বিজ্ঞাপন

৩. তবে সবচেয়ে বড় বোকা হলেন আপনি নিজে। গত বছর এক ঘোড়াওয়ালা এসে আপনার কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে গেছে। সে নাকি তুরস্ক থেকে আপনার জন্য ঘোড়া নিয়ে সামনের বছর আসবে। অচেনা–অজানা বিদেশি ঘোড়াওয়ালাকে যে বিশ্বাস করে আগাম টাকা দিতে পারে, সেই হলো সবচেয়ে বড় বোকা।

বাদশাহ বললেন, কিন্তু আগামী বছর যদি সত্যি সত্যি ঘোড়া নিয়ে লোকটা আসে? বীরবল বললেন, তাহলে বোকার তালিকার এক নম্বর জায়গা থেকে আপনার নামটা কেটে ওই ঘোড়াওয়ালার নাম বসিয়ে দেব।

বাদশাহ বললেন, না না বীরবল, তুমি আসল এক নম্বর বোকা ধরে আনো। যাও। আবার যাও।

বীরবল বেরিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর দুই বোকাকে ধরে আনলেন। বললেন, হুজুর নামদার, পেয়েছি। এরাই সর্বকালের সেরা বোকা।

বাদশাহ বললেন, কী করেছে এরা?

বীরবল বললেন, বলছি। তার আগে বাংলাদেশের বাজেট নিয়ে একটু আলোচনা হয়ে যাক।

অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। কেউ বলছেন, এটা হলো ব্যবসাবান্ধব বাজেট। কেউ বলছেন, বাজেটে গরিবের কথা নেই।

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ১০ কোটি মানুষকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধক টিকা দেওয়া হবে। কিন্তু তিনি মাসে ২৫ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়ার জন্য পরিকল্পনা নিয়েছেন। ২৫ লাখ মানুষ যদি মাসে ৫০ লাখ ডোজ টিকা পায়, তাহলেও অর্থমন্ত্রীর পরিকল্পনা অনুসারেই ১০ কোটি মানুষের টিকা পেতে লাগবে সোয়া তিন বছর। আর যদি ২৫ লাখ লোক মাসে এক ডোজ করে টিকা পায়, তাহলে ১০ কোটি মানুষের টিকা পেতে লাগবে সাড়ে ছয় বছর। ব্যবসাবান্ধব বাজেট দিয়ে কী হবে, যদি দোকানপাটে ক্রেতা না থাকে! শিল্পমুখী বাজেট দিয়ে কী হবে, যদি কারখানায় শ্রমিকেরা যেতে না পারে? শিক্ষার জন্য বরাদ্দ রেখে কী হবে, যদি স্কুল-কলেজ খোলা না যায়! স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ দিয়ে কী হবে, যদি করোনার কারণে হাসপাতালগুলোতে ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই অবস্থা বজায় থাকে? পরিবহনবান্ধব বাজেট দিয়ে কী হবে, যদি সারা দেশে লকডাউনই বজায় রাখতে হয়! তার মানে যা কিছুই করা হোক না কেন, প্রথমে করোনামুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

যুক্তরাজ্য করোনায় মৃত্যুশূন্য দিন অর্জন করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ৪ জুলাই তাদের স্বাধীনতা দিবস থেকে করোনামুক্ত দিন উদ্‌যাপন করার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে।

ফ্রান্স হোটেল–রেস্তোরাঁয় বসে খাওয়ার দিন শুরু করেছে।

এসবই তারা করতে পারছে অনেক মৃত্যু, অনেক রোগশোকের পর। কারণ, তারা টিকা দিয়েছে ব্যাপক হারে।

বাংলাদেশকেও যদি সামনে এগোতে হয়, প্রথমে যা করতে হবে তা হলো ১০ কোটি মানুষকে ইমুনাইজ করা। টিকা দেওয়া। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে পৃথিবীর পথপ্রদর্শক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ সম্মাননায় ভূষিত করেছে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন। আমাদের প্রতি মাসে দুই কোটি মানুষকে টিকা দেওয়ার সক্ষমতা আছে। এখন দরকার টিকা আনা। মাসে অন্তত দুই কোটি ডোজ টিকা আনতে হবে। তাহলে ১০ মাসে ১০ কোটি মানুষকে টিকা দেওয়া যাবে।

এক হাজার টাকা করে টিকাপ্রতি খরচ হলে ২০ কোটি টিকার জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা লাগবে।

এই ব্যবস্থা না করে কৃষিবান্ধব, শিল্পবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব, নারীবান্ধব, স্বাস্থ্যবান্ধব, গরিববান্ধব, সাংবাদিকবান্ধব—যে বান্ধব বাজেটই করুন না কেন, ফল দাঁড়াবে শূন্য।

বীরবল বললেন, হুজুর, এই দুজন কেন সবচেয়ে বড় বোকা সেটা বলি। আমি রাস্তায় গিয়ে দেখি, দুই লোক ঝগড়া করছে।

এক লোক বলছে, ইশ্‌, আমার যদি একটা সুন্দর লাল ঘোড়া থাকত, সেটাতে চড়ে আমি দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াতাম।

আরেক লোক বলছে, আমার যদি একটা বাঘ থাকত, তাহলে বেশ হতো।

কী হতো?

তোর ঘোড়াটার সামনে ছেড়ে দিতাম। তোর ঘোড়া আমার বাঘের পেটে যেত।

খবরদার, আমার ঘোড়ার সামনে বাঘকে ছাড়বি না।

অবশ্যই ছাড়ব। আমার বাঘ, আমি যেখানে খুশি ছাড়ব।

তখন দুই লোকের মারামারি লেগে গেল।

আমার ঘোড়া তোর বাঘ খেতে পারবে না।

অবশ্যই পারবে। তোর ঘোড়াকেই খাবে। চিবিয়ে চিবিয়ে খাবে।

যে ঘোড়া নেই, সেই ঘোড়া যে বাঘ নেই সেই বাঘ খাবে বলে যারা ঝগড়া করে, তারা হলো সবচেয়ে বোকা।

করোনার ভয়াবহ বিস্তার যদি আমরা রোধ করতে না পারি, এই সব বাজেট বরাদ্দ রেখে কোনো লাভ নেই। ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ করে আগে টিকা আনতে হবে। বিভিন্ন দেশ থেকে আনতে হবে। বাংলাদেশে করোনার টিকা গবেষণাকে এগিয়ে নিতে পারলে আরও ভালো। দেশেও যারা আগ্রহী ও সক্ষম, তাদের মানসম্পন্ন টিকা উৎপাদনে সহায়তা ও নজরদারির ভেতরে আনা যেতে পারে। এখন এক নম্বর অগ্রাধিকার হলো টিকা দেওয়া। ১০ কোটি লোককে ইমুনাইজ করা।

সবচেয়ে বড় বোকা সে, টিকার ব্যবস্থা করে না যে...

আনিসুল হক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন