বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধারের চেষ্টা
‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ স্লোগান গিয়ে নির্বাচনে জেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকাকে ‘গ্রেট’ তো করেনইনি, বরং তাঁর সময়ে আমেরিকা পৃথিবীর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং অন্য অনেক ক্ষেত্র থেকে নিজকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সরিয়ে নিয়েছিল। এর অনেকগুলোই দখল করে নিয়েছে মূলত চীন এবং কিছু ক্ষেত্রে রাশিয়া। জাতিসংঘের বিশেষায়িত ২০টি সংস্থার মধ্যে মাত্র দুটির প্রধান এখন মার্কিন আর পাঁচটির প্রধান চীনা নাগরিক।

ট্রাম্প আমেরিকাকে সরিয়ে নিয়েছিলেন প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনেসকো, জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা, ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি, এশিয়ার বেশ কিছু দেশের সঙ্গে ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ চুক্তি থেকে। এমনকি আমেরিকাকে তিনি ন্যাটো থেকে বের করে আনার কথাও বেশ কয়েকবার বলেছিলেন। ইউরোপে সৈন্যসংখ্যা কমিয়েছেন তিনি। এমনকি আমেরিকার অতি গুরুত্বপূর্ণ দুই মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে সৈন্য রাখার জন্য দ্বিগুণ বা চতুর্গুণ খরচ দাবি করেছিলেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই, ট্রাম্প যদি আমেরিকার চিরাচরিত পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে নাও আসতেন, তবু আমেরিকা বিশ্বব্যবস্থায় তার নেতৃত্ব পুরোপুরি নিরঙ্কুশভাবে ধরে রাখতে সমস্যায় পড়ত। উদীয়মান পরাশক্তি চীনের সঙ্গে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংঘাত হতো। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই জো বাইডেন আরও বেশি চ্যালেঞ্জে পড়েছেন, কারণ তিনি তাঁর আগের প্রেসিডেন্টের নীতির কারণে দৌড়টা শুরু করেছেন আরও পেছন থেকে।

জি-৭ এ বিকল্প অবকাঠামো তহবিল প্রস্তাব
নিশ্চিতভাবেই জো বাইডেনসহ জি-৭ নেতারা জানেন, চীন বিরাট অঙ্কের টাকা খরচ করে (চেকবুক ডিপ্লোমেসি) পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের নানা দেশের ওপরে তার প্রভাব তৈরি করছে। এ টাকা খরচ হচ্ছে মূলত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পে, যার মাধ্যমে পৃথিবীর অনেক দেশের মধ্যে এক যোগাযোগের নেটওয়ার্ক তৈরি করছে চীন।

আমেরিকার বর্তমান প্রশাসন যৌক্তিকভাবেই বুঝতে পেরেছে, পৃথিবীর বহু দেশ, বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলো চীনের এ প্রকল্প থেকে টাকা পাওয়ার জন্য চীনের প্রভাববলয়ে চলে যাচ্ছে। তাই তিনি এই জি-৭ সম্মেলনে একটি বিকল্প অবকাঠামো নির্মাণ ফান্ডের প্রস্তাব করেছেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে বিল্ড ব্যাক বেটার ওয়ার্ল্ড (সংক্ষেপে এটিকে বি৩ ডব্লিউ বলা হচ্ছে)।

এ ফান্ড ঘোষণা করার পরই হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত ফ্যাক্টশিটে বলা হচ্ছে, নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের একটা বড় অংশ মেটাতে চায় জি-৭। মূল্যবোধসম্পন্ন, উঁচু মানের এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এ অবকাঠামো উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, এই অবকাঠামোগুলো অর্থনৈতিকভাবে, পরিবেশগতভাবে এবং সামাজিকভাবে টেকসই হবে।

এ সম্মেলনের পর খুব ভাসা-ভাসাভাবে বলা হয়েছে, জি-৭-এর সরকারগুলো বেসরকারি খাতকে সঙ্গে নিয়ে এই প্রয়োজনীয় তহবিল নিশ্চিত করবে। কিন্তু কী পদ্ধতিতে সেটা হবে, কবে নাগাদ সেটা হবে, এ রকম আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়নি এখনো। আমেরিকা নিশ্চিতভাবেই অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আগের মতো শক্ত অবস্থানে নেই। জি-৭-এর অন্য দেশগুলোর অবস্থাও অনেক বেশি শক্তিশালী, তেমনটাও নয়। তাই এই ফান্ড আদতে কতটুকু কার্যকর হবে, চীনের ফান্ড এর কতটা বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে, সেই সমালোচনা খুব যৌক্তিকভাবেই আছে। তারপরও এই কলামের আলোচনার সুবিধার্থে ধরে নেওয়া যাক, এ ফান্ড তাঁরা সত্যিই জোগাড় করতে পেরেছেন। আলোচনার সুবিধার্থে এটাও ধরে নেওয়া যাক, ক্লায়েন্ট যেসব দেশ আছে, তাদের হাতে এখন চীন এবং জি-৭-এর অবকাঠামো উন্নয়নে ঋণের প্রস্তাব আছে। তাহলে তারা কোন ঋণটি নেবে? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য চীনা ঋণের চরিত্র জানা-বোঝা জরুরি।

চীনা ঋণের চরিত্র
চীন কীভাবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ঋণচুক্তি করে,সে সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা না থাকা বিশ্ব সম্প্রতি ‘হাউ চায়না লেন্ডস: আ রেয়ার লুক ইনটু হান্ড্রেড ডেট কন্ট্রাক্টস উইথ ফরেন গভর্নমেন্টস’ শিরোনামের একটি পেপারে অনেক কিছু জানতে পেরেছে। এখানে আফ্রিকা, এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, পূর্ব ইউরোপের ২৪টি দেশের সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর করা ১০০টি ঋণচুক্তির বিশ্লেষণ করেছেন পাঁচজন বিশেষজ্ঞ, যাঁদের মধ্যে আছেন আইন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিশেষজ্ঞ।

এ বিশ্লেষণে চীনা ঋণের যে চরিত্র তাঁদের সামনে আসে, তার মধ্যে তিনটি বৈশিষ্ট্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। ১. একই ধরনের অন্য যেকোনো বৈশ্বিক চুক্তির তুলনায় চীনা ঋণচুক্তিগুলোয় অনেক বেশি কঠোর এবং অনেক বেশি আওতার গোপনীয়তার শর্ত থাকে। চুক্তির বিস্তারিত, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঋণচুক্তি আছে, এমন তথ্য প্রকাশ না করার শর্ত থাকে। ২. চীনের ঋণদাতারা অন্য ঋণদাতাদের তুলনায় অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা চান। যেমন ঋণগ্রহীতা দেশে এমন অ্যাকাউন্ট থাকবে, যেটা ঋণদাতা পরিচালনা করবেন এবং চীনের দেওয়া ঋণে অন্য কোনো সমন্বিত উদ্যোগে (যেমন ‘প্যারিস ক্লাব’) রিস্ট্রাকচারিং করা যাবে না। ৩. এসব চুক্তির মধ্যে প্রকল্পের গতি বৃদ্ধি, স্থিতাবস্থা বজায় রাখা এবং বাতিল করার ক্ষেত্রে চীনের অনেক বেশি ক্ষমতা আছে, যা দিয়ে তারা ঋণগ্রহীতা দেশের অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক নীতি প্রভাবিত করার ক্ষমতা পায়।

চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের ‘ফ্ল্যাগশিপ’ প্রকল্প চায়না পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর (সিপিইসি) প্রকল্প নিয়ে যা হচ্ছে, সেটা আমাদের ওপরের আলোচিত বিষয়গুলোর পক্ষে যুক্তি দেবে। গত বছর পাকিস্তানের বাণিজ্য, শিল্প ও বিনিয়োগমন্ত্রী আবদুল রাজ্জাক দাউদ সিপিইসির প্রকল্পগুলো স্থগিত করে পর্যালোচনা কথা বলেছিলেন। কারণ হিসেবে তিনি তাঁদের পূর্বসূরি নওয়াজ শরিফ সরকারকে তীব্র সমালোচনা করে বলেছিলেন, চীনা কোম্পানিগুলোকে বিভিন্ন প্রকল্পে নানা ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অন্যায় সুবিধা দিয়েছিল সেই সরকার।

শুধু সেটাই নয়, আমরা অনেকেই জানি, চীনা ঋণ মূলত সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট। অর্থাৎ চীনা ঋণের খুব বড় একটা অংশ (ক্ষেত্রভেদে তিন-চতুর্থাংশ পর্যন্ত) ব্যয় করতে হয় চীন থেকে পণ্য ও সেবা কেনার জন্য। সিপিইসির প্রকল্পগুলোর নির্মাণসামগ্রীর প্রায় সবকিছু যেমন চীন থেকে আনা হয়, তেমনি হাজার হাজার চীনা সাধারণ শ্রমিক কাজ করেছেন প্রকল্পগুলোয়। একই প্রবণতা কিন্তু আমরা এখন বাংলাদেশেও দেখছি।

কোন দেশের ঋণ নেওয়া হবে তা ক্ষমতাসীন সরকারগুলো চরিত্র তুলে ধরে
সিপিইসি পশ্চিমে শেষ হয়েছে গোয়াদার গভীর সমুদ্রবন্দরে। স্বাধীনতার পর পাকিস্তান এই বন্দর উন্নয়নের জন্য পশ্চিমা ঋণ পায়নি, কারণ বেলুচিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা কারণে দেখা গিয়েছিল এই প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে না। কিন্তু চীন এই প্রকল্পে বড় বিনিয়োগ (৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) করেছে। পাকিস্তানের স্বার্থ কতটুকু পূর্ণ হবে, সে আলোচনা সরিয়ে রেখে এটা অন্তত এখন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে, এর মাধ্যমে পাকিস্তান হয়ে চীনের শিনজিয়াং প্রদেশে যুক্ত হয়ে একটা বিকল্প সমুদ্রপথ তৈরি হবে। চীনের সমুদ্র-বাণিজ্যের জন্য একটা ‘চোক পয়েন্ট’ সরু মালাক্কা প্রণালি বন্ধ করে দেওয়াজনিত নার্ভাসনেস অনেকটাই কাটবে এ প্রকল্পের মাধ্যমে।

অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে একেবারেই গভীর বন্দর হওয়ার উপযুক্ত ছিল না শ্রীলঙ্কার হামবানটোটা। কিন্তু সেখানে বন্দর হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত ঋণ শোধ করতে না পারার কারণে বন্দরটিকে চীনের কাছে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেওয়ার কথা আমরা জানি। জনগণের স্বার্থরক্ষা না হলেও এসব প্রকল্প সরকার তার কর্তাব্যক্তি এবং একটি গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করে। এভাবে চরম দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের সঙ্গে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অলাভজনক প্রকল্পেও চীন অর্থায়ন করে, যে ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশ কিংবা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংস্থাগুলো করে না। অর্থাৎ ‘বিশেষ’ কিছু সরকার হাতে ভিন্ন অপশন (জি-৭ ফান্ড) থাকলেও সেটা না নিয়ে চীনা ঋণ নিতেই আগ্রহী হবে।

চীনা প্রকল্পের প্রসার মানে চীনের পছন্দের সরকারব্যবস্থারও প্রসার
অবাধ চীনা বিনিয়োগের পরিণতির উদাহরণ দিতে গেলে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত একটি শহর হচ্ছে কম্বোডিয়ার সিহানুকভিল। চীনের প্রভাব সেখানার সরকার ও নির্বাচনী ব্যবস্থায় পড়েছে। তবে এর বাইরে যে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে যে দেশটিকে তুলে ধরতে চাই তা হচ্ছে, একেবারে গণতন্ত্রের উর্বর ভূমি, পশ্চিম ইউরোপের দেশ হাঙ্গেরি। দেশটির ক্ষমতায় আছেন প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান। কিছুদিন আগে যখন ইসরায়েল গাজায় হামলা চালাচ্ছিল এবং দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাতে চলছিল, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন সেখানে যুদ্ধবিরতির জন্য প্রস্তাব আনতে পারেনি। হংকংয়ে চীনের একটি আইন প্রয়োগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের ওপরে চালানোর নিপীড়নের পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন মানবাধিকার নিশ্চিতের আহ্বান জানানোর প্রস্তাব পাস করতে পারেনি। উভয় ক্ষেত্রেই ভেটো দেয় হাঙ্গেরি।

গত বেশ কয়েক বছরে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী নিজের প্রো-চাইনিজ পরিচয় নিয়ে মোটেও কুণ্ঠিত হননি। করোনার সময় হাঙ্গেরি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের একমাত্র দেশ, যে তার নাগরিকদের চীনের তৈরি করোনার টিকা দিয়েছে। এমনকি তার দেশেই চীনের সিনোফার্ম টিকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন।

সম্প্রতি বুদাপেস্টে চীনের সাংহাই ফুদান ইউনিভার্সিটির শাখা খোলা নিয়ে হাঙ্গেরি উত্তাল হয়ে উঠেছে। জনগণের প্রধান অভিযোগ হচ্ছে এই ক্যাম্পাস তৈরি হচ্ছে চীন থেকে পাওয়া দেড় বিলিয়ন ইউরো দিয়ে, কিন্তু এটি তৈরির সব উপাদান, এমনকি শ্রমিকও আসবে চীন থেকে, যা তাদের রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করছে না।

২০১০ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভিক্টর অরবান সাংবিধান এবং আইন অনেক ক্ষেত্রে এমনভাবে পরিবর্তন করেছেন, সেটা মানবাধিকারের ইউরোপীয় মানদণ্ডের সঙ্গে একেবারেই সাংঘর্ষিক। এলজিবিটি নিয়ে কঠোর আইন এর সাম্প্রতিকতম উদাহরণ। সার্বিক বিবেচনায় বলা যায়, হাঙ্গেরির বর্তমান সরকার ক্রমেই কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠছে।

আসলে এটাই হওয়ার কথা। কোনো পরাশক্তি আর কোনো দেশের সঙ্গে শুধু ব্যবসা করবে, রাজনীতি প্রভাবিত করতে চাইবে না, এটা বলা অর্বাচীনতা। চীনের প্রকল্পের অর্থায়নের যে ধরন, তাতে জবাবদিহিবিহীন কর্তৃত্বপরায়ণ সরকারই চীনের জন্য উপযোগী। তাই চীন চাইবে তেমন সরকারই আসুক দেশে দেশে। না, এটা কোনো চাপিয়ে দেওয়া মন্তব্য নয়, জবাবদিহিহীনতা কথা চীন হয়তো অস্বীকার করবে, কিন্তু কর্তৃত্বপরায়ণ একদলীয় সরকারের ব্যাপারে তাদের পরামর্শ একেবারে প্রকাশ্য।

দলীয় রাজনীতি থেকে বের হয়ে বাংলাদেশে বাড়তি সুযোগ পেতে পারে
শুরুতে চীনের সরকারি মুখপাত্র ‘গ্লোবাল টাইমস’-এ প্রকাশিত যে মতামতের কথা বলেছিলাম, তার শিরোনাম ছিল, বাংলাদেশ ক্যান আনলিশ মোর অপর্চুনিটি বাই ওভারকামিং পার্টিজান পলিটিকস। মানে দলীয় রাজনীতি থেকে বের হলে বাংলাদেশের জন্য বাড়তি সুযোগ তৈরি করতে পারে। এতে বাংলাদেশ গত এক দশকে অনেক উন্নতি করেছে বলে দাবি করে বলা হয়েছে, এটা হয়েছে শেখ হাসিনার সরকার টানা ক্ষমতায় থাকার কারণে।

পুরো লেখাটির মূল বক্তব্য হচ্ছে, যে ধরনের বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সারা পৃথিবীতে প্রচলিত, সেটা বাজে ব্যবস্থা। দাবি করা হয়েছে, এমনকি পশ্চিমা উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও গণতন্ত্র সঠিকভাবে চলছে না এবং সেটা জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে না। মতামতের উপসংহারে বাংলাদেশকে চীনের রোড ইনিশিয়েটিভের এক গুরুত্বপূর্ণ দেশ বলে স্মরণ করিয়ে বলা হয়েছে, সে সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে চীন। এ পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে তাদের নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব পরিহার করতে।

বিশ্বব্যবস্থায় চীনা প্রভাব কমানোর পথ
আমরা পছন্দ করি বা না করি, গত ১০০ বছরের মতো সামনের পৃথিবীও এক বা একাধিক দেশের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থায় চলবে, যার প্রভাব অনিবার্যভাবে পড়বে পৃথিবীর প্রতিটি কোনায়। আমাদের মতো ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশে তো পড়বেই।

চীনের নেতৃত্বাধীন (সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাশিয়ান পার্টনারশিপসহ) বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হওয়ার পথে মূল বাধা তৈরি করা সম্ভব এই দুটি দেশের শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপরীত ব্যবস্থা পৃথিবীতে রক্ষা এবং বিকশিত করার মাধ্যমে। কোনো সন্দেহ নেই, পৃথিবীতে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে তোলার চেষ্টা করা আমেরিকার কোনো চ্যারিটি না, এটা তারা করতে চাইবে তাদের হারানো সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়ার স্বার্থেই।

গত মার্কিন নির্বাচনে বাইডেনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল, ক্ষমতায় আসার প্রথম বছরেই একটি ‘বিশ্ব গণতন্ত্র সম্মেলন’ আয়োজন করবেন (সেটা করোনার কারণে পিছিয়ে গেছে)। এই সম্মেলনের তিনটি ঘোষিত উদ্দেশ্য—১. স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং কর্তৃত্বপরায়ণ সরকার প্রতিরোধ করা, ২. দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা, ৩. সব দেশে মানবাধিকার নিশ্চিত করা।

বিকল্প তহবিল তৈরি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বব্যাপী কর্তৃত্বপরায়ণ সরকারগুলোর ওপর সুষ্ঠু নির্বাচন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতের জোর চাপ তৈরি করে যাওয়া। একটা রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ সরকার ক্ষমতাসীন না থাকলে জি-৭-এর মূল্যবোধসম্পন্ন, উঁচু মানের, স্বচ্ছ, অর্থনৈতিকভাবে, পরিবেশগতভাবে এবং সামাজিকভাবে টেকসই’ তহবিল রেখে চীনা ফান্ডের দিকেই ছুটবে সবাই।

ডা. জাহেদ উর রহমান ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন