ডোনাল্ড ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্পছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার শুরু হয়ে গেছে। লক্ষণীয় হলো এখন পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা জো বাইডেন—কেউই তাঁদের প্রচার কার্যক্রমে নিজ নিজ সম্ভাব্য পররাষ্ট্রনীতির কথা উল্লেখ করছেন না, বরং অভ্যন্তরীণ ইস্যুকেই তাঁরা প্রাধান্য দিচ্ছেন। ভবিষ্যতে ইতিহাসবেত্তারা হয়তো প্রশ্ন তুলবেন, ট্রাম্পের সময়কালে কি বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে আমেরিকা মোড় পরিবর্তনকারীর ভূমিকা রেখেছিল নাকি তাঁর শাসনামলটি নেহাতই একটি মামুলি ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা ছিল।

এ প্রশ্নের জবাব এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, আগামী নির্বাচনে ট্রাম্প পুনর্নির্বাচিত হচ্ছেন কি না, আমরা কেউই তা জানি না।

আমার নিজের লেখা ডু মোরালস ম্যাটার? বইয়ে ১৯৪৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত হোয়াইট হাউসের গদিতে বসা ১৪ জন মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভূমিকা বিশ্লেষণ করে তাঁদের বিভিন্ন র‌্যাংকে বসানো হয়েছে। সংগত কারণেই ট্রাম্পের মূল্যায়নের জায়গায় ‘অসমাপ্ত’ কথাটি উল্লেখ করা হলেও র‌্যাঙ্কিংয়ে তিনি একেবারে নিচের দিকে রয়েছেন।

১৯৩০–এর দশকে বিশ্ব থেকে আমেরিকার বিচ্ছিন্ন থাকাটা যে ভুল ছিল, তা ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের মতো র‍্যাঙ্কিংয়ে ওপরের দিকে থাকা প্রেসিডেন্টরা বুঝতে পেরেছিলেন। সেই বোধ থেকে তাঁরা ১৯৪৫ সালের পর বিশ্বে একটি উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রচলন করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হ্যারি এস ট্রুম্যান যে যুদ্ধপরবর্তী মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি চালু করেছিলেন, তা আজও চালু আছে।

বিজ্ঞাপন
আগামী নির্বাচনে যদি ট্রাম্প পুনর্নির্বাচিত হয়ে যান, তাহলে এই পরিবর্তনের ধারা আরও গতি পাবে। সে ক্ষেত্রে পরবর্তী চার বছরে বিশ্বব্যবস্থায় একটি বিরাট পরিবর্তন আসবে, সেটি নিশ্চিত করে বলা যায়

১৯৪৮ সালে মার্শাল প্ল্যানের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ করেছিল। ১৯৪৯ সালে তারা ন্যাটো প্রতিষ্ঠা করে এবং জাতিসংঘ জোট বাহিনীর নেতৃত্ব দেয় যে বাহিনী ১৯৫০ সালে কোরিয়ায় লড়াই করেছিল। ১৯৬০ সালে ডুইট ডি আইজেনহাওয়ার ক্ষমতায় থাকাকালে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছিল।

বহু বছর ধরে আমেরিকানদের নিজেদের মধ্যে ভিয়েতনাম যুদ্ধ কিংবা ইরাক যুদ্ধের মতো বিষয়ে বিভক্তি ছিল। এক পক্ষ এসব যুদ্ধের পক্ষে, অন্য পক্ষ বিপক্ষে ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের উদার আন্তর্জাতিক নীতি ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে পর্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। ট্রাম্পই প্রথম প্রেসিডেন্ট, যিনি এই নীতিকে সরাসরি আক্রমণ করে বসেন। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশে হস্তক্ষেপের নীতি থেকে একেবারে সরে আসেন।

ট্রাম্পের বিদেশে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা তুলনামূলকভাবে জনপ্রিয়তা পেলেও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে তিনি যেভাবে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এবং বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়কে উপেক্ষা করেছেন, তাকে মোটা দাগে কেউই স্বাগত জানায়নি।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দেওয়া থেকে বিরত থেকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার নীতি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ২০১৪ সালে। ওই বছর ৪১ শতাংশ আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থে সরকারের মনোযোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিল। কিন্তু বরাবরই বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে আমেরিকার ভূমিকা রাখার পক্ষে মত দিয়ে এসেছেন অধিকাংশ আমেরিকান।

২০১৬ সালে ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি বলতে থাকেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদার পররাষ্ট্র ও অভিবাসন নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং আমেরিকান নাগরিকেরা চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি বলতে থাকেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ফি বছর কোটি কোটি ডলার বাইরের দেশ ও সংগঠনকে সহায়তা করতে হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিজের অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। ফলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে চান। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনতে থাকেন।

তাঁর সাবেক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা জন বোল্টন বলেছেন, ট্রাম্প দেশের স্বার্থ রক্ষার কথা বলে মূলত নিজের ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতির দিকে মন দিয়েছেন বেশি। এতে এত দিন ধরে চলে আসা বিশ্বব্যবস্থায় একটা বড় ঝাঁকুনি লেগেছে। বিশ্বরাজনীতিতে এর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যেসব জায়গা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে, সেসব শূন্যস্থান দখল করার জন্য অন্য পরাশক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। এতে বৈশ্বিক রাজনীতির আদল পরিবর্তিত হচ্ছে।

আগামী নির্বাচনে যদি ট্রাম্প পুনর্নির্বাচিত হয়ে যান, তাহলে এ পরিবর্তনের ধারা আরও গতি পাবে। সে ক্ষেত্রে পরবর্তী চার বছরে বিশ্বব্যবস্থায় একটি বিরাট পরিবর্তন আসবে, সেটি নিশ্চিত করে বলা যায়।

ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

জোসেফ এস নাইয়ে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও লেখক।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন