বিহারের নির্বাচনে মানুষ ভোট দিয়েছে তাদের দৈনন্দিন জীবনের দাবি–দাওয়ার পক্ষে
বিহারের নির্বাচনে মানুষ ভোট দিয়েছে তাদের দৈনন্দিন জীবনের দাবি–দাওয়ার পক্ষেছবি এএফপি

বিহারের নির্বাচনে আসলে কেউ জেতেনি। জিতেছে জনজীবনের অ্যাজেন্ডা। জনগণের জ্বলন্ত ইস্যু। রুটিরুজি। কামাই, পধাই, দাওয়াই, সিচাই। কাজ, শিক্ষা, ওষুধ, সেচের জরুরি দাবি।

প্রতিদ্বন্দ্বী দুই জোটের উভয়ের পক্ষেই সমর্থনের হার এক। ৩৭ শতাংশ। দশমিকে ধরলে ভোট শতাংশের হিসাবে ব্যবধান মাত্র শূন্য দশমিক ০৩ শতাংশ। আর সংখ্যার হিসাবে রাজ্যের ৩ দশমিক ১৪ কোটি ভোটারের মধ্যে মোদির এনডিএ থেকে লালু-পুত্র তেজস্বীর ‘মহাগঠবন্ধন’ (মহাজোট) পিছিয়ে মাত্র ১২ হাজার ভোটে।

২৪৩ আসনের বিহার বিধানসভায় একক বৃহত্তম দল বিজেপি কিংবা নীতিশ কুমারের জেডি (ইউ) নয়। তেজস্বী যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি)। আসনসংখ্যা ৭৫, যেখানে বিজেপি জিতেছে ৭৪টি আসনে। একক দল হিসেবেও সমর্থনের পাল্লা ভারী আরজেডির দিকে। ২৩ দশমিক ১ শতাংশ, যেখানে বিজেপির পক্ষে সাকল্যে ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ। জোটসঙ্গী জেডির (ইউ) আরও কম, ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
সরকার গড়ার জন্য ‘ম্যাজিক ফিগার’ ১২২ থেকে মাত্র তিনটি আসন বেশি পেয়েছে এনডিএ।

বিপরীতে মহাজোট পেয়েছে ১১০টি আসন। তাক লাগিয়ে দেওয়া ফল করেছে মহাজোটের শরিক বামপন্থীরা। ২৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিতেছে ১৬টি আসনে। সিপিআই (এমএল-লিবারেশন) পেয়েছে ১২টি আসন। সিপিআই (এম) এবং সিপিআই জিতেছে দুটি করে আসনে। বেড়েছে সমর্থনের হার। প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য বামপন্থীরা চেয়েছিলেন ৫০টি আসন। দেওয়া হয়নি। বামপন্থীদের আরও আসন দেওয়া হলে এতক্ষণে মহাজোটের সরকার হয়ে যেত।

বিজ্ঞাপন

গত বছরের লোকসভা নির্বাচন কিংবা পাঁচ বছর আগের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় বিজেপির সমর্থনের হার কমেছে ৪-৫ শতাংশ। কমেছে নীতিশের দলেরও। বেড়েছে আরজেডির। গত লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। তবু মাত্র ৪৩টি আসনে জিতে (গতবার ছিল ৭১) আবার মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন ‘বিহারের চাণক্য’ নীতিশ কুমার। আগামী পাঁচ বছর যে বোঝা বইতে হবে বিজেপিকে।

পাটিগণিত জিতিয়ে দিলেও এ আসলেই মোদি-নীতিশের রাজনৈতিক পরাজয়। অথচ এক মাস আগেও কেউ ভাবেনি এমন ফল হবে। বামপন্থীরাই তৈরি করে দিয়েছেন বিকল্পের অ্যাজেন্ডা। জাতপাত, ধর্মের মেরুকরণ নয়। জনজীবনের ‘পরিবর্তনের জন্য প্রতিশ্রুতি’র ২৫ দফা সনদ। তুলে এনেছেন চাকরি, সম–কাজে সম–মজুরি, অধিকার এবং মর্যাদার প্রশ্ন। অচিরেই তা হয়ে উঠেছে মানুষের দাবি। গ্রামগঞ্জের চা-দোকান থেকে শহরের আড্ডার আলোচনার একমাত্র ইস্যু।

স্বাভাবিক। বিহারে এই মুহূর্তে কর্মসংস্থানের হার মাত্র ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ। মানে প্রতি তিনজনের মধ্যে কাজ আছে একজনের। বাকি দুজনই বেকার। সেপ্টেম্বর মাসের এই তথ্য শুনিয়েছে সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি (সিএমআইই)।
সে কারণে মহাজোট যখন মুখ্যত শূন্য পড়ে থাকা সরকারি পদগুলো পূরণের মাধ্যমে ১০ লাখ চাকরি সুনিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়, তখন তা হয়ে ওঠে মানুষের দাবি। আলোচনার অ্যাজেন্ডা। এনডিএ নেতারা বুঝে উঠতে পারেননি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন। সুশীল মোদি থেকে নীতিশ কুমার বিদ্রূপ করতে শুরু করেন। কিন্তু বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এর গুরুত্ব বোঝেন। দলের ইশতেহারের ১৯ লাখ কাজের প্রতিশ্রুতি দেন।


করোনা বেআব্রু করেছে পরিযায়ী শ্রমিকের সমস্যাকে। জুন মাসে শহরগুলো থেকে ৬৭ লাখ পরিযায়ী ফিরেছেন দেশের ছটি রাজ্যের ১১৬টি জেলায়। এর মধ্যে ৪৪ লাখ, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ফিরেছেন ৫৩টি জেলায়। প্রথম ছয় রাজ্যের মধ্যে শীর্ষে নীতিশের রাজ্য। ২৩ দশমিক ৬ লাখ পরিযায়ী শ্রমিক ফিরেছেন বিহারের ৩২টি জেলায়। দ্বিতীয় উত্তর প্রদেশ, ১৪ দশমিক ৪৮ লাখ।

অন্য একটি তথ্য বলছে, বিহারে ফেরা এই পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ৩২ লাখ। এই সংখ্যাকে গড়পড়তা বিহারি পরিবারকে (৫ দশমিক ৫) দিয়ে গুণ করলে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৭৬ কোটি। বিহারের ১০ দশমিক ৩৭ কোটি জনসংখ্যার (সেনসাস ২০১১) প্রায় ১৭ শতাংশ।

চার ঘণ্টার নোটিশে মোদির লকডাউন ঘোষণার সময় থেকে রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রশ্নে নীতিশ ছিলেন নির্বিকার। ব্যালটে মানুষ সেই ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। এই সমস্যার জন্য তাঁরা মোদির দিকে আঙুল তুললেও মুখ্যত দায়ী করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে। নীতিশ চওড়া রাস্তা করেছেন। পানি, ইলেকট্রিসিটির ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু সেই রাস্তা গিয়ে মেশেনি শিল্পাঞ্চলে।

রক্তশূন্য কৃষি। গ্রাম-শহরের গরিব খেতমজুর, বেকার যুবক তাই কাজের খোঁজে ভিনরাজ্যে। বিজেপি-নীতিশের দেড় দশকে বিহারে মাথাপিছু বার্ষিক আয় ৩১ হাজার ২৮৭ টাকা, জাতীয় গড়ের এক-তৃতীয়াশ। সাক্ষরতার হার নিচের দিক থেকে ৩ নম্বরে। ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে দেশের মধ্যে রাজ্যের অংশ মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ। মহামারির অনেক আগেই, ২০১৮-১৯–এর শ্রমশক্তির সমীক্ষায় বিহারে বেকারত্বের হার ছিল ১০ দশমিক ২ শতাংশ, জাতীয় গড়ের (৫ দশমিক ৬ শতাংশ) প্রায় দ্বিগুণ।

বিজ্ঞাপন

মহাজোটের বিকল্পের অ্যাজেন্ডা তাই সহজেই মানুষের মনে ধরেছে। শুধু বিরোধিতা নয়, বিকল্পের নির্দিষ্ট অ্যাজেন্ডা উপস্থিত করেছে মহাজোট। মানুষের মনে হয়নি আকাশকুসুম, অলীক স্বপ্ন। মনে হয়েছে বাস্তব দাবি। আদায়যোগ্য দাবি। নেতিবাচক নয়, ইতিবাচক প্রচার মানুষের মন কেড়েছে। তাই তেজস্বীসহ মহাজোটের সব সভায় ভিড় উপচে পড়েছে।

বিজেপি ইশতেহারে ভ্যাকসিনের বিনিময়ে ভোট চেয়েছে। বিহারবাসীকে বিনা মূল্যে কোভিডের টিকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী যখন বিধানসভা নির্বাচনের এই প্রতিশ্রুতির কথা ঘোষণা করেছেন, তখন বিষয়টি রীতিমতো হয়ে উঠেছে ন্যক্কারজনক। মোদি সরকার, যারা কোভিডের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যর্থ, যারা অপরিকল্পিত লকডাউনের সময় বিহার থেকে ভিনরাজ্যে খাটতে যাওয়া শ্রমিকদের অকথ্য নিষ্ঠুরতার শিকার হতে বাধ্য করেছে, তারা যখন ভ্যাকসিনের বিনিময়ে ভোট চাওয়ার নির্লজ্জ স্পর্ধা দেখিয়েছে, মানুষ মেনে নিতে পারেননি।

বামপন্থীদের নেতৃত্বে বিকল্পের অ্যাজেন্ডায় জাতপাতের রাজনীতিকে ছাপিয়ে উঠে এসেছে শ্রেণির কথা। আরজেডি-ও নিজের ‘এম-ওয়াই’ (মুসলিম আর যাদব) পার্টির ভাবমূর্তি থেকে বেরিয়ে এসে ‘এ থেকে জেড’ পর্যন্ত সবার দল হিসেবে নিজেকে উপস্থিত করেছে। জোর দিয়েছে অর্থনৈতিক ও স্থানীয় ইস্যুর ওপর। বলেছে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের কথা। নির্বাচনের স্লগ ওভারে বিকল্পের এই অ্যাজেন্ডাই এই নির্বাচনের টার্নিং পয়েন্ট।

বিহারের ভোটের গুরুত্ব তাই শুধু বিহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর রয়েছে জাতীয় গুরুত্ব। মেরুকরণের রাজনীতিকে পরাস্ত করতে সৃজনশীল রাজনীতির জন্য তৈরি করেছে এক বিরাট সম্ভাবনা। জাতীয় রাজনীতিতে শোনা যাবে তার অনুরণন।

শান্তনু দে ভারতের সাংবাদিক

মন্তব্য পড়ুন 0