default-image

বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা হচ্ছিল, এত রিজার্ভ রেখে লাভটা কী? কিছু অংশ কি  বৃহৎ প্রকল্পে ব্যবহার করা যায় না? এর মধ্যেই বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ছয় মাসের আমদানির অর্থ রেখে বাকি টাকা বিনিয়োগ করা যায়। সরকারের গ্যারান্টিতে রিজার্ভ থেকে ঋণ দেওয়ার জন্যই এই তহবিল। এ অর্থ শুধু বাংলাদেশে উন্নয়ণ প্রকল্পে ব্যয় করা হবে। বিনিয়োগকারীরাও এ তহবিল থেকে ঋণ নিতে পারবেন। বছরে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়া হবে, সুদের হার হবে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ। প্রাথমিকভাবে বিদ্যুৎ ও বন্দর খাতের সরকারি প্রকল্পগুলো টাকা নিতে পারবে।

প্রথমে অর্থ পাচ্ছে পায়রা বন্দর। বন্দর কর্তৃপক্ষকে ঋণ হিসেবে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা দিতে চুক্তি হয়েছে। অথচ পায়রা বন্দরের কার্যকরতা (ভায়াবিলিটি) নিয়েই প্রশ্ন আছে। এ ধরনের প্রকল্পে রিজার্ভের অর্থ বিনিয়োগ বাণিজ্যিক স্বার্থ পূরণ করবে কি না, তা-ও বিবেচনার বিষয়। বাংলাদেশে সরকারি খাতের এক প্রতিষ্ঠান আরেক প্রতিষ্ঠানকে টাকা দেওয়া নিয়ে গড়িমসি করে। বাংলাদেশ বিমান, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনেক বিবাদ অতীতে আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। বিদ্যুৎ বিভাগেরই এক প্রতিষ্ঠান তাদেরই সহযোগী আরেক প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য টাকা দিতে চায় না। মনে রাখতে হবে, এটি রাজস্ব খাত থেকে পাওয়া অর্থ না। এর ব্যবস্থাপনাও হবে আলাদা।

বিজ্ঞাপন

রিজার্ভের টাকা উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয়ের ঝুঁকি নিয়ে কিছু মহলে কথা হচ্ছে। উন্নয়ন সহযোগীদের অনেকেও সরকারের প্রকল্পে রিজার্ভের টাকা ব্যবহারের নীতিগত বিরোধী। তাদের বিরোধিতার মুলে আছে সুশাসনের অভাব ও দুর্বল ব্যয় ব্যবস্থাপনা। অর্থনীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, সঠিক প্রকল্প বাছাই করতে না পারলে এবং বিনিয়োগ করা অর্থ উঠে না এলে নতুন সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা। অনেকেই আবার মনে করেন, এ ধরনের তহবিল ব্যবহারের কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। তহবিল ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ভবিষ্যতে দাতাদের কাছ থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন হবে।

কেউ কেউ অবশ্য বলছেন, সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক। ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপর নির্ভর করবে ঝুঁকি। রিজার্ভ বৃদ্ধি পাওয়ায় আমাদের জন্য বিদেশি ঋণ পাওয়াটাও সহজ হয়ে উঠেছিল। মনে রাখতে হবে, রিজার্ভ রেকর্ড হওয়ার অন্যতম কারণ করোনায় আমদানি কমে যাওয়া। করোনা-উত্তর সময়ে আমদানি চাহিদা কেমন হয় দেখতে হবে।

সরকার বলছে, এই ঋণ বেসরকারি খাতকেও দেওয়া হবে। বেসরকারি খাত কীভাবে নেবে এবং কোন ধরনের প্রকল্পে দেওয়া হবে, সেটিও ভালোভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। প্রকল্প বাছাই, প্রকল্প ব্যয় ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প খরচ বৃদ্ধি ও নজরদারি নিয়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপকদের দুর্বলতা এখনো আমাদের দেশে বড় সমস্যা।

আগেই বলেছি, এতে রয়েছে স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও নজরদারির চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকিং মডেলে কাজ করলেও ঋণ বিবেচনার মান হতে হবে বৈশ্বিক। কাকে টাকা দেওয়া হবে, সেটি সঠিকভাবে কাজে লাগানো হবে কি না, অর্থ উঠিয়ে আনা যাবে কি না—শক্তভাবে এগুলো মনিটর করতে হবে। না হলে দায়–দেনা বাড়বে, তৈরি হবে অপব্যবহারের ঝুঁকি।

অন্যদিকে প্রকল্প টেকসই না হলে, আর্থিক লাভ নিশ্চিত না হলে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও এখন অল্প পরিমাণে অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে, কিন্তু ভবিষ্যতে পরিমাণ বাড়লে আর তার ব্যবস্থাপনা ঠিকমতো না হলে মূল্যস্ফীতি কিংবা মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতার মতো সংকটের আশঙ্কাও থাকে।

বেশির ভাগেরই মত, উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য মূল ব্যাংকিং চ্যানেলের ওপরই নির্ভরশীল থাকা উচিত। রিজার্ভ হলো শেষ বিকল্প। যত কম ব্যবহার করা যায়, ততই ভালো।

রিজার্ভের অর্থ ব্যবহার নিয়ে কোনো সমস্যা তৈরি হলে পরে সেটি বিনিয়োগে সমস্যা তৈরি করবে, যারা বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান, তাদের মধ্যেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ফেলবে।

বিজ্ঞাপন

আমাদের দেশে এখনো প্রকল্প ব্যয় ঠিক থাকে না, বেড়ে যায়, প্রকল্প ঘিরে অনেক দুর্নীতির কথা শোনা যায়। যেমন পদ্মা সেতুর ব্যয় বেড়েই চলেছে। আমরা মনে করি, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরও বেশি শৃঙ্খলা আনা উচিত। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যেন সরকারকে জিম্মি করতে না পারে, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। বাংলাদেশের কনট্রাক্ট প্রতিষ্ঠান নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা যেন প্রাধান্য না পায়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

প্রকল্পে যুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে সহায়তা করবে, তা–ও নির্ধারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ঝুঁকি বিমা, এক্সপোর্ট ক্রেডিট এজেন্সি প্রভৃতি অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। আমরা ইউএসএক্সিম ব্যাংককে এখানে এনেছিলাম। ইআরডির কিছু কর্তাব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে ওপিকের গ্যারান্টি এনেছিলাম। খুলনা পাওয়ার কোম্পানি বাস্তবায়নের সময় মার্কিন প্রতিষ্ঠান এলপাসো জড়িত ছিল বলে ওপিক গ্যারান্টি দিয়েছিল। ওপিক গ্যারান্টির কারণে এনএপিসি পাওয়ার কনসোর্টিয়ামে অর্থায়ন অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল।

বাংলাদেশে কার্যরত কিছু ব্যাংককে ম্যাচিং গ্যারান্টি দিয়ে দেওয়ার কারণে বিমানের বোয়িং এয়ারক্রাফট আনার কাজ সহজ হয়েছিল। এতে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বেড়েছে, তারা অর্থায়ন করতে পেরেছে, কিছু আয় করতে পেরেছে, বিমানের কাছ থেকে কিছু ডিপোজিট পেয়েছে। ইউএসএক্সিম ও ওপিকের গ্যারান্টির কারণে টাকা তোলাও সহজ হয়েছিল।

রাজনৈতিক ঝুঁকি বিমা, অভ্যন্তরীণ রিটার্ন হার, সামাজিক, পরিবেশ, অর্থনৈতিক, জনগনের আকাঙ্ক্ষিত উপকার, দারিদ্র্য বিমোচন প্রভৃতি বিবেচনায় আনলে অর্থায়ন অনেক সহজ হয়ে যায়। পরিবেশের জন্য বিপত্তিকর প্রকল্পে অর্থায়ন পাওয়া এখন কঠিন। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বলছে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে তারা আর অর্থায়ন করবে না। ব্রিটেন ও ইউরোপের অনেক অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান বলছে, তারাও আর এ ধরনের প্রকল্পে অর্থায়ন করবে না। এভাবে বড় বড় প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ এক প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠছে।

পরিবেশের যেন ক্ষতি না হয়, প্রকল্পের ব্যয় ধীরে ধীরে যেন বেড়ে না যায়, দুর্নীতি যেন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তদুপরি নিজস্ব উৎস থেকে অর্থায়ন করলে সব সময় খেয়াল রাখতে হবে, যাতে এক প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অন্য প্রকল্পের ক্ষতি না হয়।

যমুনা সেতু, ভৈরব সেতু, কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি, এমনকি লাফার্জ সুরমা প্রকল্পের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান এলে প্রকল্পের সুশাসন নিশ্চিত হয় বেশি। আন্তর্জাতিক ভালো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোও তখন আসতে চায়। তারা মনে করে, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান থাকলে অর্থ পেতে বেশি দেরি হবে না, কোনো বিতর্ক তৈরি হবে না। প্রকল্প বাস্তবায়নের পরে তাদের নিয়ে টানাহেঁচড়া হবে না, মামলা হবে না। কারণ, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নিযুক্ত আইনজীবীরাই বলে দেবেন, তারা ঠিকঠাক কাজ করতে পেরেছে, কি পারেনি।

মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন