default-image

এবারের বাংলা নববর্ষে জাতিকে আনন্দের ফল্গুধারায় ভাসালেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং। ১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশ থেকে এমবিবিএস ও এফসিপিএস পাস করেছেন। ভুটানের অধিবাসীদের কাছে বিশেষজ্ঞ সার্জন হিসেবে সুপরিচিত ডা. শেরিং কয়েক বছর আগে ডা. ডান্ডি দরজির গঠন করা রাজনৈতিক দলে যোগদান করেন। ভুটানের গত নির্বাচনে তাঁর দল জয়লাভ করে ক্ষমতাসীন হওয়ায় ডা. শেরিং বর্তমানে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী। কিছুদিন আগে তিনি বাংলাদেশ সফরের আগ্রহ প্রকাশ করলে তাঁর ছাত্রজীবনের স্মৃতিবিজড়িত ১০টি বছরের কথা মনে রেখে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাঁকে বাংলা নববর্ষের সময় বাংলাদেশ ভ্রমণের প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি সানন্দে গ্রহণ করেন।

ভুটানের কয়েকজন মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমভিব্যাহারে ডা. শেরিং ১২ এপ্রিল বাংলাদেশে সফর শুরু করলেন। ১২ ও ১৩ এপ্রিল রাষ্ট্রীয় সফরের দায়িত্ব সম্পাদনের পর নববর্ষের দিন ভোরেই মেহমানরা হাজির হয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের আঙিনায় আয়োজিত রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার প্রযোজনায় হাজার কণ্ঠের গানে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে। সেখানে গান শোনার এক ফাঁকে ডা. শেরিংকে বক্তব্য দিতে অনুরোধ জানালে তিনি বাংলা ভাষায় দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান। নববর্ষের দিনে পান্তা-ইলিশের সংস্কৃতি সম্পর্কেও তাঁর অভিজ্ঞতা জানা গেল। তিনি উপস্থিত সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনারা পান্তাভাত খেয়েছেন তো?’ সেদিন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের অনুষ্ঠানেও তিনি সবার মন জয় করেছিলেন আপনজনের মতো হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে।

ভুটান ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এবার ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. শেরিং আরেকবার বাংলাদেশের জনগণের হৃদয় জয় করে দেশে ফিরেছেন। সফরের সময় বাংলাদেশ ও ভুটান অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। আমার কাছে যে বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে সেটি হলো, ভুটানের জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে অদূর ভবিষ্যতে ভারতের সহযোগিতায় ভুটান থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানির সমঝোতার দুয়ার খোলার শুভসংবাদ। তবে বিষয়টি মোটেও সহজ হবে বলে মনে হয় না। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের সম্মতি নিয়ে এই সম্ভাবনাকে যদি এগিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের পথে এক বড় অগ্রগতি সাধিত হবে।

পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, দক্ষিণ এশিয়ায় হিমালয়কন্যা হিসেবে খ্যাত ভুটান ও নেপালের সবচেয়ে বেশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে এই সম্ভাব্য ক্ষমতার ১০ শতাংশও এখনো বাস্তবায়ন করা যায়নি এ অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক জটিলতা ও মারপ্যাঁচে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই দেশে প্রায় ৮৫ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে এবং এর ৯০ শতাংশই এখনো অব্যবহৃত রয়ে গেছে। এই বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করলে তেমন পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কা নেই। এই দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সম্ভাবনার আধার জলবিদ্যুৎ হওয়া সত্ত্বেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তারা একে কাজে লাগাতে পারছে না।

উত্তরের প্রায় অনতিক্রম্য হিমালয় পর্বতমালার বাধা নেপাল ও ভুটানের ভূবেষ্টিত অর্থনীতিকে ভারতের আধিপত্যের কাছে জিম্মি করে রেখেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। হিমালয় পর্বতমালার কয়েকটি গিরিপথ দিয়ে ভুটানের সঙ্গে গণচীনের সীমিত যোগাযোগ সম্ভব হলেও ভারতের বিরাগভাজন হওয়ার ভয়ে দেশটি উত্তরের ওই প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক গাঢ় করতে চায় না। বিশেষত, ভুটানের আয়তন মাত্র ৩৮ হাজার ৩৯৪ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা মাত্র ৮ লাখ ২৪ হাজার ৪৪৬ জন হওয়ায় এই দেশকে কার্যত ভারতের কবজায় থাকা রাষ্ট্র বলা চলে। আরেক প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপাল চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলায় নরেন্দ্র মোদি সরকার যেভাবে ২০১৫-১৬ সালে নেপালের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ সৃষ্টি করেছিল, সেটা ভুটানের জন্য শিক্ষণীয়ও বটে! ২০১৫ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্প সামাল দেওয়ার কঠিন বিপদের সময়ে ভারতের ওই অবরোধ নেপালের অর্থনীতিকে প্রায় ধসিয়ে দিয়েছিল। নেপালের সরকার ও জনগণ ভারতের এহেন আচরণ এখনো বিস্মৃত হয়নি।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক ভারত-পাকিস্তানের শত্রুতামূলক সম্পর্কের কারণে জীবন্মৃত অবস্থায় ঝুলে রয়েছে। বিকল্প হিসেবে প্রায় দুই দশক আগে ভারতের আগ্রহে বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারকে অন্তর্ভুক্ত করে ‘বিসিআইএম ইকোনমিক করিডর’ নামে একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে চীনের কুনমিং নগরীতে এই চার দেশের সফল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে বিসিআইএম ইকোনমিক করিডর ‘কুনমিং ইনিশিয়েটিভ’ হিসেবেই বিশ্বে ব্যাপক পরিচিতি পায়।

ভারতের বিগত কংগ্রেস সরকারের সময় বিসিআইএম বাস্তবায়নে বিপুল গতিসঞ্চার হয় এবং এর ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালে বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় চীনের অর্থায়নে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর পর্যায়ে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ ও চীন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের কক্সবাজার থেকে মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত রেলপথ ও মহাসড়ক নির্মাণের প্রকল্পের বাস্তবায়নও শুরু হয়ে যায়। কিন্তু তত দিনে ভারতে ক্ষমতায় চলে এসেছে দক্ষিণপন্থী বিজেপি সরকার। নরেন্দ্র মোদি চীনকে কোনোমতেই বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার দিতে নারাজ। তাঁর ওই ভূরাজনৈতিক কৌশলের খেলায় সহযোগী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান।

অতএব, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সমঝোতা স্বাক্ষরের বিরুদ্ধে একেবারে শেষ মুহূর্তে ভারতের বিরোধিতার কারণে পুরো উদ্যোগটা ভন্ডুল হয়ে যায়। এরপর থেকে বিসিআইএম উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার পুরো বিষয়টিই হিমঘরে চলে গেছে, নরেন্দ্র মোদি এখন বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালকে নিয়ে ‘বিবিআইএন ফ্রেমওয়ার্ক’ গড়ে তুলতে উঠেপড়ে লেগেছেন। কিন্তু বছরখানেক আগে সড়কপথে এই চার দেশের যোগাযোগ সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য একটা চুক্তি সম্পাদিত হলেও পরিবেশদূষণের আশঙ্কায় ভুটান ওই চুক্তি স্বাক্ষর করেনি। ভারতের সঙ্গে নেপালের সাম্প্রতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনে নেপালও এ ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

ডা. শেরিংয়ের এবারের সফরের সময় বাংলাদেশ ও ভুটান নদীপথে মালামাল পরিবহনের একটা সমঝোতা-স্মারক স্বাক্ষর করেছে, তবে এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব তেমন নেই। সফরের সময় বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে বিবিআইএন ফ্রেমওয়ার্কে অন্তর্ভুক্ত বিদ্যুতের আঞ্চলিক গ্রিড স্থাপনে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ ভুটানের একাধিক স্থানে জলবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য বিনিয়োগ করতে পারে। কিন্তু প্ল্যান্টগুলোর উৎপাদিত বিদ্যুৎ যেহেতু ভারতের স্থলভাগের ট্রান্সমিশন লাইনের মাধ্যমে ভুটান থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসতে হবে, তাই পুরো বিষয়টির সাফল্য নির্ভর করছে ভারতের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী তাই বিষয়টি নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের। ভারতের সত্যিকার সদিচ্ছার একটা ‘অ্যাসিড টেস্ট’ হয়ে যাবে এরই মধ্য দিয়ে।

ভারত থেকে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই প্রায় ১১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে, ভবিষ্যতে আরও বিদ্যুৎ আমদানির কথাবার্তাও চূড়ান্ত হওয়ার পথে। আমাদের আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, যেহেতু ভুটানের জলবিদ্যুতের দাম তুলনামূলকভাবে অনেক কম হবে, তাই ভারত বর্তমানে যে লোভনীয় দামে বিদ্যুৎ রপ্তানি করছে, সেই সুযোগ না-ও হারাতে চাইতে পারে। বিদ্যুৎ সঞ্চালনের সুযোগ দিলে ভারত সঞ্চালন চার্জ পাবে ঠিকই কিন্তু সরাসরি বিদ্যুৎ রপ্তানির মাধ্যমে ভারত যতখানি মুনাফার সুযোগ পাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও পাবে, তার তুলনায় ওই আর্থিক আকর্ষণ অকিঞ্চিৎকর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সরাসরি ভারত থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হলে বাংলাদেশকে অনেকটাই নির্ভরশীল করে রাখা যাবে। ভারত এই সুযোগ হারাতে চাইবে না বলেই আশঙ্কা হয়।

মোদির বিবিআইএন ফ্রেমওয়ার্ক পরীক্ষায় পাস করে কি না, দেখার অপেক্ষায় রইলাম।

ড. মইনুল ইসলাম: অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0