বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন হচ্ছে আমরা এ অবস্থায় পৌঁছালাম কেন? আমার মতে, আমাদের এ অবস্থায় উপনীত হওয়ার অন্যতম কারণ, দীর্ঘদিন ধরে বেআইনি অভিবাসীদের প্রতি একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহানুভূতি, যেখানে এরূপ অভিবাসীদের শুধুই ভিকটিম হিসেবেই দেখা হয় (অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা আসলেই ভিকটিম)। তাঁদের কাজের মধ্যে যে বেআইনি অংশটুকু আছে, সেটার প্রতি কখনোই গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে বেআইনিভাবে ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করছেন। তাঁদের একটা অংশ নিয়মিত সাগরে ডুবে মৃত্যুবরণ করেন। বিষয়টা অনেকটা পরিসংখ্যানের মতো দাঁড়িয়েছে।

শতকরা কতজন মারা যাবেন আর কতজন লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন, তার একটা হিসাব পাওয়া যায়। আর দেশত্যাগে বদ্ধপরিকর অভিবাসীরা সে ঝুঁকি হিসাব করেই এ পথে পা বাড়ান। এই ডুবে মরা আর উদ্ধার পাওয়া অভিবাসীদের মধ্যে অবধারিতভাবে বেশ কিছু বাংলাদেশি থাকেন। উৎস হিসেবে আর যেসব দেশের নাম আসে, তার সবই যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রবল দারিদ্র্যক্লিষ্ট আফ্রিকান দেশ। বাংলাদেশের সঙ্গে যার কোনো মিল নেই। সরকার থেকে পত্রপত্রিকা—সবাই এই ভিকটিমের জন্য সহানুভূতি প্রকাশ করেন। যে অপরাধী নেটওয়ার্ক এ বিপজ্জনক পথে তাঁদের নিয়ে গেছে, তাদের বিরুদ্ধে দু-চারটি শব্দ হয়তো উচ্চারিত হয়; কিন্তু কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয় না। আমরা অপেক্ষা করি পরবর্তী বিয়োগান্ত ঘটনা পর্যন্ত।

বেআইনি অভিবাসন ও অভিবাসন নিয়ে ব্যবসা করে যাঁরা ফুলেফেঁপে উঠেছেন, তাঁদের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক সহানুভূতি এবং পরোক্ষ সমর্থন দীর্ঘদিনের। দৃষ্টিভঙ্গিটাই হচ্ছে আহা, হোক না বেআইনি, যাচ্ছে তো, আর গিয়ে তো ডলার পাঠাচ্ছে, কী দরকার এত নিয়মকানুন দেখার? আমরা অনেকেই সচেতন নই, এ জন্য আমাদের অনেক উচ্চ মূল্য দিতে হয়েছে।

অথচ বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থা তো এমন নয় যে দেশত্যাগের জন্য এতটা মরিয়া হতে হবে। কিন্তু তারপরও তাঁরা কেন দেশত্যাগী হচ্ছেন, এ নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা গবেষণা করতে পারেন। গ্রামাঞ্চলে এখনো তিন বেলা খেয়ে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরিতে কৃষিশ্রমিক পাওয়া দুষ্কর। এটা ঠিক যে বাঙালি উচ্চাভিলাষী ও সাহসী, অনেক ক্ষেত্রেই দুঃসাহসী। তবে আরেকটি কারণ বোধ হয় পুরো সমাজের বিভিন্ন স্তরে অতি দ্রুত অতিধনী হয়ে ওঠার প্রবণতা এবং বেআইনি পথে এ ক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যক মানুষের দৃশ্যমান সাফল্য। সাফল্য অর্জনে পরিশ্রম ও ধৈর্য লাগবে, বিদ্যমান বাস্তবতার কারণে এ আপ্তবাক্যের প্রতি বিশ্বাস শিথিল হয়ে আসছে। যে তরুণ আর কিছুই পারছেন না, তিনি চেষ্টা করছেন কোনোভাবে ইতালিতে হাজির হওয়া যায় কি না। আর পরিণত হচ্ছেন মানব পাচারকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে। এতে একদিকে মানব পাচারের উৎস হিসেবে বাংলাদেশ পরিচিত হচ্ছে, অন্যদিকে মানব পাচার রোধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জবাবদিহির সম্মুখীন হচ্ছে।

বেআইনি অভিবাসন ও অভিবাসন নিয়ে ব্যবসা করে যাঁরা ফুলেফেঁপে উঠেছেন, তাঁদের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক সহানুভূতি এবং পরোক্ষ সমর্থন দীর্ঘদিনের। দৃষ্টিভঙ্গিটাই হচ্ছে আহা, হোক না বেআইনি, যাচ্ছে তো, আর গিয়ে তো ডলার পাঠাচ্ছে, কী দরকার এত নিয়মকানুন দেখার? আমরা অনেকেই সচেতন নই, এ জন্য আমাদের অনেক উচ্চ মূল্য দিতে হয়েছে। বৃহৎ পরিসরে এর শুরু সম্ভবত মালয়েশিয়াকে দিয়ে। আইনি পথে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী শ্রমিক প্রেরণের সুযোগ আসে এ দেশ থেকে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বেআইনি অভিবাসন ব্যবসায়ীরা এর দখল নিয়ে নেন এবং আইনবহির্ভূত পথে কর্মীদের নেওয়া শুরু করেন। মালয়েশিয়া বাধ্য হয়ে বিকল্প উৎসের সন্ধান করে। ফলে সেখানে তিন কোটি লোকের দেশ নেপাল থেকে আইনসম্মত কর্মীর সংখ্যা আজ বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশিদের অভিবাসনে নিষেধাজ্ঞা এসেছে এই দুষ্টচক্রের কারণে। কোরিয়ার সম্ভাবনাময় বাজার নষ্ট হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে কখনোই কোনো কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। প্রশাসনিক দুর্নীতি তো আছেই, এই চক্রের রাঘববোয়ালেরা সব সময়ই প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে বিদেশে গিয়ে সবচেয়ে কম বেতনে কাজ করছেন বাংলাদেশি কর্মীরা।

ফিরে আসি ইউরোপ প্রসঙ্গে। বেআইনিভাবে ইউরোপে প্রবেশ করা বাংলাদেশিদের ফেরত নিতে আমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছি। এরূপ ১ হাজার ৫০০ ব্যক্তির তালিকা দিয়েছে ইউরোপ। তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করতে এত সময় লাগার কোনো কারণ নেই, যাতে ইউরোপীয় কমিশনের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাদের অগ্রাধিকার কোনটি। আমরা কি এই বেআইনি অভিবাসীদের অনেকেই যাতে সেখানে থেকে যেতে পারেন তার ওপর গুরুত্বারোপ করছি? নাকি আমাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বদ্ধপরিকর?

আমরা সবাই জানি যে এই ১ হাজার ৫০০ জনের মধ্যে দু-একজন রোহিঙ্গা যদি থাকেও, বাকি সবাই নিঃসন্দেহে বাংলাদেশি। যাচাই-বাছাইয়ে যে দীর্ঘসূত্রতা চাইলেই তা দূর করা সম্ভব। প্রায় সব দেশেই আমাদের দূতাবাস আছে। তাঁদের যে কারও সঙ্গে দুই মিনিট কথা বললেই বোঝা যাবে তাঁরা বাংলাদেশি কি না। ঠিকানার বিষয়ে হয়তো অনেকে সহযোগিতা করবেন না ইউরোপে থাকার আশায়। তবে তাঁদের ট্রাভেল পারমিট দিয়ে দেশে নিয়ে এলে, যাঁদের ঠিকানা পাওয়া যাবে না, তাঁদের কোনো ক্যাম্পে আটকে রাখলে অচিরেই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

বেআইনি অভিবাসন এবং মানব পাচারে লিপ্ত যে দুষ্টচক্রটি, তার বিরুদ্ধে প্রকৃত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে আর দেরি না করে। সমাজের বিভিন্ন স্তরে তারা অবস্থান করছে। একেবারে মাঠপর্যায়ের দালাল থেকে শুরু করে রাঘববোয়াল পর্যন্ত সবাইকে আনতে হবে এর আওতায়।

১ হাজার ৫০০ খুব একটা বড় সংখ্যা নয়। পদ্ধতিগত জটিলতায় আটকে না থেকে ইউরোপে এ আবহ সৃষ্টি করা প্রয়োজন যে বাংলাদেশ একটি দায়িত্বশীল দেশ, যার সঙ্গে কোনো চুক্তি করে আস্থা রাখা যায় যে সে তা পূরণে একনিষ্ঠ থাকবে। বিষয়টি শুধু ভিসার নয়, যদিও ভিসার ব্যাপারটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইউরোপ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক মসৃণ রাখা তাই যথাযথ অগ্রাধিকারের দাবি রাখে। পদ্ধতিগত জটিলতা বা অল্প কিছু ব্যক্তির স্বার্থ এ ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

সবশেষে বেআইনি অভিবাসন এবং মানব পাচারে লিপ্ত যে দুষ্টচক্রটি, তার বিরুদ্ধে প্রকৃত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে আর দেরি না করে। সমাজের বিভিন্ন স্তরে তারা অবস্থান করছে। একেবারে মাঠপর্যায়ের দালাল থেকে শুরু করে রাঘববোয়াল পর্যন্ত সবাইকে আনতে হবে এর আওতায়। বিভিন্ন প্রসঙ্গে ‘জিরো টলারেন্স’ কথাটা প্রায়ই শুনি ভিআইপিদের মুখে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানব পাচার নিয়ে বাংলাদেশের দুর্নাম দূর করতে এই একটি ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করে দেখাবেন কি?

মো. তৌহিদ হোসেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন