default-image

করোনাভাইরাস বিশ্ব সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) একটি প্রতিবেদনে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, ‘ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন শ্বাসকষ্টজনিত মহামারি’ শিগগিরই ছড়িয়ে পড়তে পারে, যার কারণে পাঁচ থেকে আট কোটি মানুষের মৃত্যুর ঝুঁকি আছে। এরপরই মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায় এবং বিশ্ববাণিজ্য ও অর্থনীতি বড় ধরনের ঝাঁকি খায়।

গত দুই শ বছরের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে, নিজেদের জনসাধারণকে আস্থায় নিয়ে সরকারগুলো যদি সমন্বিত প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলে, শুধু তাহলেই এ ধরনের মহামারি মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে। বর্তমানে করোনাভাইরাস (যেটির নতুন নাম দেওয়া হয়েছে কোভিড ১৫) মোকাবিলায় শুধু চীনকে নয়, গোটা বিশ্বকেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। এখন রাজনৈতিক নেতারা মূলত তিনটি সমস্যার মুখে পড়েছেন।

প্রথম সমস্যা হলো, মহামারি মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ও বিজ্ঞানভিত্তিক কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়ে রাজনীতিকেরা শতধাবিভক্ত। ভারত, নাইজেরিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ এখন তাদের বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে স্বাস্থ্যবিষয়ক তল্লাশিচৌকি বসিয়েছে। যাঁরা তাদের ভূখণ্ডে ঢুকছেন, তাঁদের গায়ে জ্বর আছে কি না, তা তারা পরীক্ষা করে দেখছে। কারও গায়ে অস্বাভাবিক জ্বর ধরা পড়লে তাঁকে অধিকতর পরীক্ষার জন্য নেওয়া হচ্ছে। এখন কথা হচ্ছে কোনো ভ্রমণকারী যদি ওষুধ খেয়ে শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে ফেলেন, তাহলে তাঁকে ধরা কঠিন হবে। অন্যদিকে চীনের গবেষকেরাই বলছেন, কোভিড-১৯ ভাইরাসটি কারও দেহে সংক্রমিত হওয়ার পরবর্তী ২৪ দিন পর্যন্ত রোগলক্ষণ প্রকাশ না–ও পেতে পারে। অর্থাৎ, এমনও হতে পারে, যে ব্যক্তি ভাইরাসটি বহন করছেন, তাঁর রোগলক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগেই তিনি এসব দেশে এসে থাকতে পারেন। তার কয়েক দিন পর রোগলক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে।

গত ৩১ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এক আদেশে ওই দিন (৩১ জানুয়ারি) থেকে ১৪ দিন আগে চীনে ভ্রমণ করেছেন এমন লোকদের (অবশ্য মার্কিন নাগরিকেরা এর অন্তর্ভুক্ত নয়) যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ নিষিদ্ধ করে। আরও কয়েকটি দেশও একই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। কিন্তু যে উদ্দেশে তারা এ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, ফল তার উল্টো হতে পারে। চীনের বিষয়ে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞাকে হয়তো সমর্থন করা যেতে পারে। কিন্তু এতে চীনের প্রতিবেশী গরিব দেশগুলো একই ধরনের নিষেধাজ্ঞায় পড়ার ভয় পেয়ে এ ভাইরাসের সংক্রমণের তথ্য চেপে যেতে পারে। অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ার ভয়ে তারা যদি তথ্য গোপন করে, তাহলে এর সংক্রমণ দ্রুত ভয়াবহ জায়গায় চলে যাবে।

যেকোনো মহামারি মোকাবিলার আদর্শ নিয়ম হচ্ছে, যে দেশে রোগের সংক্রমণ শুরু হয়, তাকে সত্যিকার তথ্য প্রকাশে উৎসাহিত করা। চীনের বিশেষজ্ঞরা কোভিড-১৯ ভাইরাসটি শনাক্ত করেছেন এবং বাকি বিশ্বকে এ সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন, যাতে বিশ্বের অন্য গবেষকেরা দ্রুততম সময়ে এর ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে ফেলতে পারে। এ অবস্থায় প্রতিটি দেশকেই এ সমস্যাকে নিজের সমস্যা বলে ধরে নিতে হবে।

দ্বিতীয় সমস্যা হলো, সরকারগুলোর যোগাযোগের সমন্বয়হীনতা। মহামারি প্রতিরোধে নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ অত্যন্ত দরকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষ রাজনীতিকদের ভাষ্যকে বিশ্বাস করে না। সে কারণে তারা তথ্যের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দিকে নজর দেয়। সামাজিক মাধ্যম সত্যকে প্রকাশ করতে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ দেয়। যেমন উহানে আমরা দেখেছি, স্থানীয় কর্মকর্তারা প্রথম দিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের খবর প্রকাশ না করার জন্য চিকিৎসকদের হুমকি দিয়েছেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো যখন আসল চিত্র দেখাতে শুরু করল, তখন কর্মকর্তারা আর আগের মতো করোনাভাইরাসের খবরকে ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিতে পারলেন না। চীনা কর্মকর্তারা প্রথমে বলেছিলেন, মাউথওয়াশ, নাকের স্প্রে এবং তিলের তেল দিয়ে এ ভাইরাস প্রতিরোধ করা যায়। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সম্প্রতি এ দাবি উড়িয়ে দিয়েছে। সংস্থাটি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলাপ–আলোচনা করছে, যাতে করোনাভাইরাস–সংক্রান্ত খবরাখবর নির্ভরযোগ্য করা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাতে ভুয়া খবর না ছড়ায়, সে জন্য এ উদ্যোগকে বিশ্বের সব রাজনীতিকের সহযোগিতা করা দরকার।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের সুযোগ নিয়ে অনেক সময় বিদেশি-বিদ্বেষীরা তৎপর হয় এবং এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করে। এ ধরনের বিদেশি-বিদ্বেষী প্রতিক্রিয়া মোকাবিলায় রাজনীতিবিদ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোকে এক হয়ে কাজ করা দরকার।

সর্বশেষ সমস্যাটি হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মহামারি প্রতিরোধে সরকারগুলো অনেক সময় আর্থিক সম্পদের চেয়ে স্বাস্থ্য সম্পদকে বেশি গুরুত্ব দিতে ব্যর্থ হয়। রাজনীতিকদের মধ্যে অনেক সময় রোগ প্রতিরোধে যতটা না মনোযোগী হতে দেখা যায়, তার চেয়ে বেশি তাদের নতুন ঝকমকে হাসপাতাল গড়ে কৃতিত্ব দাবি করার বিষয়ে বেশি আগ্রহী হতে দেখা যায়। অনেক দেশের সরকারকেই রোগ প্রতিরোধের গবেষণা বরাদ্দে কাটছাঁট করতে দেখা যায়।

তবে ভালো খবর হলো, সার্স, এইচওয়ানএনওয়ান, মার্স, ইবোলা এবং জিকা ভাইরাসের প্রকোপের পর সরকারগুলো মহামারি প্রতিরোধের প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। ২০১৪ সালে ইবোলা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন হোয়াইট হাউস ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের অভ্যন্তরে গ্লোবাল হেলথ সিকিউরিটি নামের একটি পরিদপ্তর খোলে। এই পরিদপ্তর বৈশ্বিক মহামারি প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক, জাতীয়, প্রাদেশিক ও স্থানীয় পর্যায়ের সরকারি-বেসরকারি কর্তৃপক্ষের মধ্যে হোয়াইট হাউসের সরাসরি সমন্বয়ের ব্যবস্থা করত।

খারাপ খবর হলো, গত বছর ট্রাম্প সেই কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি মহামারি প্রতিরোধে গঠিত ইউএস সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন তহবিলের বরাদ্দ কাটছাঁট করেছেন। যখন অন্য অনেক দেশ একটি ভাইরাস শনাক্ত করতে পারে না, তখন যুক্তরাষ্ট্র তা খুব দ্রুত শনাক্ত করতে সক্ষম।

এখন কোভিড-১৯ ভাইরাস যে মাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছে, তা প্রতিরোধ করা চীনের একার পক্ষে সম্ভব হবে না। বিশ্বের সব সরকারকে সমন্বিতভাবে এ লড়াই চালাতে হবে। তবে এ লড়াইয়ে শামিল হতে কোনো দেশের ওপর জোর খাটালে সে দেশের উগ্র জাতীয়তাবাদী ও সংরক্ষণবাদী হয়ে ওঠার ঝুঁকি আছে। এ ছাড়া স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ নিলে সুফল পাওয়ার পরিবর্তে উল্টো ক্ষতি হওয়ারও ঝুঁকি আছে। তাই পুরো প্রক্রিয়াকে সতর্কভাবে সামাল দিতে হবে।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
নাইরি উডস: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ব্লাভান্টিক স্কুল অব গভর্নমেন্টের ডিন

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন