>
default-image

উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত, তা চিহ্নিত করার লক্ষ্যে গবেষণা করছে কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টার। অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি সামাজিক, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত উন্নয়নের ওপরও জোর দিচ্ছে সংস্থাটি। বাংলাদেশের জন্য ভিশন ২০২১ অর্জনে এই গবেষণাভিত্তিক কিছু নিবন্ধ প্রকাশ করছে প্রথম আলো। আজ প্রকাশ করা হলো বিংশতম নিবন্ধটি।

উপদেষ্টা বিয়ন লারসনের সহযোগিতায়, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের ডেভিড রোনাল্ড-হোস্ট এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের হেরাথ গুনাতিলকের করা নতুন এ গবেষণাটিতে আগামী বছরগুলোতে পুরো দেশকে বিদ্যুতের আওতায় আনার সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি হিসেবে ৮০ শতাংশের বেশি প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহৃত হচ্ছে। এদিকে, ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের গবেষণা বিদ্যমান উৎপাদন ও চাহিদা হিসাব করে দেখেছে—গ্যাসের মজুত পরবর্তী দুই শতকের মধ্যে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে।

ওই গবেষণায় আরও দেখা গেছে কয়লাকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হলে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমবে এবং সব ক্ষেত্রে এর প্রভাব হবে ইতিবাচক। আগামী ১৫ বছর ধরে, প্রাকৃতিক গ্যাস বিদ্যুতের অর্ধেক আমদানি করা কয়লার সঙ্গে প্রতিস্থাপন এবং চাহিদা পূরণের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোতে ১৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা খরচ হবে। এটি কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণও বৃদ্ধি করবে। কিন্তু সব মিলিয়ে অর্থনীতিকে ৪ লাখ ২১ হাজার ৯০০ কোটি টাকায় উন্নীত করবে। সব মিলিয়ে ব্যয়িত প্রতি টাকা ২৩ টাকার সামাজিক কল্যাণ সাধন করবে।

দেশীয় কয়লা শিল্পের বিকাশে বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় সুবিধা তৈরি করবে। এই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ হবে ৭৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকা এবং জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য ব্যয় হবে ৪ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। তবে এই বিনিয়োগ থেকে যে মুনাফা হবে, তা অবাক করার মতো। আগামী ১৫ বছরে মোট মুনাফা হবে ২০ লাখ কোটি টাকার বেশি, যা জিডিপির একটি পুরো বছরেরও বেশি সময়ের সমতুল্য। খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের কারণে সম্ভাব্য জমি-ভাঙন, কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও দূষণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে কিন্তু এ ধরনের উদ্বেগের সুরাহা করতে যথেষ্ট সম্পদ পাওয়া যাবে। এই বিনিয়োগ ব্যয়িত প্রতি টাকায় ২৪ টাকার সুবিধা দেবে।

 ঢাকায় অবস্থিত ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক এ কে এনামুল হক একটি গবেষণায় গ্রামীণ পরিবারগুলোর জন্য বিকল্প আলো হিসেবে সৌর আলোর কথা বলেছেন। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের ৩০ লাখ বাড়িতে সৌর আলোর ব্যবস্থা হয়েছে। একটি দাতা প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে পরিচালিত কর্মসূচি এসব পরিবারকে সৌরবিদ্যুতের ইউনিট কিনতে ২ হাজার টাকার ভর্তুকি দেয়। পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণও দেয়। এই কর্মসূচিটি নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের মাধ্যমে কয়েক লাখ ঘরবাড়ি আলোকিত করেছে সরকারের কোনো খরচ ছাড়াই। কিন্তু এটি কি সত্যিই এসব গ্রামীণ ঘরবাড়িকে আলোতে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার সর্বোত্তম উপায়?

পরিবারপ্রতি সৌরবিদ্যুতের খরচ ৬৭ হাজার টাকা। প্রতিদিন চার ঘণ্টা ব্যবহার নির্দিষ্ট করলে, এক ঘণ্টার সৌরবিদ্যুতের খরচ পড়ে ৪.৫৯ টাকা। যেহেতু সৌরশক্তি উচ্চমানের আলো প্রদান করে থাকে, ব্যয়িত প্রতি টাকায় ২ টাকার কিছু কম সুবিধা প্রদান করে। পক্ষান্তরে, পাঁচটি গ্রামীণ পরিবার মিলে একটি ডিজেল জেনারেটর কিনতে পারে প্রায় ১৫ হাজার টাকা দিয়ে এবং এটি চালানোর খরচ তারা ভাগ করে নিতে পারে। ২০ বছরের জ্বালানিসহ সর্বমোট খরচ প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা—অর্থাৎ পরিবারপ্রতি মাত্র ২৬ হাজার ৮০০ টাকা। অতএব প্রতি ঘণ্টার বিদ্যুতের জন্য মাত্র ১.৮৪ টাকা খরচ হয়, এবং কম খরচের কল্যাণে প্রতিটি ঘর প্রতিদিন অতিরিক্ত দুই ঘণ্টার জন্য আলোকিত থাকতে পারে।

এতে দেখা যাচ্ছে যে পাঁচটি পরিবারকে একটি একক ডিজেলচালিত জেনারেটর দিলে, তা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের তুলনায় ১২ গুণ বেশি সাশ্রয়ী হবে—এ ক্ষেত্রে ব্যয়িত প্রতি টাকা ২৪ টাকার আকর্ষণীয় সুবিধা এনে দেবে।

ভবিষ্যতে গোটা বাংলাদেশকে বিদ্যুতের আওতায় আনতে আপনি কীভাবে সাহায্য করবেন? আপনার বক্তব্য আমরা শুনতে চাই, এখানে: <https://copenhagen. fbapp. io/energypriorities>. ব্যয়িত প্রতি টাকায় কীভাবে সবচেয়ে বেশি কল্যাণ সাধন করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া যাক।

ড. বিয়র্ন লোমবোর্গ: কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট। টাইম ম্যাগাজিনের মূল্যায়নে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির একজন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0