>উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত, তা চিহ্নিত করার লক্ষ্যে গবেষণা করছে কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টার। অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি সামাজিক, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত উন্নয়নের ওপরও জোর দিচ্ছে সংস্থাটি। বাংলাদেশের জন্য ভিশন ২০২১ অর্জনে এই গবেষণাভিত্তিক কিছু নিবন্ধ প্রকাশ করছে প্রথম আলো। আজ প্রকাশ করা হলো তেরোতম নিবন্ধটি।
default-image

বাংলাদেশের ভূমির রেকর্ড বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে। রেকর্ডে দেখা যায়, এ দেশে বাস্তবে যত জমি রয়েছে, মালিকানা আছে তার চেয়ে বেশি জমির। ভূমি ব্যবস্থাপনা-প্রক্রিয়া এখনো সেকেলে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের প্রবর্তিত পদ্ধতিতে চলছে এটি। জরিপ থেকে শুরু করে সম্পত্তির খাজনা আদায় পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই একই অবস্থা দেখা যায়। তিনটি মন্ত্রণালয় এই রেকর্ড ব্যবস্থা তদারকি করে থাকে। মূলত স্বাধীনভাবে এ কাজ করলেও তাদের মধ্যে কিছুটা সমন্বয়ও আছে।
আপনার যদি নিজের জমির রেকর্ড দেখার প্রয়োজন হয় অথবা বিক্রয় বা উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি হস্তান্তরের প্রয়োজন হয়, তাহলে আপনাকে অন্তত এক মাস একাধিক সরকারি দপ্তরের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে। আর সম্ভবত ঘুষ বাবদ টাকা ব্যয় করার জন্য আপনাকে প্রস্তুতও থাকতে হবে।

জমির রেকর্ড এখনো কাগজে সংরক্ষণ করা হয়। এমন অপ্রচলিত ভাষায় অনুপুঙ্খভাবে এ রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয় যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বোঝা সম্ভব নয়। প্রতি পাঁচ বছরে একবার জরিপ করার কথা আছে, কিন্তু এগুলোর বেশির ভাগই খুব পুরোনো। তাই আপনি নিজের রেকর্ড খুঁজে পেলেও দেখবেন জরিপের মানচিত্রটি জমির বর্তমান অবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি, তাই আগামী বছরগুলোতে ভূমি ব্যবস্থাপনা আরও জটিল হতে পারে।

এখন কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ কীভাবে এই সেকেলে ভূমি রেকর্ড পদ্ধতি সৃষ্ট সমস্যা সবচেয়ে ভালোভাবে সামাল দিতে পারে? ভূমি ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে শিশুস্বাস্থ্য ও দারিদ্র্য—এসব সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করতে ‘বাংলাদেশ প্রায়োরিটি’ প্রকল্পটি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদদের ডজন খানেক দলের সঙ্গে কাজ করছে। প্রতিটি দল এসব সমস্যার সমাধানের ব্যয় ও প্রাপ্ত সুবিধাগুলো খতিয়ে দেখছে। কোপেনহেগেন কনসেনসাস ও ব্র্যাকের যৌথ অংশীদারিতে আমরা দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে কোন ক্ষেত্রে ব্যয়িত প্রতিটি টাকায় সর্বোচ্চ ফলাফল পাওয়া যাবে—সেটা খুঁজে বের করতে বাংলাদেশকে সাহায্য করছি।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) নির্বাহী পরিচালক সুলতান হাফিজ রহমান ও গবেষণা সহকারী সুমাইয়া কবির তালুকদারের নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ভূমির রেকর্ড পদ্ধতি ডিজিটাইজ করা হলে ব্যয়িত প্রতিটি টাকার বিপরীতে ৬১৯ টাকার সুফল পাওয়া যাবে, অবিশ্বাস্য।

এমন কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ রেকর্ড পদ্ধতিতে অনিচ্ছাকৃত ভুল হয়, অথবা সরাসরি দুর্নীতির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। জমির মালিকানা হস্তান্তর বা অন্য কোনো জমি-সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে যদি ভূমি কার্যালয়ে যান, তাহলে কর্মকর্তারা কাজ শুরুর আগেই খরচ দাবি করতে পারেন। সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে যেসব ঘুষ প্রদান করা হয়, তার প্রায় ৪০ শতাংশের লেনদেন হয় ভূমি-সংক্রান্ত বিষয়ে।

এই জটিলতা ও কর্মকর্তাদের বিলম্ব করার প্রবণতা বা প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টির কারণে মানুষ মালিকানা ব্যবস্থাপনার অবৈধ ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে উৎসাহিত হয়। কিন্তু এই অবৈধতার কারণে সম্পত্তির অধিকার-সম্পর্কিত নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়ে, অর্থনৈতিক কার্যকলাপ ব্যাহত হয়।

এই বিশ্লেষণে ভূমির রেকর্ড ডিজিটাইজ করা ও আবেদন-প্রক্রিয়া সহজীকরণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকার ২০১০ সালে এ কৌশলের ওপর গবেষণা শুরু করেছে। সাভার উপজেলার ভূমি দপ্তরকে ডিজিটাইজ করার একটি পাইলট প্রকল্প শুরু হয়েছে। রেকর্ড কাগজ থেকে সফটওয়্যারে চলে যাওয়ায় ব্যয় অনেকটাই কমে এসেছে, আর এই সেবাও জনগণের জন্য অনেক সহজ হয়ে এসেছে।

দেশব্যাপী ভূমির রেকর্ড ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় করা হলে তথ্য পাওয়া অনেকটাই সহজ হয়ে আসবে, সবার প্রবেশযোগ্য একটি পদ্ধতির মাধ্যমে এটি করা সম্ভব হবে। রেকর্ড পেতে বা জমির মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এখন যে সময়, আর্থিক ও অন্যান্য লেনদেনে যে ব্যয় হয়, তা বিস্ময়করভাবে কমে যাবে। ডিজিটাইজেশন করা হলে কারও পক্ষে প্রত্যক্ষভাবে রেকর্ড জালিয়াতি করা অসম্ভব হবে, কর্মকর্তাদের ঘুষ খাওয়ার সুযোগ কমবে, ফলে জমি নিয়ে বিরোধ ও মামলা-মোকদ্দমাও কমে যাবে।

বাংলাদেশের আরও ৪৮৩টি উপজেলার ভূমি কার্যালয়কে ডিজিটাইজ করতে কম্পিউটার ও সফটওয়্যার কেনার জন্য লাগবে ৭ দশমিক ৭ কোটি টাকা। একই সঙ্গে বিদ্যমান ৫ কোটি জমির রেকর্ড স্ক্যান করতে লাগবে ৬৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রতিবছর দপ্তরের কর্মচারীদের জন্য ৯ কোটি ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হবে। সব মিলিয়ে এই খরচ দাঁড়ায় ২৭৬ দশমিক ২ কোটি টাকা।

কর্মপদ্ধতি দ্রুততর হওয়ার মাধ্যমে এর সুফল বাড়বে। বর্তমানে একটি সাধারণ জমির রেকর্ড-সম্পর্কিত লেনদেনে খরচ হয় ১ হাজার ৪৫ টাকা, সময় লাগে ৩০-৪৫ দিন, আর সরকারি অফিসে ঘুরতে হয় পাঁচবার। ডিজিটাইজেশন হলে এই খরচ কমে দাঁড়াবে মাত্র ৮০ টাকা, সময় লাগবে মাত্র ১৫ দিন, সরকারি অফিসে যেতে হবে মাত্র দুবার। আইনি ও বেআইনি লেনদেন কমে যাওয়ার কারণে বার্ষিক প্রত্যক্ষ সুফলের পরিমাণ দাঁড়াবে ৪৮ দশমিক ২ কোটি টাকা। তাই শুধু প্রত্যক্ষ সুফল বিবেচনা করলে এ কাজে ব্যয়িত প্রতিটি টাকার বিপরীতে ৩ টাকার সুফল পাওয়া যাবে।

তা ছাড়া, ডিজিটাইজেশনের সবচেয়ে বড় সুফল আসবে সারা দেশে সম্পত্তি অধিকারের নিরাপত্তা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে। অর্থনীতিতে এটা সবাই জানে যে সম্পত্তির অধিকারের নিরাপত্তার সঙ্গে উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যোগসূত্র রয়েছে। ধারণা করা যায়, ভূমিব্যবস্থার ডিজিটাইজেশন বাংলাদেশকে এমন সমাজের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, যেখানে সম্পত্তির অধিকারের নিরাপত্তা আরও বেশি থাকবে। দেশের প্রবৃদ্ধিতে এর প্রভাব অনুভূত হবে। এ বিষয়টি মাথায় রেখেই বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন, ভূমিব্যবস্থা ডিজিটাইজ করা হলে আগামী ১৫ বছরে ১৬ হাজার কোটি টাকার ও ২০৭০ সাল নাগাদ সম্ভবত ১৩ হাজার কোটি টাকার সমমূল্যের বেশি সুফল সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ ব্যয়িত প্রতিটি টাকার বিপরীতে ৬১৬ টাকার পরোক্ষ সুফল পাওয়া যাবে। অর্থাৎ ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থা ডিজিটাইজ করা হলে ব্যয়িত প্রতিটি টাকার বিপরীতে ৬১৯ টাকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সুফল পাওয়া যাবে।

এটা অবশ্যই ঠিক যে এই ৬১৯ টাকা প্রবৃদ্ধিরওপর বেশ ভালোভাবেই নির্ভরশীল। তা সত্ত্বেও এমনকি অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন আনুমানিক হিসাবসহ, ভূমিব্যবস্থা ডিজিটাইজেশনের সুফল তার পেছনে ব্যয়ের চেয়ে বিস্ময়করভাবে বেশি।

ড. বিয়র্ন লোমবোর্গ: কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট। টাইম ম্যাগাজিনের মূল্যায়নে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির একজন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0