমাদের বর্তমান ত্রুটি যেহেতু বৈশ্বিক, কাজেই তাকে মোকাবিলার জন্য স্থানীয়ভাবে শক্ত পদক্ষেপের পাশাপাশি বহুপক্ষীয় সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচি অনেক বেশি কার্যক্ষম হওয়ার কথা। কোভিড-১৯ পরিস্থিতি গত ২৬ মার্চ জি-২০ গোষ্ঠীর যে নজিরবিহীন ভার্চ্যুয়াল সম্মেলনটি হলো, সেটি এ ধরনের উদ্যোগের প্রথম পদক্ষেপ বটে।

কঠিন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আমি আইএলও সংবিধানের একটি মূলনীতি উদ্ধৃত করতে চাই, ‘একটি অংশে দারিদ্র্য সর্বত্রই সমৃদ্ধিনাশের ঝুঁকি তৈরি করে।’ এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আগামী দিনগুলোতে আমরা বক্ররেখা নাকি সরলরেখায় অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করছি, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং আমাদের কর্মকাণ্ডে সবচেয়ে দুর্বল মানুষটি উপকৃত হয়েছে কি না, তা দিয়েই আমাদের সাফল্য-ব্যর্থতা নির্ণীত হবে।

গাই রাইডার: আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মহাপরিচালক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0