বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তালেবানের ক্ষমতা দখলকে ‘দাসত্বের শৃঙ্খল ছিঁড়ে ফেলা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অনেক আগে থেকেই বলা হচ্ছিল, ‘তালেবানশাসিত আফগানিস্তান হবে পাকিস্তানেরই সৃষ্টি।’ ইমরানের বক্তব্যে এই জনধারণা আরও জোরালো হয়েছে।

১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবান যখন আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ছিল, তখন তাদের ‘ইসলামি আমিরাত’ মূলত পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছিল। এই দফায় আফগানিস্তানে আইএসআইয়ের ততটা প্রভাব না থাকলেও তালেবান সরকার গঠনের পরপরই আইএসআই প্রধানের কাবুল সফরে কোনো বেগ পেতে হয়নি।

এবারের আরও গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চীন কোনো রকম রাখঢাক না করেই আফগানিস্তানে নিজের উপস্থিতির জানান দিয়েছে। চীন তার আন্তর্দেশীয় বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অংশ হিসেবে চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর (সিপিইসি) নির্মাণে ৬ হাজার ২০০ কোটি ডলার ইতিমধ্যে বিনিয়োগ করেছে এবং এই প্রকল্প তালেবান উগ্রপন্থীরা কোনোভাবে অকার্যকর করে কি না, তা নিয়ে তারা কিছুটা দুশ্চিন্তায়ও আছে। খুবই লক্ষণীয় বিষয়, গত জুলাইয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবানের একটি প্রতিনিধিদলকে উষ্ণভাবে স্বাগত জানিয়ে তাঁদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ মাথায় নিয়ে চীন ঘোষণা করেছে, তারা তালেবান সরকারের সঙ্গে কাজ করতে রাজি আছে। তারা আফগানিস্তানের অনাবিষ্কৃত খনিজ সম্পদ আহরণ করতে, বিশেষ করে তারা আফগানিস্তানের মেস আয়নাক তামার খনি আবার চালু করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এমনকি সিপিইসি প্রকল্পকে আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত করার বিষয়েও কথা চালাচালি হচ্ছে।

আফগানিস্তানের নতুন উপপ্রধানমন্ত্রী মোল্লা আবদুল গনি বারাদারের মধ্যস্থতায় চীনের সঙ্গে আফগানিস্তানের আলোচনা চলছে। নিজের দেশের সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর চীন নির্যাতন চালালেও তারা মোল্লা আবদুল গনি বারাদারকে চীন ‘আস্থাশীল বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। চীন তালেবান সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে দুটি প্রধান শর্তে। প্রথমত, আফগান সরকার জিনজিয়াং প্রদেশের মুসলিম উইঘুর সম্প্রদায়ের কাউকে আশ্রয়–প্রশ্রয় দেবে না বা তাদের কোনোরকম সহায়তা দেবে না। দ্বিতীয়ত, সিপিইসি বাস্তবায়নে তালেবান কোনো ধরনের বাগড়া দেবে না।

তালেবান সরকারের সঙ্গে চীন ও পাকিস্তানের এ ঘনিষ্ঠতা ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের মাথাব্যথার বড় কারণ হয়ে উঠেছে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন থেকেই ভারতের বিরুদ্ধে তৎপর থাকা সশস্ত্র জঙ্গিগোষ্ঠীকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে থাকে। ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলায় সন্ত্রাসীদের এই দেশ মদদ দিয়েছিল বলে একটি ধারণা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। অন্যদিকে ভারতের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী চীন। বলা যায়, ভারতের জন্য অর্থনৈতিক, সামরিক ও সমরকৌশলের দিক থেকে বড় ধরনের হুমকি চীন। সেদিক থেকে দেখলে যেকোনো আদলে চীন-পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মধ্যে একটা জোট হলে তা ভারতের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে যাবে।

আফগানিস্তানের সরকারে তালেবানের থাকা পাকিস্তানকে ভারতের বিরুদ্ধে শুধু সামরিক শক্তির ‘কৌশলগত গভীরতা’ দেবে না, বরং ভারতের বিরুদ্ধে লড়াই চালানো সন্ত্রাসী ও উগ্রপন্থীদের আগের চেয়ে বেশি ভারতবিরোধী তৎপরতা চালাতে সহায়তা দিতে পারবে।

ভারত আফগানিস্তানে বাঁধ, মহাসড়ক, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, হাসপাতাল, স্কুল, এমনকি আফগানিস্তানের পার্লামেন্ট ভবন নির্মাণ বাবদ ৩০০ কোটি ডলার খরচ করেছে। এখন সবকিছুর ওপর তালেবান সরকারের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় ভারতের নীতিনির্ধারকেরা হতাশা বোধ করছেন। অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদির সরকার মুসলমানদের বিষয়ে কী দৃষ্টিভঙ্গি রাখেন, সে বিষয়ে মুসলিম বিশ্ব ক্ষুব্ধ হয়ে আছে। সেই ক্ষোভ প্রশমনে তিনি দৃশ্যমান কিছুই এখন পর্যন্ত করেননি।

এই দফায় ইরানের অতি রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির সরকার তালেবান সরকারকে ততক্ষণ স্বীকৃতি দেবে বলে মনে হচ্ছে, যতক্ষণ তালেবান তাদের শিয়া নির্যাতন থেকে নিজেদের দূরে রাখবে। আফগানিস্তানের শিয়া হাজারা সম্প্রদায় এবং পারসিকরা যদি তালেবানের আগের আমলের মতো নির্যাতনের শিকার না হয়, তাহলে তালেবান সরকারের বিষয়ে ইরান মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে পারে। ইরান ও রাশিয়া এখন তালেবানের জয়ে এই ভেবে আনন্দ পাচ্ছে, এখানে যুক্তরাষ্ট্র একটা উচিত শিক্ষা পেয়ে পালিয়েছে।

গত জুনে দোহায় তালেবান নেতাদের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেখা করেছিলেন বলে একটি কথা উঠেছিল এবং সে কথা ভারত অস্বীকার করে আসছে। তবে আবদুল গনি বারাদার এবং তালেবান সরকারের বর্তমান উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ আব্বাস স্তানিকজাইয়ের সঙ্গে ওই সময় যে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা বৈঠক করেছিলেন, তাতে সন্দেহ নেই। এসব বিবেচনায় নিয়ে ভারত সরকার কাবুলের নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করে দেখতে পারত।

বারাদার আট বছর পাকিস্তানের জেলখানায় কাটিয়েছেন এবং তিনি নিশ্চয়ই তাঁকে আটককারী লোকদের ভালোবাসেন না। তবে তালেবান সরকারের দৃষ্টিতে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের পার্থক্য আছে। তালেবানের কিছু কর্মকর্তা যদিও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার পক্ষে কথা বলছেন, তবে কিছু নেতা বলছেন, ভারতের মুসলমানদের অধিকার নিয়ে, বিশেষ করে কাশ্মীরের মুসলমানদের নির্যাতন–নিপীড়নের শিকার হওয়া নিয়ে তাঁরা কথা বলবেন।

ভারত আফগানিস্তানে বাঁধ, মহাসড়ক, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, হাসপাতাল, স্কুল, এমনকি আফগানিস্তানের পার্লামেন্ট ভবন নির্মাণ বাবদ ৩০০ কোটি ডলার খরচ করেছে। এখন সবকিছুর ওপর তালেবান সরকারের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় ভারতের নীতিনির্ধারকেরা হতাশা বোধ করছেন। অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদির সরকার মুসলমানদের বিষয়ে কী দৃষ্টিভঙ্গি রাখেন, সে বিষয়ে মুসলিম বিশ্ব ক্ষুব্ধ হয়ে আছে। সেই ক্ষোভ প্রশমনে তিনি দৃশ্যমান কিছুই এখন পর্যন্ত করেননি।

ভারত মহাসাগরকে শত্রুমুক্ত রাখতে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া মিলে কোয়াড গঠন করেছে। কিন্তু ভারতের আসল হুমকি চীন ও পাকিস্তান লাগোয়া সীমান্তে যেখানে কোয়াডের আদতে কিছুই করার নেই।

দেখা যাচ্ছে, ভারত এখন রীতিমতো শত্রু পরিবেষ্টিত। উত্তর-পশ্চিমে রয়েছে তালেবান প্রশাসন, পশ্চিমে পরমাণু অস্ত্রধারী ও সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন দেওয়া পাকিস্তান এবং উত্তর–পূর্বে পারমাণবিক সুপারপাওয়ার চীনের কারণে সীমান্তের অখণ্ডতাই হুমকির মুখে আছে। এ অবস্থায় আগামী দিনগুলোতে ভারতের সামনে জাতীয় প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ইস্যুতে ভারতকে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

শশী থারুর জাতিসংঘের সাবেক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ও ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন