default-image

জনসংখ্যার বিচারে বিহার ভারতের তৃতীয় বড় রাজ্য। ১০ কোটির বেশি মানুষ এখানে। দেশের জনসংখ্যার ১৩ ভাগের ১ ভাগ হবে সেটা। হিন্দুধর্মের সব জাতের মানুষ আছে বিহারে বড় অঙ্কে। আছে অনেক মুসলমান এবং আদিবাসী। বিহার তাই পুরো ভারতের রাজনৈতিক মনোভাব বোঝার জন্য আদর্শস্থানীয়।

মহামারি ভারতের সমাজজীবনকে প্রায় ওলটপালট করে দিয়েছে। সোয়া লাখ ছাড়িয়েছে মৃত্যু। মহামারির মধ্যেই ভারতে প্রথমবারের মতো বড় নির্বাচন হলো বিহারে। সংগত কারণেই এর ফলাফল পুরো ভারতের জন্য এবং ভারতের সব প্রতিবেশীর জন্যও অনেক বার্তাবহ।

বিজেপি এগিয়ে; কাছাকাছি লালুর জনতা দল

বিহারে বিধানসভায় মোট সদস্য থাকেন ২৪৩ জন। এ লেখা তৈরির সময় কেন্দ্র ও রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি ও নীতিশ কুমারের ‘ঐক্যবদ্ধ জনতা দল’-এর জোট এগিয়ে আছে ১৩০ আসনে। রাষ্ট্রীয় জনতা দল, কংগ্রেস ও বামদের ‘মহাজোট’ এগিয়ে আছে ১০১ আসনে। ফলাফল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, তা স্পষ্ট।

কংগ্রেসকে ভরসা করতে পারছেন না ভোটাররা

গত বিধানসভা নির্বাচনে এককভাবে রাষ্ট্রীয় জনতা দল পায় ৮০ আসন, নীতিশের ঐক্যবদ্ধ জনতা দল ৭১, বিজেপি ৫৩, কংগ্রেস ২৭ ও বামপন্থীরা ৩টি আসন পায়। ছোট ছোট আরও কয়েকটি দল ১/২টি করে আসন পায়।

এবার বিজেপি গতবারের চেয়ে ভালো করেছে। প্রবণতা বলছে, তারা এককভাবে বড় দলের আসন পাবে এখানে। রাষ্ট্রীয় জনতা দলকে গতবারের কাছাকাছি আসন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকতে হতে পারে। তবে তাদের মিত্র বামরা গতবারের চেয়ে অনেক ভালো করেছে। তারা ১২টি আসনে এগিয়ে। কংগ্রেসের প্রতি জনতার আস্থা মোটেই বাড়েনি। ৭০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তারা মাত্র ২১টিতে এগিয়ে। মূলত তাদের কারণেই বিরোধী জোট প্রত্যাশামতো জয় পাচ্ছে না।

পাশাপাশি খারাপ করতে চলেছে বিজেপিমিত্র নীতিশ কুমারের ঐক্যবদ্ধ জনতা দল। আপাতত নীতিশের দলের বিপর্যয়ই বিহারের বড় খবর।

পাঁচ বছর আগের ফলের সঙ্গে তুলনা করলে স্পষ্ট, বিহারের মানুষ নীতিশ কুমারের ওপর নাখোশ। তবে তাঁর প্রধান সহযোগী বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করছেন না তাঁরা।

বিজ্ঞাপন

নীতিশের মুখ্যমন্ত্রী থাকা অনিশ্চিত

নির্বাচনের তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ফল কী হবে, সেটা এখনই বলা মুশকিল। ভারতে নির্বাচনী ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে এখন আর সরকার গঠন হয় না। বিগত কয়েকটি রাজ্য নির্বাচন শেষে দেখা গেছে, নির্বাচনের পরই বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের কেনাবেচা শুরু হয়। বিজেপি এই সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিয়েছে দেশজুড়ে মহামারির মতো। এমএলএ কেনাবেচার বড় এক শিকার কংগ্রেস। মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানসহ অনেকগুলো রাজ্যে তাদের দল এমএলএদের কেনাবেচা থেকে রক্ষা করতে না পেরে রাজ্যে সরকার গঠনে ঝামেলায় পড়েছে। বিহারেও সেটা হতে পারে। ফলাফল যেহেতু প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেহারা নিচ্ছে এবং যেহেতু এখানে দুপক্ষ মানে মূলত দুটি জোট, সে কারণে ছোট দলগুলোর এমএলএরা কেনাবেচার মুখে পড়তে পারেন। তাতে সরকার গঠনের সমীকরণও পাল্টে যেতে পারে। কংগ্রেস ইতিমধ্যে তাদের সব প্রার্থীকে রাজধানী পাটনায় হোটেলে দল বেঁধে অবস্থান করতে বলে রেখেছে। তেজস্বী যাদবকেও তাই করতে হবে।

এককভাবে বেশি আসন পেলে বিজেপি আবারও জোটমিত্র নীতিশ কুমারকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেবে কি না, সেটা নিশ্চিত নয়। বরং জোটে বেশি আসন পাওয়ার দাবিতে বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর পদ দাবি করবে। সে রকম সম্ভাবনাই প্রবল।

এর মধ্যে তৃতীয় একটা শঙ্কাও আছে। বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর পদ দাবি করলে নীতিশের দল জোট থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। তখন সরকার গঠনের গতানুগতিক বিবেচনা পাল্টে যাবে। তৃতীয় কাউকে সামনে রেখেও নতুন সরকার গড়ে উঠতে পারে। বিজেপিকে ঠেকাতে মহাজোটের সঙ্গে নীতিশের সমঝোতা হয়ে যেতে পারে।

মোদির আবেদন এখনো বর্তমান

বিহারের রাজনীতির প্রধান চরিত্র নীতিশ কুমার ও লালু প্রসাদ যাদব। এই নির্বাচনে স্থানীয় ভোটাররা প্রাথমিকভাবে তাঁদেরই মূল্যায়ন করেছেন। তবে কেন্দ্রীয় প্রচারমাধ্যমগুলো নির্বাচনী ফলকে নিতীশ কুমারের সঙ্গে লেপটে দিয়েছে। কিন্তু জনমত এও বলছে, বিজেপির জনপ্রিয়তা লোকসভা নির্বাচনের সময়ের মতো আর একচেটিয়া নেই।

নিতীশ কুমারের সরকার এত দিন বিজেপির ওপর ভর করেই রাজ্যের ক্ষমতায় টিকে ছিল। নিতীশের দল কেন্দ্রে বিজেপি জোটেরও বড় শরিক। গত লোকসভা নির্বাচনে বিহারে ৪০ আসনের মধ্যে ৩৯টিই পায় বিজেপি-নীতিশ জোট। তখন বলা হয়েছিল, নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তার কারণে এই ফল। সেটা সত্য হলে এবারের নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে এও বলতে হয়, মোদি ঢেউ আর প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করতে পারছে না। তবে সেই ঢেউ এখনো আবেদনময়।

প্রায় ১৫ বছর ধরে নীতিশ কুমার ক্ষমতায়। তিন মেয়াদে মুখ্যমন্ত্রী থাকলেন তিনি। ভোটাররা যে তাঁকে নিয়ে ক্লান্ত ছিলেন, সেটাও বোঝা গেল নির্বাচনে। কেন্দ্রের প্রতি পুরো নাখোশ না হলেও বিজেপির স্থানীয় শরিকের পক্ষে নেই বিহার।

নির্বাচনের সর্বশেষ ফল থেকে এও স্পষ্ট কারাবন্দী লালু যাদব নির্বাচনে অংশ নিতে ব্যর্থ হলেও ভোটারদের কাছে তাঁর আবেদন ম্লান হয়নি। বিশেষ করে যাদব ও মুসলমানরা এখনো তাঁকে পছন্দ করে বলেই মনে হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বিহার থেকে

দক্ষিণ এশিয়া এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন থেকে মনোযোগ সরাতে পারেনি। ওই নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ এখনো শেষ হয়নি। এর মধ্যেই বিহারের রায় প্রকাশ পেল।

অর্থনৈতিকভাবে অতি পিছিয়ে থাকা কিন্তু রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর জনপদ বিহারের নির্বাচনের গুরুত্ব দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বহুমাত্রিক।

বিজেপির প্রতি ভারতবাসীর মনোভাব নতুন করে বুঝতে আগ্রহী ছিল আশপাশের সব দেশ। ভূরাজনীতি তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে ভারতের সঙ্গে। তারা এখন ভবিষ্যৎ ভারতের রাজনৈতিক ছবিটি নতুন করে আঁচ করতে পারবে। মোদি আর বিজেপির সঙ্গেই সবাইকে বোঝাপড়া বাড়াতে হবে।

আগামী মার্চ-এপ্রিলে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন হবে। বিহারের সীমান্ত জনপদ পশ্চিমবঙ্গ। বিহারের নির্বাচনের সরাসরি প্রভাব পড়বে পশ্চিমবঙ্গে। বিজেপি যে এ রাজ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলবে, সেটা বোঝা যাচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বরাবরই বাংলাদেশকে একটা প্রসঙ্গ করে তোলা হয়। এই সূত্রে বিহারের নির্বাচনের ফল বাংলাদেশের জন্যও তাৎপর্যবহ।

জাত-পাত-ধর্মের হিসাব বাদ দিচ্ছে না মানুষ

বিহারে বছরের এই সময়টা উৎসবের সময়। দুর্গাপূজা, দিওয়ালি, নবরাত্রি, মিলাদুন্নবী (সা.) প্রভৃতি হরেক পর্ব থাকে অক্টোবর-নভেম্বরে। কিন্তু এবার মানুষের মনে শান্তি ছিল না। বন্যা ও করোনায় চরম মন্দার শিকার রাজ্যের অর্থনীতি।

নির্বাচনেও প্রধান ইস্যু ছিল বেকারি। নীতিশ ও বিজেপির এত দিনকার ‘উন্নয়ন’-এর প্রচারণা যে আগের মতো আর এককভাবে কাজ করছে না, বিহার তার প্রমাণ। তরুণেরা কাজ খুঁজছেন। যাদব ও কংগ্রেসের জোট বলেছিল, তারা আগামী ৫ বছরে ১০ লাখ মানুষের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করবে। তাদের এই আওয়াজও ভোটাররা লুফে নেননি।

বিহারের ভোটারদের প্রায় ৫০ ভাগ ৪০ বছরের কম বয়সী। এঁদের কাছে ভালো মজুরির কাজের চেয়ে আর অধিক পছন্দনীয় কিছু নেই এ মুহূর্তে। সম্ভবত একই অবস্থা ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও এবং ভারতের পাশের দেশগুলোতেও।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশে মহামারিজনিত অর্থনৈতিক মন্দা যাচ্ছে। সর্বত্র বেকারত্ব বেড়েছে কয়েক গুণ। বিহারে এর তীব্রতা অনেক বেশি। মহামারির শুরুতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে কয়েক লাখ বিহারি শ্রমিককে নিজ রাজ্যে ফিরতে হয় খুবই অল্প সময়ের নোটিশে, অবমাননাকর অবস্থার শিকার হয়ে। নির্বাচনে এসবের প্রভাব পড়েছে। কিন্তু মানুষ জাত-পাত ও ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতির বাইরে আসছে না। সেটাও ধরা পড়ল নির্বাচনী ফল থেকে। পুরো দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিবিদদের জন্যই বিহার থেকে এটা এক বড় বার্তা। জাতীয় কংগ্রেস বিজেপির বিপরীতে ভারতীয়দের কাছে যে আবেদন তৈরি করতে পারছে না, সেটাও আবার মোটাদাগে ধরা পড়ল।

তবু আস্থা নির্বাচনে

কোভিডের মধ্যেও বিহারে এবার ভোট পড়েছে ২০১৫ সালের চেয়ে বেশি, প্রায় ৫৭ ভাগ। তথ্যটি প্রমাণ করে দক্ষিণ এশিয়ার দরিদ্র মানুষ ভাগ্য পরিবর্তনের রাজনৈতিক উপায় হিসেবে ভোট ব্যবস্থাকে এখনো গুরুত্ব দিচ্ছে। ব্যাপক প্রত্যাশা তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি। কিন্তু চলতি ভোট ব্যবস্থার মাধ্যমে পাওয়া প্রতিনিধিরা এত দিন সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছেন সামান্যই। ৩ হাজার ৭৫৫ জন প্রার্থীর মধ্য থেকে নির্বাচিত হয়ে আসা বিহারের নতুন ২৪৩ এমএলএ কি পুরোনো বাস্তবতা বদলাতে পারবেন?

আলতাফ পারভেজ দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0