বিজ্ঞাপন

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি অভাবনীয় ঘটনা। একজন অতিরিক্ত সচিবকে জামালপুরে অবস্থিত বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ৮ মে প্রথম আলোর একটি সংবাদ শিরোনাম ছিল ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ পদে অতিরিক্ত সচিব নিয়োগে শিক্ষকদের ক্ষোভ’। খবরের ভাষ্য, ৫ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি নিয়োগ প্রজ্ঞাপন জারি করে। অবসরোত্তর ছুটিতে থাকা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবদুল মান্নান সেই প্রজ্ঞাপন দ্বারা চার বছরের জন্য কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য। তিনি অনুমোদন দেন। প্রজ্ঞাপনের ভাষ্য মোতাবেক, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ীই তাঁকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপনের বক্তব্যটিতে প্রচ্ছন্ন যে নিয়োগটি চর্চাসিদ্ধ বা নিয়মসিদ্ধ না হতে পারে, আইনসিদ্ধ তো হয়েছে।

নিয়োগটি নিয়ে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা অসন্তুষ্ট। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের উষ্মা প্রকাশ করেছেন। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতিও এ নিয়োগের প্রতিবাদ জানিয়েছে। বিবৃতিও নাকি দিয়েছে। শিক্ষক সমিতিগুলোর সিংহভাগই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সমর্থক শিক্ষকবৃন্দের সমষ্টি। সংগত কারণেই তাঁদের স্বর সুউচ্চ না হয়ে মিনমিনে হওয়ার কথা। শিক্ষকতা জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশই কাটিয়েছি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরে। এ কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হালচাল ও চালচিত্র সম্পর্কে খানিকটা ধারণা রাখি। সে আলোকে বলা যায় বর্তমান অস্বস্তি কারণ অন্যত্র। শিক্ষকদের কাছে এটা মর্যাদার প্রশ্ন। অধ্যাপক ও সচিব মনোনয়ন নিয়ে কয়েক বছর আগে তৈরি হওয়া অস্বস্তির বিষয়টিও তাঁদের স্মরণে আনতে হচ্ছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের বাতি নিবুনিবু। তবু ‘স্বায়ত্তশাসন’ শব্দটি শুনেই শিক্ষকদের বড় অংশ এখনো নিদারুণ আত্মতৃপ্তি বোধ করেন। শব্দটিতে খানিকটা স্বাধীন স্বাধীন ভাব-অনুভূতিও মেলে। এ কথা সত্য যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতা ও হালুয়া রুটির রাজনীতিসংশ্লিষ্ট অশিক্ষকসুলভ কর্মজীবীদের সংখ্যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। দুর্নীতি-অনিয়মও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। আবার এ কথাও সমান সত্য যে একদল নিবেদিতপ্রাণ প্রকৃত শিক্ষানুরাগীই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রাণভোমরা। তাঁদের অনেককে শিক্ষাদানে সততার পরাকাষ্ঠাও বলা চলে।

যত বিপদ-আপদ সব সাধারণত প্রকৃত শিক্ষকদের ঘাড়েই গিয়ে পড়ে। যেহেতু তাঁরা মণিকাঞ্চনযোগ এড়িয়ে শিক্ষাব্রতী থাকেন, তোষামোদের রাজনীতিতে থাকেন না, তাঁদের ন্যায্য কাজটুকুতে আমলাতান্ত্রিক প্যাঁচ লেগেই থাকে। ক্ষমতাবলয়ের কাছাকাছি শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সেবায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আমলাতন্ত্র এতটাই ব্যস্তসমস্ত থাকে যে তাঁদের ন্যায্য পাওনা, পদোন্নতি, ছুটিছাটা ইত্যাদি ফাইলপত্তর শামুকের গতিতে টেবিল টেবিল ঘোরে। অনেকে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণাকর্মগুলো পর্যন্ত চালিয়ে যেতে পারেন না। তাঁদের অনেকেই এ রকম নিয়োগকে অশনিসংকেত ভাবছেন। তাঁদের ভয় আমলাতন্ত্রের ফাঁস এবার দ্বিগুণ নয়, বহুগুণে গলায় চেপে বসবে। অভ্যন্তরীণ আমলাতন্ত্রের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক আমলাতন্ত্রের যৌথ খবরদারি বাড়বে। নজরদারিও বাড়বে। ঠকবে শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাধ্যমেই পূরণ হলে অন্তত সহকর্মীসুলভ যে সহায়তা মেলে, সেগুলোও কমবে।

বর্তমান নিয়োগটি অর্থ ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত, সরাসরি প্রশাসনসংক্রান্ত নয়। প্রকৃত শিক্ষাজীবীরা মনে করছেন, আমলাদের নিয়োগ মানে রাজনৈতিক সরকারের সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পড়া। নিয়োগ অর্থসংক্রান্ত, নাকি প্রশাসনসংক্রান্ত, সেটি বিষয় নয়। দুটিই ক্ষমতা ও আমলাতন্ত্র প্রয়োগের মোক্ষম জায়গা। তাঁদের প্রত্যাশা মোটেই এ রকম নয় যে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা দূর হবে। বরং তাঁরা ভয় পাচ্ছেন, এবার হয়তো নজরদারি আরও বাড়বে, রাজনৈতিক ভিন্নমতের মানুষদের চলাচলের ও মতপ্রকাশের গণ্ডি ছোট হতে আরও ছোটতর হয়ে আসবে। তবে তাঁরা বিশেষভাবে শঙ্কিত ‘প্রিসিডেন্স’ বা ‘পূর্বপ্রতিষ্ঠিত উদাহরণ’ বাড়তেই থাকবে আশঙ্কায়। শিক্ষকদের মানসিক চাপ শিক্ষাদান ব্যাহত করবে। ক্ষতি ছাত্রদের।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমলা নিয়োগের ঘটনা একেবারে নতুন নয়। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কোষাধ্যক্ষও একজন সাবেক অতিরিক্ত সচিব। বেসরকারি শিক্ষকনেতা, শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা এ রকম কিছু ব্যক্তির সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার উদাহরণ আছে। শিক্ষকদের অনেকেই মনে করছেন, শুরুতেই মেনে না নিলে হয়তো নিয়োগের ডালপালা গজানো বন্ধ থাকত। এমনও নয় যে ছাত্ররা শিক্ষকদের পক্ষ নেবে। শিক্ষকদের প্রতি ছাত্রছাত্রীদের সমর্থন তলানিমুখী। কৃতী শিক্ষকেরা বুঝতে পারছেন যে বিশ্ববিদ্যালয় নামের শিক্ষক-ছাত্র-কর্মজীবীদের একান্নবর্তী পরিবারটি ভেঙে খণ্ড খণ্ড হয়ে পড়ছে। শিক্ষকেরা সন্তানসম ছাত্রছাত্রীদের আস্থা ও সম্মান খুইয়ে বসেছেন।

আজকের লেখাটির উপসংহার টানতে গিয়ে বাংলাদেশের একটি নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রের ফেসবুক পোস্টকে উদ্ধৃত করব। ভাষ্যটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে ছাত্রদের মনোভাব বুঝতে কাজে লাগবে। পোস্টদাতার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ইচ্ছাকৃতভাবেই ঊহ্য রাখব। ছাত্রটি তাঁর নিজের বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে যা লিখেছেন, তা সামান্য সম্পাদনা করে লিখলে এ রকম দাঁড়ায়—‘… আগামী জুন মাসে ট্রেজারার ও প্রো-ভিসি প্রশাসন পদে নতুন মুখ আসতে যাচ্ছে। সরকারের প্রতি আবেদন দুজন আমলা নিয়োগ দিন। কারণ, আমি চাই শিক্ষকেরা ক্লাসে ফিরুক, পদে যাওয়ার জন্য ভোর রাতে মারামারি না করুক, যৌন নিপীড়নের কথিত অভিযোগ না সাজাক। আমি চাই আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা প্রশাসনিক পদ পাওয়ার জন্য ভিসির গেটের সামনে খাসির মাংস নিয়ে অপেক্ষা না করুক, আমি চাই আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা পদায়নের লোভে, নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ক্লাস বর্জন না করুক, ছাত্ররাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করুক, শিক্ষার্থীদের বাসায় ডেকে নিয়ে সালামির ভাগ না বসাক। শুধু প্রশাসনিক লোভনীয় পদের দৌড়াদৌড়ি বন্ধ হলেই শিক্ষকেরা অপরাজনীতি ছেড়ে ক্লাসে যাবে। গত পাঁচ বছরে যে তামাশা দেখেছি, তার প্রতিবাদে আমার কাছে এ ছাড়া আর ভিন্ন শব্দায়ন নেই।’

কতটা হতাশ হলে একজন ছাত্র নিজ প্রতিষ্ঠানেরই এমন চিত্র আঁকতে পারেন, সহজেই অনুমেয়। ছাত্রটির হতাশা প্রকাশকে অযৌক্তিক মনে করেন, এ রকম শিক্ষক এই সময়ে খুব কমই আছেন। শিক্ষকদের প্রশ্ন করার সময় এসেছে, কেন তাঁরা ছাত্রছাত্রীদের চোখে আর আদর্শ মানুষ নন। তাঁদের একদলের স্খলনের দায়ে প্রকৃত শিক্ষকদেরও কেন ছাত্রছাত্রীদের গড়পড়তা অসম্মানের বলি হতে হচ্ছে। তাঁদের উত্তরও বের করে আনা উচিত কেন আমজনতার প্রশ্ন হয়, বিশ্ববিদ্যালয় সারাবে কে?

ড. হেলাল মহিউদ্দীন অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান। সদস্য, সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন