মিনস্কে যুদ্ধবিরতি হলেও পূর্ব ইউক্রেনে শান্তি সমঝোতার বিষয়টি এখনো দূর অস্তই। ইউক্রেনের সাংবিধানিক সংস্কার, ইউক্রেন-রাশিয়া সীমান্তে কিয়েভের নিয়ন্ত্রণসহ ঐকমত্যের অধিকাংশ ধারাই হয়তো কোনো দিন বাস্তবায়িত হবে না। বেশির পক্ষে এটি আশা করা যায় যে এই দ্বন্দ্ব জমে বরফ হয়ে যাবে আর মানুষ মরাও বন্ধ হবে। কিন্তু সেটাও যে হবে, তা-ও নিশ্চিত নয়। কারণ, যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হওয়ার আগে বিরতিহীন যুদ্ধ চলছেই।
যুদ্ধবিরতি টিকে গেলে এটা হবে নতুনভাবে বিভাজিত ইউরোপের প্রথম আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা। এতে রাশিয়া পূর্বাঞ্চলে প্রায় একা হয়ে পড়বে। আর ইউরোপের বেশির ভাগ অংশ ইউক্রেনকে সমর্থন করছে। ডনবাসের দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলতে থাকলে এই বিভাজন আরও তীব্র হবে। এটা বন্ধ হলেও মীমাংসা হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এর মানে হচ্ছে, নিকট ভবিষ্যতে ইউরোপ মহাদেশের কোনো অভিন্ন নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে না। এক ও অভিন্ন মানদণ্ড ও আচরণের বিধান থাকবে না। সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে স্থিতিশীল মহাদেশ হচ্ছে ইউরোপ, সেখানেও বিশৃঙ্খলার অনুপ্রবেশ ঘটেছে।
ধারণা করা হচ্ছিল যে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও তেলের নিম্ন দামের কারণে ক্রেমলিনের নীতি বদলাবে বা ক্রেমলিন নিজেই বদলে যাবে, কিন্তু ঘটনাপ্রবাহে তার সত্যতা প্রতিপন্ন হয়নি। পুতিন এখনো অবাধ্য, অভিজাতেরাও তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি। আর রাশিয়ার জনগণ কঠিন অবস্থা পার করলেও তাঁর জনপ্রিয়তার পারদ রেকর্ড উচ্চতায় রয়েছে। ইউক্রেন সংকট চলতে থাকলে কী ঘটবে, তারা তা জানে। কিন্তু সেই দোষ তারা চাপায় কিয়েভ, ওয়াশিংটন ও পশ্চিমা নেতাদের ওপর। পুতিন, তা সে যুদ্ধনেতাই হোন বা শান্তিকামীই হোন, তাদের শিরোমণি।
মিনস্কে তিনি তাঁর ন্যূনতম লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছেন। মস্কোর প্ররোচনায় ডনবাসের বিদ্রোহীরা তাদের কাজ চালাচ্ছে, তাদের উৎখাতে কিয়েভ ব্যর্থ হয়েছে। যুদ্ধবিরতি চিরস্থায়ী হলে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র’ শারীরিকভাবে নিরাপদ হবে। আর ট্রান্সনিসত্রিয়ার আদলে সে নিজের রূপান্তর শুরু করতে পারে। রাশিয়ার অস্ত্র ও মানবিক সহায়তার চেয়ে বেশি কিছু পাঠাতে হবে। এতে রাশিয়ার সম্পদের ওপর আরও চাপ পড়বে। কিন্তু এর বিকল্প নেই বললেই চলে। পুতিন ও অধিকাংশ রুশের ক্ষেত্রে এরা ‘আমাদের জনগণ’।
তার পরও পুতিন রাশিয়ার আনুষ্ঠানিক অবস্থান আরও জোরালো করেছেন। তিনি বলেন, ডনবাস রাশিয়ার অংশ হয়েই থাক। এটা ছাড় নয়। আনুষ্ঠানিকভাবে একত্র ইউক্রেনের মধ্যে দোনেৎস্ক ও লুগানস্ক কিয়েভের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সুরক্ষিত কেন্দ্র হিসেবে দাঁড়াবে। দেশের বাকি অংশের পরিস্থিতি সায় দিলে তারা ডনবাসের বাইরেও তাদের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণ করতে পারে। আর যারা কিয়েভের ময়দানের জয়ে এক বছর পর নিজেদের সরকারের ব্যাপারে মোহভঙ্গ হয়েছে, তাদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে পারে। যে সরকার দুর্নীতিতে লাগাম দিতে ও সাধারণ ইউক্রেনীয় জনগণের জীবনমান উন্নত করতে পারেনি। দেশের পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধবিরতি টিকে গেলে ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সে কীভাবে সংস্কার ও জনপ্রিয় অসন্তোষ আমলে নেয়, তার ওপর।
রাশিয়া যত না ইউক্রেনকে হারিয়েছে, তার চেয়ে বেশি ইউরোপকে হারিয়েছে। কিছুদিন আগে জার্মান চ্যান্সেলর অাঙ্গেলা ম্যার্কেল ও প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কোইস হল্যান্ড যে রাশিয়া সফরে এলেন, এর ফলেই মিনস্কে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়। ইউরোপের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তরকালের স্থিতিশীলতার প্রধান কারণ হচ্ছে জার্মানি-রাশিয়া সম্পর্ক। এটা বিপজ্জনকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজনীতি প্রতিকূল আর ইতিহাস বিভেদকারী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৭০ বছর পর আজ নানা বিতর্কের সৃষ্টি হচ্ছে, কারণ পোল্যান্ড, বাল্টিক রাষ্ট্র ও ইউক্রেনের রাজনীতিকেরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের পরাজয়ে সোভিয়েতের ভূমিকা খাটো করার চেষ্টা করছেন। যারা স্তালিনের বিরুদ্ধে হিটলারের পক্ষাবলম্বন করেছিল, তাদের অব্যাহতি দেওয়ার কারণে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ এনেছে।
ফলে ইউক্রেন দ্বন্দ্বের কারণে রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে, গভীরতর হচ্ছে। রাশিয়ার সরকার আশা করে না যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘদিনের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। কিন্তু আগের মতো ব্যবসা-বাণিজ্য হবে, এটাও আশা করা কঠিন। পুতিন যে বছর পাঁচেক আগে ‘ডাবলিন থেকে ভ্লাদিভস্তক পর্যন্ত বৃহত্তর ইউরোপের’ ধারণা জার্মান ব্যবসায়ীদের খাওয়ানোর চেষ্টা করছিলেন, তার জায়গায় এখন তিনি চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছেন। ‘সাংহাই থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ’ পর্যন্ত বৃহত্তর এশিয়ার ধারণা এসেছে। পুতিন আগামী ৯ মে বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করবেন, সেদিন তাঁর সম্মানিত অতিথি হিসেবে থাকবেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। আর ওদিকে বারাক ওবামাসহ পশ্চিমা অন্য নেতারা এই অনুষ্ঠান বয়কট করবেন।
এটা পুরোটাই প্রতীকী ব্যাপার নয়। এটা নাটকীয় ব্যাপার। রাশিয়া গাজপ্রমের নিজস্ব প্রকল্প দ্য সাউথ স্ট্রিম ছেড়ে তুরস্কের মধ্য দিয়ে গ্রিক সীমান্ত পর্যন্ত একটি গ্যাসলাইন টানবে। এর মধ্য দিয়ে তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মিলবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য ও মার্কিন মিত্র তুরস্ক রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরেক মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া আরও নীরবে রাশিয়ার সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলছে। ওদিকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেও রাশিয়ার সঙ্গে স্বাভাবিক ও স্পন্দমান সম্পর্ক গড়ে তোলার আশা ছাড়েননি।
মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়া ইরান ও মিসরের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। আর ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখছে, সৌদি আরবের সঙ্গে দেনদরবার করছে। সিরিয়ায় তার অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি আর গোনার মধ্যে না-ই আনলাম। লাতিন আমেরিকা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাকিস্তান পর্যন্ত রাশিয়া খদ্দের খুঁজছে, তার নব পুনর্জীবিত সমরশিল্পের জন্য।
ইউক্রেন ভূরাজনৈতিক ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র নয়। দুনিয়ার ভবিষ্যতের ক্ষেত্রেও রাশিয়া মূল বিষয় নয়। তাকে কেন্দ্র করে যে ইউক্রেন ও বৈশ্বিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তা বিশ্বরাজনীতির এক নতুন ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়। পরাশক্তিগুলোর মধ্যে রাশিয়া প্রকাশ্যে ও চীন পরোক্ষভাবে মার্কিন প্রভাবিত বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। তুরস্ক থেকে ভারত ও জাপান পর্যন্ত জাতীয়তাবাদের উত্থানের কারণে এই ব্যবস্থার ক্ষত আরও গভীর হচ্ছে। আইএসকে অবমূল্যায়ন ও ধ্বংস করার প্রচেষ্টা শুধু আংশিক ও নড়বড়ে সাফল্য বয়ে এনেছে।
ইউরোপ মিত্র হিসেবে রাশিয়াকে হারিয়েছে, তার নতুন দায়িত্ব ইউক্রেন। ফলে সে এখন খাবি খাচ্ছে। জার্মানি ইউরোপীয় ইউনিয়নে যে নেতৃত্ব দিয়েছে, তা খুবই নগণ্য। কিন্তু কৌশলগত লক্ষ্য ও কীভাবে তা অর্জিত হবে, তা যথাযথভাবে আমলে নেওয়া হয়নি। ইউরোপ সিকি শতাব্দী ধরে স্থিতিশীলতা ও শান্তির দ্বীপ, বিশ্বদরবারে তার পুনরাবির্ভাব ঘটছে।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
দিমিত্রি ত্রেনিন: কার্নেগি মস্কো সেন্টারের পরিচালক

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন