default-image

কিশোর গ্যাং এখন এক বদনামির নাম। ‘গ্যাং কালচার’ ভয়ের শাসনেরই কৈশোরিক প্রতিবিম্ব। এমন দিন ছিল, যখন একটি ‘কিশোর গ্যাং’ ছেলে-বুড়ো সবার কাছে প্রিয় ছিল। সেই কিশোর গ্যাংয়ের নাম ছিল তিন গোয়েন্দা। দলটির প্রধানের নামও কিশোর। আমাদের কিশোরকালে কিশোর তার দুই বন্ধু মুসা ও রবিন আর তাদের বান্ধবী জিনার মতো হতে চাইতাম আমরা। এখন কিশোর গ্যাংয়ের নায়কের নাম টিকটক ‘অফু ভাইয়া’ প্রভৃতি। তিন গোয়েন্দারা একধরনের স্বেচ্ছাসেবী, তারা আপন বুদ্ধির বলে অপরাধীদের পরিকল্পনা বানচাল করত, পুলিশকে সাহায্য করত তাদের পাকড়াও করতে। এখন আমাদের পুলিশ পাকড়াও করছে অজস্র কিশোরকে। সড়কে নিরাপত্তা আন্দোলনে যারা দেশটাকে উজ্জীবিত করেছিল, সেসব কিশোর-কিশোরীরা হারিয়ে গেছে। ওই আন্দোলনে তারা দাঁড়িয়েছিল দমনের বিরুদ্ধে। আজ তারাই দমিত হচ্ছে নিজস্ব হতাশায়, অসুস্থ বাসনায় কিংবা কিশোর গ্যাং-বিরোধী অভিযানে।

মাঝখানে কী ঘটল? তিন গোয়েন্দার বিনোদন ছিল অপরাধপ্রবণতার বিরুদ্ধে। এখনকার অনেক কিশোরের বিনোদনই হলো একধরনের অপরাধ। তোমার ভয়ই আমার আনন্দ, আমার ক্ষমতা—এই হলো তাদের মানসিকতা। ভয়ের শাসনের দাপট পরিবার থেকে সমাজ ও রাষ্ট্র পর্যন্ত। ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, গুম-হত্যা ও নির্যাতনের যে চর্চা চলছে দেশে তারই নকল এইসব কিশোর গ্যাংয়ের চালচলনে। পড়ালেখায় আনন্দ নেই, আনন্দ নেই পরিবারে। আবেগ আসে না রাজনীতি থেকে, আবেগ আসে না কোনো কিছু থেকে। এরকম ‘আটকে পড়া ফিলিং’ থেকে বেরুবার ইচ্ছা থেকে আসে গ্যাংবাজি কালচার।

বিজ্ঞাপন
প্রথম আলোর কিশোর অপরাধ নিয়ে প্রতিবেদনে পুলিশের বরাতে জানানো হচ্ছে, ঢাকার ১০টি কুখ্যাত কিশোর গ্যাংয়ের ৮টিই দুর্বৃত্ত রাজনীতির বড় ভাইদের সঙ্গে জড়িত। সমাজ-রাজনীতির অপরাধীকরণ ঘটলে কিশোরেরা কীভাবে তার বাইরে থাকবে?

উঠতি বয়সের কিশোরেরা দাপুটে মাচো বা ‘ব্যাটাগিরি’ ভালোবাসে। তারা বীর নায়ক হতে চায়। যে নিষ্ঠুরতা আর দম্ভ তারা বড়দের জগতে দেখে, মনে করে তারা, ওরকমই তো হওয়া ভাল। সুস্থ সমাজে তাদের এই অভিলাষ পূরণ হয় সুস্থ পথে। রোমাঞ্চকর অভিযান, অন্যায়ের প্রতিরোধ কিংবা জনহিতকর কাজে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু এই সমাজ হয়ে পড়েছে মাইনফিল্ডের মতো। সামাজিক সহিংসতায় বন্ধু বন্ধুকে, পুত্র পিতাকে, প্রতিবেশী প্রতিবেশীকে হত্যা করছে। ঘাতক ও নিহত লোকজনের তালিকাভর্তি তরুণদের নাম। তারুণ্য নিজেই যেমন ঝুঁকিতে, তারাই আবার ঝুঁকিরও সর্বনাম। এখানে-ওখানে এর-ওর মনে বারুদ জমছে। কখন কোথায় সেই বারুদ ফুটবে, তা আগে থেকে বলার উপায় নেই। মা-বাবা অভিভাবকেরা অসহায় হয়ে ছটফট করছেন সন্তানের চিন্তায়।

কিশোর-কিশোরীদের মনের মধ্যে যে তাজা আবেগ ও উদ্দীপনা। এ নিয়ে তারা কী করবে? কোন আনন্দময় শুভকাজে তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে? অনুসরণ করবে কোন রোল মডেলকে? প্রথম আলোর কিশোর অপরাধ নিয়ে প্রতিবেদনে পুলিশের বরাতে জানানো হচ্ছে, ঢাকার ১০টি কুখ্যাত কিশোর গ্যাংয়ের ৮টিই দুর্বৃত্ত রাজনীতির বড় ভাইদের সঙ্গে জড়িত। সমাজ-রাজনীতির অপরাধীকরণ ঘটলে কিশোরেরা কীভাবে তার বাইরে থাকবে? ব্রাজিল দীর্ঘদিন ছিল সামরিক বাহিনী, পুলিশ, মাফিয়া আর মাস্তানির অভয়ারণ্য। সেরকম সময়ে এসবেররই ছোটো সংস্করণ হিসেবে সেখানে কিশোর গ্যাং কালচার গড়ে ওঠে। সিটি অব গড নামে, এ নিয়ে বিখ্যাত একটা সিনেমাও আছে।

এসবের বাইরে ভালো উদাহরণ কিন্তু আছে। প্রায় দুই লাখ কিশোর-কিশোরী প্রথম আলোর গণিত অলিম্পিয়াডে জড়িত। আরও বড় উদাহরণ দেখা যায় ব্রিটেনের সমাজে। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ম্যানচেস্টার সিটির কথা ফুটবল সমঝদার সবাই জানেন। ম্যানচেস্টার ইংল্যান্ডের এক শিল্পশ্রমিকের শহর। ১৯ শতকের মাঝামাঝি এই শহরে তরুণ গ্যাংগুলোর মারামারি আর ছোরা-সন্ত্রাসের মহামারি দেখা যায়। রাস্তায় প্রায়ই দুই গ্রুপের মারামারি লেগে যেত; শিকার হতো সাধারণ পথচারীরাও। ১৮৯০ সালের দিকে শহরটির কিছু দূরদর্শী মানুষ একটা বুদ্ধি করলেন। তাঁরা শহরজুড়ে শ্রমিক যুবকদের ক্লাব তৈরি করে বস্তিবাসী যুবকদের খেলা ও বিনোদনের সুযোগ করে দিলেন। তরুণ বয়সের গরম রক্ত সুস্থ খাতে বয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে মাস্তানি ছেড়ে দিল। মাস্তানির উন্মাদনার জায়গা নিল ফুটবল ‘উন্মাদনা’। সে সময়ই ওই শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ম্যানচেস্টার সিটি ক্লাব। বাকিটা ইতিহাস।

আধুনিক সময়ে ব্রাজিল ও কলম্বিয়া এই কৌশল নিয়ে সফল হয়েছে। মাস্তানপ্রবণ এলাকায় ফুটবল ক্লাব গড়ে দেওয়ার পর দেখা যায়, অপরাধ কমে গেছে। ওসব দেশ যে নিয়মিতভাবে ফুটবল প্রতিভা তুলে আনতে পারে, তার কারণ এসব সমাজমুখী উদ্যোগ। জার্মানির শিক্ষাব্যবস্থা দারুণ এক উদাহরণ। কিশোর-কিশোরীদের বছরের একটা সময় স্বদেশে বা পরদেশে বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে জড়িত হতে দেখা যায়। ওই সময়টা তারা ভিন্ন মানুষের সঙ্গে থেকে তাদের কাছ থেকে শেখে, তাদের সাহায্য করে। তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও বুঝদারি বাড়ে। সবাই ফুটবল বা ক্রিকেট খেলবে তা নয়, সবাই ভাল ছাত্র–ছাত্রী হবে তাও না; কিন্তু একটা ভাল স্রোত তৈরি হলে সেই স্রোত অনেক ময়লাকে ভাসিয়ে নিতে পারবে।

আমাদের কিশোর-তরুণেরা পাড়ায় পাড়ায় গ্যাংবাজি করে বেড়াচ্ছে। খুনোখুনি ও নেশায় নিজেরাও মরছে, দেশটাকেও ভোগাচ্ছে। যে মানসিক জোশ থেকে তারা গ্যাং বানায়, সেই জোশকে খেলাধুলার খাতে, সামাজিক আন্দোলন, শিল্পসাহিত্য-সংগীত, কিংবা পরিবেশ আন্দোলনে নিয়ে যাওয়া কঠিন কিছু না। দুঃখিত, এ ক্ষেত্রেও নেতৃত্বের অভাব। রাজনৈতিক মাফিয়াতন্ত্র সহিংসতার জোশ জিইয়ে রাখছে নিজের গরজে। তাই যে গ্যাংগুলো ফুটবল ক্লাব হয়ে উঠতে পারত, তারা নির্বাচনের মাঠ দখলের পদাতিক হিসেবে প্রশিক্ষিত হচ্ছে।

যে রাজনৈতিক বাস্তবতায় সাবালকেরাই বোবা হয়ে থাকে, সেখানে কিশোর গ্যাংয়ের দাপাদাপি চলতে পারে কিসের জোরে? কথায় বলে ছাগল নড়ে খুঁটির জোরে। তাদের খুঁটিটা কোথায়?

কিশোরেরা অনুকরণপ্রিয়। অতি অল্প বয়সে তারা সহিংসতা, মাস্তানি, ব্যাটাগিরি দেখে অভ্যস্ত হলে সেটাকেই তারা আদর্শ মডেল হিসেবে ধরে নেয়। কিশোরদের বিচ্ছিন্ন গ্রুপ থাকতে পারে। তবে অধিকাংশই বিশেষ কোনো ভাই বা দলের নামের বাহাদুরিতে চলে। পুলিশ এসব ঠিকই জানে। ক্ষমতার পাইপলাইন কাটা পড়লেই গ্যাংবাজির প্রতাপ তলানিতে নেমে আসবে। সব জেনেও তাহলে গণহারে কিশোরদের দৌড়ানির ওপর রাখার কারণ কী? সরকারের কোনো মহল কি কিশোরদের হুমকি মনে করছে? কিশোরদের সম্ভাব্য সংগঠিত হওয়ার বিরুদ্ধে এটা কি তাদের প্রি-অ্যাম্পটিভ অ্যাটাকের কায়দায় আগাম ব্যবস্থা?

কিন্তু যাঁরা নাকি সমাজের অভিভাবক, জাতির দিশারি, মনের বাতিঘর, তাঁরা আরও বিপর্যয় ঠেকাতে আগাম কী করছেন? মা-বাবা, বড় ভাই, বড় বোন, যাঁদের সময় ও সুযোগ আছে কিশোরদের প্রেরণাদায়ী কাজের উদ্যোগ নেওয়ার, তাঁদের টনক নড়বেই বা কবে? বড়রা আমরা যদি আটকে না পড়তাম, তাহলে হয়তো ছোটোদের জন্য পথ করা যেত।

ফারুক ওয়াসিফ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ও লেখক।

faruk.wasif@prothomalo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0