default-image

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিটি বাংলাদেশের একমাত্র কয়লাখনি। এই খনি থেকে কয়লা উৎপাদন শুরু হয় মূলত এ স্থানে নির্মিত বড়পুকুরিয়া কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালানোর জন্য। কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০০৫ সালে চালু হয়। প্রথম পর্যায়ে এটি ২৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল, পরে নতুন একটি ইউনিট যোগের মাধ্যমে ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে ওঠে। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি তার ক্ষমতামাফিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে না। দীর্ঘদিন ধরে এটি মাত্র ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে আসছে, যা কিনা তার ক্ষমতার অর্ধেকের কম। প্রশ্ন হলো, বড় অঙ্কের উৎপাদনক্ষমতা অকার্যকর থাকার কারণ কী? কেন্দ্রের কোনো ইউনিটের কারিগরি সমস্যা? নাকি পর্যাপ্ত কয়লার অভাব? নাকি উভয়ই? যদি কয়লার ঘাটতি একটি কারণ হয়ে থাকে, তবে কেন এ ঘাটতি? কয়লাখনিটির এবং তার ওপর নির্ভরশীল বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ভবিষ্যৎ কী?

যেকোনো মানদণ্ডে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিটি একটি ছোট কয়লাখনি, যার উৎপাদনক্ষমতা বা লক্ষ্যমাত্রা বছরে ১০ লাখ টন এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মাঝারি আকারের। তবে এখান থেকে উত্তরবঙ্গে উল্লেখযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়ে থাকে বলে এ দুটি প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া দেশের নিজস্ব কয়লা ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে এদের অগ্রণী ভূমিকা ও অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে নিজস্ব কয়লা ব্যবহারের পথনির্দেশনা দিতে সাহায্য করতে পারে। উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশে নির্মাণাধীন ও পরিকল্পিত অনেকসংখ্যক বৃহৎ কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরিভাবে আমদানি করা কয়লার ওপর নির্ভরশীল হবে বলে নীতিনির্ধারিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
কয়লার জোগান হবে কি না, তা নিশ্চিত না করে রাষ্ট্রীয় তথা জনগণের টাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রে এ বাড়তি ক্ষমতার তৃতীয় ইউনিটটি স্থাপন করা হয় কোন যুক্তিতে। বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রে তৃতীয় ইউনিট যোগ করার জন্য বাড়তি কয়লা জোগানের নিশ্চয়তা তারা দেয়নি। তাহলে এর দায় কার ওপর বর্তায়, সে প্রশ্ন থেকেই যায়

এ বিষয়গুলোর কোনোটিই এই কয়লাখনিকে জনগণের কাছে তেমনভাবে পরিচিত করেনি, যতটা না করেছে ২০১৮ সালে এই কয়লাখনি থেকে কয়লা চুরির অভিযোগ ও কথিত কেলেঙ্কারি। সে সময় ১৪২ হাজার টন কয়লা উধাও হয়ে কয়লার ডিপো খালি হওয়া ও তার ফলে কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি দেশের জ্বালানি প্রেক্ষাপটকে আলোড়িত করেছিল। এ ঘটনার তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে কয়েকটি তদন্ত কমিটি কাজ করে। কোনো কোনো কমিটি নেহাত সিস্টেম লসকে কয়লাঘাটতির কারণ হিসেবে শনাক্ত করে। আবার কোনো কমিটি কয়লা বেচাকেনায় কয়লার আর্দ্রতা পরিমাপের কারসাজি বা অনিয়মকে দায়ী করে। তবে কোনো তদন্ত কমিটিই দিনে বা রাতের আঁধারে বস্তা বা ট্রাক ভরে কয়লা সরিয়ে ফেলার কোনো প্রমাণ বা অভিযোগ উত্থাপন করেনি। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, এ অবস্থায় কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও সব সাবেক মহাব্যবস্থাপককে একযোগে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানোটি সঠিক হয়নি। কয়লা চুরি বা ঘাটতির বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন। ইতিমধ্যে বড়পুকুরিয়া কয়লাক্ষেত্রটি তার স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে কয়লা সরবরাহ চলমান রেখেছে।

বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিটি স্থাপনের প্রধান উদ্দেশ্য খনিমুখে স্থাপিত কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালানো। প্রাথমিকভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ইউনিট চালুর মাধ্যমে মোট ক্ষমতা থাকে ২৫০ মেগাওয়াট। প্রায় একই সময়ে বড়পুকুরিয়া খনি থেকে কয়লা উৎপাদন শুরু হয়। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনা কয়লা উৎপাদক কোম্পানির পর্যায়ক্রমে পরপর তিনটি চুক্তির অধীনে কয়লা উৎপাদন বর্তমান অবধি অব্যাহত রয়েছে। প্রথম চুক্তিকালে (২০০৫ থেকে ২০১১) গড়ে বার্ষিক উৎপাদন ছিল ৬ লাখ ৮ হাজার এবং এই সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লার প্রকৃত চাহিদা ছিল গড়ে বার্ষিক ৪ লাখ ৪৪ হাজার টন। দ্বিতীয় চুক্তিকালে (২০১১ থেকে ২০১৭) গড় বার্ষিক উৎপাদন ছিল ৯ লাখ ২০ হাজার টন এবং এ সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লার প্রকৃত চাহিদা ছিল গড়ে বার্ষিক ৫ লাখ ৪০ হাজার টন। অর্থাৎ ২০০৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাহিদা কয়লাখনি থেকে উৎপাদিত কয়লা দিয়েই মেটানো সম্ভব হয়। উপরন্তু বাকি কয়লা অন্যান্য শিল্পে (মূলত ইটভাটা) বিক্রি করা হয়।

কয়লা উৎপাদনের জন্য চীনা কোম্পানির সঙ্গে তৃতীয় চুক্তিটি পরবর্তী চার বছরের (২০১৭ থেকে ২০২১) জন্য করা হয়। ২০১৮ সালে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ২৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তৃতীয় একটি ইউনিট সংযুক্ত করা হয়। এর ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়ে ৫২৫ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। এর জন্য কয়লার প্রকৃত চাহিদা বৃদ্ধি পেয়ে গড়ে বার্ষিক ১২ লাখ টন হয়। অথচ সে অনুযায়ী খনি থেকে উৎপাদিত কয়লার পরিমাণ বৃদ্ধি করা সম্ভব হয় না, বরং তা কমে গড়ে বার্ষিক ৮ লাখ ৪০ হাজার টন হয়। তাই কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরো মাত্রায় উৎপাদনে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না।

ওপরের তথ্যাদি থেকে এটি লক্ষণীয়, ২০০৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বড়পুকুরিয়া খনি থেকে উৎপাদিত কয়লার পরিমাণ খনিমুখে স্থাপিত কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রকৃত চাহিদার চেয়ে বেশি ছিল। বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে ২০১৮ সালে স্থাপিত তৃতীয় একটি ইউনিট সংযুক্ত করার পর বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে কয়লা চাহিদার যে বৃদ্ধি ঘটে, তা মেটানোর জন্য খনি থেকে কয়লা উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়নি। খননকৃত কয়লাস্তরের গভীরতা বৃদ্ধি ও অন্যান্য ভূতাত্ত্বিক কারণে খননের জটিলতা ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি হওয়ায় বরং কয়লা উৎপাদনের হার কমে যায়। বর্তমানে চলমান কয়লাখনির মধ্যবর্তী অংশ থেকে আগামী বছর উৎপাদন শেষ হয়ে যাবে এবং তখন এ অংশ ছেড়ে উত্তর অংশে গিয়ে কয়লা উত্তোলন করতে হবে। এ সময় কয়লা উৎপাদনের হার বর্তমানের তুলনায় আরও কম হবে বলে প্রতীয়মান হয়। সে ক্ষেত্রে বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লার চাহিদা এবং খনি থেকে উৎপাদিত কয়লার পরিমাণ—এসবের ব্যবধান আরও বৃদ্ধি পাবে। তাহলে চাহিদা মেটাতে বাকি কয়লা আসবে কোথা থেকে?

বাংলাদেশে আর কোনো কয়লাখনি নেই, যেখান থেকে বাকি কয়লার জোগান হতে পারে। বিদেশ থেকে রপ্তানি করে বড়পুকুরিয়া পর্যন্ত পৌঁছাতে কয়লার দাম পড়বে অতিরিক্ত বেশি, যা কিনা বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়কে বাড়িয়ে দেবে। কয়লা উত্তোলনের পদ্ধতি
পরিবর্তন করে উৎপাদন বৃদ্ধি করার কোনো পরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়। সুতরাং এটি ধরে নেওয়া যায়, কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতার বড় একটি অংশ কেবল অলস বসে থাকবে। তাহলে প্রশ্ন আসে, কয়লার জোগান হবে কি না, তা নিশ্চিত না করে রাষ্ট্রীয় তথা জনগণের টাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রে এ বাড়তি ক্ষমতার তৃতীয় ইউনিটটি স্থাপন করা হয় কোন যুক্তিতে। বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রে তৃতীয় ইউনিট যোগ করার জন্য বাড়তি কয়লা জোগানের নিশ্চয়তা তারা দেয়নি। তাহলে এর দায় কার ওপর বর্তায়, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

ড. বদরূল ইমাম অনারারি অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন