বিজ্ঞাপন

বিশ্বব্যাপী অনলাইনভিত্তিক বাজার আমাজনের মালিক বেজোস এই সফরের পরিকল্পনা করছেন তাঁর শৈশবের স্বপ্নপূরণের জন্য। তবে এর পেছনেও বাণিজ্য রয়েছে। ক্যাপসুলে করে মহাশূন্যে গিয়ে জিরো বা মাইক্রোগ্র্যাভিটি অনুভবের আর পৃথিবীকে অবলোকন করার শখ রয়েছে বহু মানুষের (সবিনয়ে বলে রাখি, আমার নিজেরও)। অল্পসংখ্যক হলেও এটি পূরণের সামর্থ্য আছে কিছু মানুষের। ১০ থেকে ২০ বছর পর আমরা গরিবেরা যেমন কক্সবাজার গিয়ে বেলুনে চড়ে শখ মেটাই, তঁারা তেমনি মহাশূন্যের ক্যাপসুলে চড়ে শখ মেটাবেন। এভাবে বেজোসের কোম্পানিও একসময় লাভজনক হয়ে উঠবে। তা ছাড়া বেজোস বিশ্বাসও করেন, মানুষের আলটিমেট ঠিকানা হবে মহাশূন্য পাড়ি দিয়ে অন্য কোথাও—চাঁদ, মঙ্গল গ্রহ বা বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপা ধরনের কোথাও।

বড়লোকদের (সম্পদশালী অর্থে) এসব কাণ্ডকারখানার খবর পড়ি মাঝেমধ্যে। তাঁদের কেউ বেলুনে চড়ে আটলান্টিক পাড়ি দেন, কেউ সারা
জীবনের সম্পদের সিংহভাগ দিয়ে দরিদ্র মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য ফাউন্ডেশন গড়ে তোলেন, কেউ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বা বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রতিরোধে নিজের সামর্থ্য বিলিয়ে দেন।

এসব পড়ি আর আমাদের বড়লোকদের কথা ভাবি। আমাদের দেশের বড়লোকেরা খবরের শিরোনাম হন অন্যভাবে। বেনামিভাবে এক দল খবরে আসেন শেয়ারবাজারে কারসাজি করে, ব্যাংক লুট করে, টাকা পাচার করে, অতি মূল্যায়িত প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করে। নিজ নিজ নামে কখনো তাঁরা পত্রিকার শিরোনাম হন খুনখারাবি করে, হুমকি–ধমকি দিয়ে, মাদক ব্যবসা বা মানব পাচার করে।

জানতে ইচ্ছা করে, অসৎ পথে শত বা হাজার কোটি টাকা বানিয়ে কী করেন তাঁরা? কেমন করে বহাল তবিয়তে থাকেন রাষ্ট্রের আইন–আদালতকে উপেক্ষা করে?

২.

পশ্চিমের অধিকাংশ বড়লোক প্রকাশ্য বড়লোক। প্রযুক্তি বা ব্যবসাকৌশল উদ্ভাবন করে বা নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে নিজের সম্পদ জানান দিয়ে তাঁরা বড়লোক। কিন্তু পুরোপুরি বৈধভাবে উৎপাদন, ব্যবসা বা রপ্তানি করে বড়লোক হয়েছেন—এমন লোক বাংলাদেশে খুব কম। এ দেশে অধিকাংশই বড়লোক হয়েছেন খারাপ পথে। কখনো মাদক বা মানব পাচারের ব্যবসা করে, মানুষের সর্বনাশ করে। তাঁরা বড়লোক হন চুরি করে, অধিকাংশই বড়লোকি জীবন যাপন করেন চোরের মতো করে। যাঁদের ক্ষমতাও আছে, তাঁরা জীবন যাপন করেন ডাকাতের মতো করে।

আমাদের দেশের বড়লোকেরা অসৎ পথে টাকা উপার্জন করে থেমে থাকেন না। দেশে শিল্পকারখানা গড়ে তুলে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখার পরিবর্তে তাঁরা অধিকাংশ অর্থ পাচার করে দেন বিদেশে। এর সঠিক পরিমাণ কত, তা আমরা জানি না। তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির হিসাব অনুসারে শুধু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে ২০১৫ সালে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। ক্রমবর্ধমান এই অঙ্ক কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, তা আমাদের আর জানার উপায় হয়নি সরকারের কাছে থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের তথ্য না পাওয়ার কারণে।

অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি বিরোধী দলের কাছে এই পাচারকারীদের নাম জানতে চেয়েছেন। এটি আমি একটি রসিকতা হিসেবে নিয়েছি। কারণ, আমার ধারণা, এই পাচারকারীরা কারা, তা সরকার জানে অনেকাংশে। সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক আমলে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক চুক্তিতে বাংলাদেশ সরকার পক্ষ হওয়ার পর এবং দুর্নীতিবিরোধী আইনের সংস্কার করার পর যে ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট গঠন করা হয়, তার মাধ্যমে এ বিষয়ে কিছু তথ্য ইতিমধ্যে পাওয়া গেছে। প্রথম আলোর শওকত হোসেনের লেখায় পড়েছিলাম, পাচারকারীরা দেশের বাইরে এই টাকা দিয়ে কোথায় বাড়ি কিনেছেন বা বিনিয়োগ করেছেন, সেগুলোর বিবরণও আছে ইউনিটের প্রতিবেদনে।

পাচার সম্পর্কে আরও তথ্য জানারও সুযোগ রয়েছে এই ইউনিটের মাধ্যমে। এগমন্ট গ্রুপের সদস্য হিসেবে অন্য দেশগুলোর ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ বাংলাদেশের রয়েছে। পাচার করা অর্থ যেসব দেশে (যেমন সুইজারল্যান্ড) সাধারণত রাখা হয়, সেগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করেও বহু তথ্য জানা যায়। দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, সিআইডির মাধ্যমে তদন্ত করা যায়। ব্যাংকের টাকা মেরে দেওয়া মানুষকে গ্রেপ্তার করে উপযুক্ত জিজ্ঞাসাবাদ করলে জানা যায় আশপাশের মানুষের তথ্য।

তবে এসব জেনে কোনো লাভ নেই, যদি না সরকারের ব্যবস্থা গ্রহণের আগ্রহ থাকে। সেটাই যে নেই, এর একটি বড় প্রমাণ আমরা দেখি পি কে হালদারের ঘটনার ক্ষেত্রে। সরকারি আনুকূল্যে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা পাচার করে এই লোক পালিয়ে গেছেন প্রায় বিনা বাধায়।

এটা একটা উদাহরণ মাত্র। কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি ব্যাংক, শেয়ারবাজার, অতি মূল্যায়িত প্রকল্প থেকে শত শত কোটি টাকা মেরে দেওয়া বা অনুপার্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করার বহু প্রতিবেদন আমরা পত্রিকায় দেখেছি। সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদে জড়িত ব্যক্তি হিসেবে যাঁদের নামে অভিযোগ উঠেছিল, তাঁদের কেউ শাস্তি পাননি; বরং তাঁদের কেউ কেউ সরকারের বড় পদে আসীন হয়েছেন বা মনোনয়ন কিনে বিনা ভোটে এমপি হয়েছেন, সরকারি আনুকূল্যে আরও বড় বড় ব্যবসা পেয়েছেন।

৩.

পশ্চিমের বড়লোকেরা ধোয়া তুলসীপাতা নন। তাঁদের কারও কারও বিরুদ্ধে শ্রমিককে ঠকানো বা শোষণ করার অভিযোগ ওঠে, যৌন কেলেঙ্কারির খবরও আসে কখনো কখনো। কিন্তু অপরাধ করলে তাঁরা বিচারের সম্মুখীন হন, বিনা বিচারে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ান না বা
বিস্ময়কর দ্রততায় ছুটির দিনে জামিন পান না। জেফ বেজোস, ইলন মাস্ক, ওয়ারেন বাফেটের মতো ধনকুবেরদের বিরুদ্ধে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। কিন্তু এসব তাঁরা করেন ট্যাক্স ডিডাকশন, ট্যাক্স ক্রেডিটসহ প্রচলিত আইনের বিভিন্ন ফাঁকফোকর ব্যবহার করে। অবৈধভাবে এটি করলে অবশ্যই তাঁদের বিচারের সামনে দাঁড়াতে হয়।

পশ্চিমের বড়লোকেরা তাই বলে ব্যাংকের টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করেন না, অনুপার্জিত অর্থ উৎকোচ হিসেবে প্রদান করে দেশের আইনপ্রণেতা বনে জান না, খুনখারাবি করে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখানোর সুযোগ পান না। শুধু নিজের পরিবারের কথা ভেবে সব টাকা অন্য দেশে পাচার করেন না।

আমাদের অধিকাংশ বড়লোকের চোখ অন্য রকম। তাঁদের চোখ এ দেশের কৃষক, প্রবাসী, পোশাকশ্রমিক আর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যে সম্পদ, মূলধন আর রেমিট্যান্স গড়ে তোলেন, তার ওপর। তাঁদের অর্থ মেরে দিয়ে নিজেদের সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন তাঁরা প্রবাসে।

জেফ বেজোসের মতো ঊর্ধ্বমুখী নয়, তাঁদের চোখ নিবদ্ধ থাকে পূতিগন্ধময় বিত্তের দিকে।

আসিফ নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন