default-image

একদা ‘নাপিত’ ছিল, এমন একজনের সঙ্গে এক নারী ডাক্তারের ঘর-সংসার কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি এক পুলিশ কর্মকর্তা। ব্যাপারটা তার কাছে এমনই ‘গর্হিত’ মনে হয়েছিল যে রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করে সবাইকে সেটা জানানোর প্রয়োজন বোধ করেছিলেন তিনি। খুব বেশিদিন না, এই ডিসেম্বরের ঘটনা এটা। এই ঘটনা আবারও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, জাত-পাত-ধর্ম-ভেদবিরোধী গ্রহণযোগ্য একটা আইন কত দরকার। অথচ এ রকম দুটি আইনের খসড়া অনেক দিন ধরেই হয়ে আছে। আইন কমিশন ২০১৪ সালে এবং মানবাধিকার কমিশন ২০১৮ সালে ‘বৈষম্য বিলোপ আইন’ নামে এ রকম দুটি পৃথক খসড়া তৈরি করে। দুটি খসড়াই প্রতিশ্রুতিশীল ও সম্ভাবনাময়। পরিতাপের বিষয় হলো কোনোটিই এখনো সরকার ও সংসদ আইনে রূপান্তরিত করেনি। জানা যায়, খসড়াগুলো আইন মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন।

গত দশকে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিকবাদী কিছু আইন বাংলাদেশ প্রণয়ন করেছে। ২০০৯ সালের আইনত্রয়ী—জাতীয় মানবাধিকার আইন, তথ্য অধিকার আইন, ভোক্তা অধিকার আইন এই তালিকায় অগ্রগামী। বৈষম্য বিলোপ আইনও এই তালিকায় সহজেই আসতে পারত। আইন কমিশন ২০১৪ সালের খসড়াটি মানবাধিকার কমিশনের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই করেছিল। তবু মানবাধিকার কমিশন নিজ উদ্যোগে এ সম্পর্কে আরও একটি খসড়া প্রণয়নে উদ্যোগী হয়। যদিও আইন সংস্কার সুপারিশ করার ম্যান্ডেট মানবাধিকার কমিশনের রয়েছে, তবু এ বিষয়ে রাষ্ট্রের মূল প্রতিষ্ঠান হচ্ছে আইন কমিশন। তাই নতুন করে মানবাধিকার কমিশনের এই উদ্যোগ দীর্ঘসূত্রতারই জন্ম দিয়েছে। খসড়া দুটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, খুব বেশি মৌলিক পার্থক্য তাদের মধ্যে নেই। দুটি খসড়াই উৎসাহমূলক। গুরুত্বপূর্ণ দুটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের বৈষম্য বিলোপবিষয়ক দুটি খসড়া তৈরি করা থেকে বোঝা যায়, এমন একটি আইন প্রণয়নের ব্যাপারে জাতীয় ঐকমত্য রয়েছে। তাই এখানে এই আইন করার বিষয়ে নতুন করে যুক্তি উপস্থাপন করা বাহুল্য হবে। বিভিন্ন গবেষণায় বাংলাদেশে ৬৫ লাখ দলিতের যে বঞ্চনা ও বৈষম্যের চিত্র ফুটে উঠেছে, ২০১৪ সালের আইন কমিশনের রিপোর্ট এই বাস্তবতারই স্বীকৃতি।

বিজ্ঞাপন

আইন কমিশনের রিপোর্টে সামাজিক নিগ্রহ ও অস্পৃশ্যতার শিকার প্রায় ২৩ রকমের দলিত শ্রেণির মানুষের কথা বলা হয়েছে। দলিত শ্রেণির মানুষের বাইরেও এই আইনের সুরক্ষার আওতায় হিজড়া, যৌনকর্মী, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী, নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রান্তিকতা, বঞ্চনা, ঘৃণা এবং অধীনস্থতার বিষয়গুলোও আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতার বাইরেও শুধু জাত-পাত-ধর্ম পরিচয়ের জন্য অনেক মানুষ এদের সঙ্গে একত্রে খায় না, বসে না, চাকরি দেয় না, বাচ্চাদের স্কুলে পর্যন্ত ভর্তি নেয় না। এমনকি অনেক পেশার মানুষকে সমাজে এখনো অবমাননাকর ভাষায় সম্বোধন করা হয়।

মানবসত্তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অমোঘ শপথ এই আইনের মূল ভিত্তি। আইন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনের খসড়ায় মেজাজ, আগ্রহ ও সুর একই—সমাজ থেকে সব রকম বৈষম্য দূরীকরণ এবং দলিতসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণ। এ লক্ষ্যে কমবেশি একই আঙ্গিকে খসড়া দুটি প্রথমে বৈষম্যের ধারণা, ব্যাপ্তি ও প্রকৃতি এবং বৈষম্যের শিকার হওয়া মানুষের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে নিয়েছে। তারপর বৈষম্যমূলক আচরণকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিবেচনা করা হয়েছে এবং খাত অনুসারে বিভিন্ন মাত্রার শাস্তি প্রস্তাব করা হয়েছে। ফৌজদারি চরিত্রের পাশাপাশি আচরণের নাগরিক (দেওয়ানি) দিকেও নজর দিয়ে ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। উভয় খসড়াই এই আইনের জন্য নতুন কোনো আদালতের প্রস্তাব করেনি, বরং জেলা ও দায়রা জজ আদালতকে এই আইনের আওতায় সংঘটিত অপরাধ অথবা অন্যায়কে আমলে নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে। উভয় খসড়াতেই সরাসরি আদালতে নালিশের বিধানকে ক্ষুণ্ন না করে অভিযোগ দায়ের প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার কমিশনকে সবিশেষ জায়গা দেওয়া হয়েছে। সেটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ আছে, কেননা বৈষম্যমূলক আচরণ ও কথা এবং জাত-পাত-ধর্ম-অস্পৃশ্যতা ইত্যাদির ভিত্তিতে কটাক্ষ-বিদ্রূপ-বঞ্চনা করার মধ্যে মানবাধিকারের সূক্ষ্মতম দিক রয়েছে।

উভয় খসড়াতেই বৈষম্যের একটা ব্যাপক ম্যান্ডেট দাঁড় করানো হয়েছে। ক্ষেত্র হিসেবে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, জাত, বিশ্বাস, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, প্রথা, ঐতিহ্য, আনুষ্ঠানিকতা, বংশানুক্রম, পেশা, লিঙ্গভেদ, যৌন প্রবৃত্তি, বয়স, প্রতিবন্ধিত্ব, মাতৃত্ব, গর্ভাবস্থা, রোগব্যাধি, বৈবাহিক পরিচয়, জন্মস্থান, অস্পৃশ্যতা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রকে ধরা হয়েছে। এই বিবেচনার ক্ষেত্র ২০১৪ সালের খসড়ায় ১৩টি এবং ২০১৮ সালের খসড়ায় ২২টির মতো। এগুলোর অধীনে উদাহরণ হিসেবে ২০১৪ সালের খসড়ায় ১০টি এবং ২০১৮ সালের খসড়ায় ১৬টির মতো কাজ বা আচরণকে বৈষম্যের আওতায় আনা হয়েছে। কয়েকটি উদাহরণ টানা যেতে পারে, সম্পত্তি অর্জনে বা হস্তান্তরে বাধা, সরকারি বা বেসরকারি সেবা লাভ থেকে বঞ্চনা, শিক্ষা/চিকিৎসা/কর্মসংক্রান্ত বঞ্চনা, প্রতিবন্ধিতা, ধর্ম পালন না-পালনবিষয়ক বঞ্চনা, উপাসনালয়ে প্রবেশে বাধা, বিবাহে জাতভেদ, একঘরে করে রাখা, বিদ্রূপ-অবজ্ঞা-কটূক্তি, নৃতাত্ত্বিক আধিপত্য ইত্যাদি।

আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ ২০১৪ সালের আইন কমিশনের খসড়াটিকে ব্যবহার করে বানানো ২০১৫ সালের বৈষম্যবিরোধী একটি বিলকে অগ্রগতি হিসেবে দাবি করে এসেছে এবং যত দ্রুত সম্ভব তা আইনে রূপান্তরিত করবে বলে কথা দিয়ে এসেছে। আইসিসিপিআরের হিউম্যান রাইটস কমিটি বিলটি আইনে পরিণত না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং বিলটি আইনে রূপান্তর করার জন্য সরকারকে তাগাদা দেয়। মানবাধিকার কমিশনও মনে করে, ‘বৈষম্য বিলোপ আইন’ প্রণীত হলে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। আইনটি আলোর মুখ না দেখার কোনো কারণ নেই। সরকার আলোচিত খসড়া দুটির যেকোনো একটিকে ভিত্তি ধরে অবিলম্বে একটি বিল আনবে এবং আইন হিসেবে পাস করবে—এটাই আমাদের আশা।

জাকির হোসেন নাগরিক উদ্যোগ-এর প্রধান নির্বাহী।
ড. এস এম মাসুম বিল্লাহ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন