default-image

এই লেখাটি মূলত কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা নির্ভর করে বিষয়ভিত্তিক যুক্তিতর্ক ও নেগোসিয়েশন এবং নিজ নিজ দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য। এই প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ডেপুটি সেক্রেটারির সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফর অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এখানে বাংলাদেশের জন্য এমন কূটনৈতিক প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার প্রয়োজন যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখার পাশাপাশি চীন যাতে কোনোভাবেই রুষ্ট না হয় সেদিকেও মনযোগ প্রয়োজন। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ইন্দো-প্যাসিফিক সামরিক চুক্তি, জোট ও সহযোগিতার বিষয় ছিল এই সফরের মূল দিক। এটি প্রচ্ছন্নভাবে চীনবিরোধী সামরিক চুক্তি। চীন আমাদের পরীক্ষিত বন্ধুরাষ্ট্র, যার সঙ্গে আমাদের বহুমাত্রিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ জড়িত।

এই কূটনৈতিক তৎপরতার সাফল্য বহুলাংশে নির্ভর করে বন্ধুত্ব অর্জনের জন্য ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সম্প্রীতি স্থাপন এবং আতিথেয়তা ও আপ্যায়নের মাধ্যমে। আশির দশকের প্রথমে আমি কলকাতায় আমাদের কূটনৈতিক মিশনে প্রেস ও সংস্কৃতি বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রথম সচিব। সেই সময় জানতে পারি কবি শামসুর রাহমান সস্ত্রীক কলকাতায় এসেছেন। এ সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। আমি তাঁর সম্মানে একটি সংবর্ধনার আয়োজন করি, যাতে আমন্ত্রিত হবে শহরের গণ্যমান্য বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, কবি-সাহিত্যিক প্রমুখ, যাঁরা আমাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ফারাক্কা বাঁধ, তিন বিঘা, সীমান্ত সীমানা নির্ধারণ প্রভৃতি সমস্যা নিয়ে আমাদের সপক্ষে অনুকূল জনমত সৃষ্টি করতে সাহায্য করতে পারে।

তা ছাড়া কলকাতার নাগরিক সমাজে তথা যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশে জিয়া-এরশাদ সামরিক সরকারকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা ছিল আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অবশ্য আমি ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলাম, তাই কলকাতার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের খোঁজখবর রাখি, যাতে ওখানকার সুধী সমাজের কাছে আমার গ্রহণযোগ্যতা অধিকতর সহজ হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

সংবর্ধনার আগের দিন আমি একটা ফোন পাই। ‘আমি ফজলে লোহানী বলছি। আমি এখন কলকাতায়। আপনি কি মনে করেন না এ-সংক্রান্ত পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন যাওয়া উচিত।’ আমি হতভম্ব। আমি বলি টিভিতে আপনার অনুষ্ঠান ‘যদি কিছু মনে না করেন’ এখানেও জনপ্রিয়। আপনি একজন সেলিব্রিটি, তবুও আপনি কেন এসেছেন, কোথায় উঠেছেন এবং আপনার সঙ্গী কে, তা না জেনে প্রতিবেদন ছাপানো সমীচীন হবে না, পাছে অবাঞ্ছিত গুজব সৃষ্টি হয়। আমি বলি কবি শামসুর রাহমান সস্ত্রীক এখন কলকাতায়। তাঁর সম্মানে আমি একটি পার্টির আয়োজন করেছি। সেখানে শহরের গণ্যমান্য বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক আমন্ত্রিত। আপনিও আমন্ত্রিত। সেখানে উপস্থিত সাংবাদিক আগ্রহী হয়ে আপনার ওপর একান্ত সাক্ষাৎ প্রতিবেদন লিখতে পারবেন। শুনে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, ‘আই অনলি অ্যাটেন্ড পার্টিস অব অ্যাম্বাসেডরস’। আমি টেলিফোনটি তৎক্ষণাৎ নামিয়ে রাখি। যদিও জানি ঢাকায় তাঁর যশ, প্রতিপত্তি, ক্ষমতাধরদের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা।

পরদিন অফিসে যেতেই মিশনপ্রধান আমিনুল ইসলাম আমায় ডেকে পাঠান। আমি প্রমাদ গুনি। ঘরে প্রবেশ করে দেখি ফজলে লেহানী পাশে বসা। আমাকে দেখে চেয়ার থেকে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরে প্রায় চিৎকার করে বলেন, ‘হান্নান ভাই, বলবেন তো আপনি হাসনাত আব্দুল হাইয়ের বড় ভাই। হাসনাত আমার পরম বন্ধু সেই ৫০-এর দশকে যখন আমরা লন্ডনে থাকি। আমি অবশ্যই আপনার পার্টিতে যাব।’ আমি বলি, ‘আমি বলিনি কারণ আমার একটা স্বতন্ত্র পরিচয়, অস্তিত্ব আছে, তা যত সামান্যই হোক।’ শুনে তিনি বললেন, ‘আমাকে আর লজ্জা দেবেন না।’ আমার আব্বা প্রায়ই বলতেন, নিজের গুণের ঐশ্বর্য ও মহিমা নিয়ে বেঁচে থাকায় অনেক গৌরব ও তৃপ্তি। অন্যের পরিচয়ে নিজেকে খাটো কোরো না। পার্টিতে আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে ছিলেন অন্নদা শংকর রায়, সাবেক আইসিএস ও প্রখ্যাত সাহিত্যিক। দেশ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ, স্টেটসম্যান পত্রিকার সুনন্দ দত্ত রায়, যুগান্তর-এর অমিতাভ চৌধুরী, কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, চিত্র পরিচালক মৃণাল সেন, ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ ও দ্বীপ জ্বেলে যাই ছায়াছবিতে অনবদ্য অভিনয়ের চিত্রতারকা বসন্ত চৌধুরী, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক নবনীতা দেব সেন, নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের সাবেক সহধর্মিণী এবং বিশিষ্ট নজরুলসংগীতশিল্পী ড. অঞ্জলি মুখার্জি প্রমুখ।

পার্টিতে সবাই শামসুর রাহমানের কবিতাংশ শুনতে চাইল। জার্মানপ্রবাসী দাউদ হায়দার তখন কলকাতায়। সে তার উদাত্ত কণ্ঠে আবৃত্তি করল শামসুর রাহমানের কালজয়ী অবিনাশী কবিতা ‘আসাদের শার্ট’, ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’। দাউদ হায়দারের হৃদয়গ্রাহী আবৃত্তি এক ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করল। পিনপতন নীরবতা, সবাই বাক্‌রুদ্ধ। দৃষ্টি আচ্ছন্ন, অশ্রুসিক্ত।

পার্টি থেকে বিদায় নিয়ে যাওয়ার সময় ফজলে লোহানী আমায় বললেন, হান্নান সাহেব করেছেন কী? সমগ্র কলকাতা শহর আপনার বাড়িতে। আমি বলি, ধন্যবাদ দেন শামসুর রাহমানের সুখ্যাতিকে, ধন্যবাদ দেন পানীয় প্রেয়সীর মায়াবী আকর্ষণকে, যা একটি অতি প্রাচীন কূটনীতিক শিষ্টাচার ও কৌশল বন্ধুত্ব অর্জন করার জন্য। আমি উপলক্ষ মাত্র। শামসুর দম্পতি বললেন, ‘হান্নান সাহেব, অশেষ ধন্যবাদ। এত বড় অনুষ্ঠান আয়োজন করার জন্য।’ আমি বলি, ‘আমি ধন্য।’

আমার পরবর্তী কর্মস্থল নিউইয়র্ক জাতিসংঘ বাংলাদেশ মিশনে কাউন্সিলরের পদমর্যাদায়। মিশনপ্রধান রাষ্ট্রদূত জেনারেল ওয়াসিউদ্দিন আমাকে ডেকে বললেন, ‘তোমাকে স্পেশাল পলিটিক্যাল কমিটিতে কাজ করতে হবে। আমি তোমার সিভি দেখেছি। তুমি পারবে। ওই কমিটির মূল বিষয় দীর্ঘদিনের ফিলিস্তিন সমস্যা। আমি ছয় বছর একাই ওই কমিটির দায়িত্বে ছিলাম।’ ভাগ্যপীড়িত, উপদ্রুত, দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্ত ফিলিস্তিন সমস্যা নিয়ে কমিটিতে আমি জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছি। এই কারণে পশ্চিমা শক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে আমাকে রাষ্ট্রদূতের কাছে কৈফিয়ত দিতে হয়েছিল। আমি পরপর ছয় বছর ফিলিস্তিন সমস্যার ওপর প্রস্তাব তৈরি ও পাস করি। একটি আরব দেশও এগিয়ে আসেনি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কী নিষ্ঠুর পরিহাস। এখন দেখছি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নকে নস্যাৎ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আরব গালফ রাষ্ট্রগুলো ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। দেখছি মুসলিম রাষ্ট্র ইরানকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য আরব রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে জোটবদ্ধ।

জাতিসংঘে আমার ছয় বছর আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তখন ১৮২টি (এখন সদস্যসংখ্যা ১৯২) সদস্যদেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে প্রতিদিন কাজ করে বহুমাত্রিক কূটনীতির প্রকৃত চেহারা, মারপ্যাঁচ, জারিজুরি স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হয়েছিল। এই কূটনীতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আন্তর্জাতিকতার মুখোশের অন্তরালে রয়েছে উগ্র জাতীয়তাবাদ, ঈর্ষাকাতর ক্ষুদ্র জাতীয় স্বার্থ। সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক ক্ষমতা, কর্তৃত্ববাদ এবং আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তারের নগ্ন প্রতিযোগিতা। এখানে কূটনীতির মূলমন্ত্র সুবিধাবাদ ও রিয়াল পলিটিক। ন্যায়নীতি ও আদর্শ গৌণ। তাই বিপন্ন বিশ্বশান্তি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য, আইনের শাসন, পরিবেশের বিপর্যয় সম্পর্কে জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল আন্তোনিও গুতেরেসের উদ্বেগ প্রকাশ সত্ত্বেও দেখি পরাশক্তির মদদপুষ্ট অব্যাহত ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান, লিবিয়া, ইয়েমেন যুদ্ধবিধ্বস্ত। শুনি কাশ্মীরি ও রোহিঙ্গাদের আর্তনাদ ও হাহাকার। দেখি ধ্বংসপ্রাপ্ত উদ্বাস্তু ছিন্নমূল শরণার্থীর মিছিল, ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীদের মর্মান্তিক সলিলসমাধি, যা মানবতার চরম অবমাননা ও মানবজাতির লজ্জা।

জাতিসংঘ নয়। এখন প্রয়োজন শামসুর রাহমানের মতো বিবেকবান বিশ্বের কবি, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীর এই অন্যায় ও অব্যবস্থা নিরসনে সমন্বিত বলিষ্ঠ উচ্চারণ। প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ও প্রতিরোধ। বিশ্ব জনমত সৃষ্টি।

চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার প্রাক্কালে জাতিসংঘে আমার ছয়টি বছর এক বিচিত্র জীবনের মূল্যবান অভিজ্ঞতা, যা স্মরণ করিয়ে দেয় রবি ঠাকুরের কবিতা ‘বিপুলা এই পৃথিবীর কতটুকু জানি’।

আব্দুল হান্নান সাবেক কূটনীতিক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0