বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিজয় দিবস আমাদের উৎসব করার দিন। তবে এই উৎসব করতে হবে সবাই মিলে। নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় আছে, ‘এই সব বর্ণমালা নিতে হবে ভূমিহীনের ঘরে।’ আমি বলি, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর উৎসবের বর্ণিল আলোকমালা আর মুজিব বর্ষের তাৎপর্য নিতে হবে ভূমিহীনের ঘরে।

২.

ভূমিহীনের কথাটা আসার সঙ্গে সঙ্গে আসপিয়া ইসলামের প্রসঙ্গ এসে যায়ই।

বরিশালের আসপিয়া ইসলামের চাকরি পুলিশে হয়তো হবে। প্রথমে খবর ছিল, আসপিয়া ইসলাম পুলিশের কনস্টেবল পদে নিয়োগের সব কটি পরীক্ষায় পাস করেন। কিন্তু ভূমিহীন বলে পুলিশের আইন অনুসারে তাঁর চাকরি হবে না। নদীভাঙনে সব হারিয়ে আসপিয়ার পরিবার বরিশালের হিজলায় এসেছিল, তারপর আসপিয়ার বাবার মৃত্যু হয়। পুলিশে চাকরি হবে মেয়ের, পরিবারটি আশায় বুক বাঁধতে শুরু করে। কিন্তু তখনই জানা গেল, পুলিশ আইনে ‘ভূমিহীন’, ‘ঠিকানাহীন’দের নিয়োগ দেওয়া যায় না। জেলায় জমি থাকতে হবে, স্থায়ী ঠিকানা থাকতে হবে। আসপিয়ার পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ ঘটে।

এরপরের খবর, আসপিয়ার চাকরি হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে, সরকারি জমিতে বাড়ি পাচ্ছেন আসপিয়া এবং তাঁকে কনস্টেবল পদে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এখন আবার নতুন নতুন খবর আসছে, একটা অনলাইন মাধ্যম বলছে, আসপিয়ার চাকরি হচ্ছে, খুলনার মীম আক্তারের দোষ কোথায়! মীম আক্তারেরও একই দোষ, তাঁরা ভূমিহীন, স্থায়ী ঠিকানা নেই!

হয়তো আসপিয়ার চাকরি হবে, হয়তো মীম আক্তারের ব্যাপারেও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকৃষ্ট হবে!

কিন্তু মূল প্রশ্নটি আসপিয়া কিংবা মীম আক্তারের সমস্যা নয়! মূল প্রশ্নটি হলো ভূমিহীন, আবাসহীন, ঠিকানাহীন মানুষেরা ভূমির মালিক, বাড়ির মালিক, ঠিকানাওয়ালা নাগরিকের মতোই সমান মর্যাদা আর সুযোগ পাবে কি না!

৩.

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে। পাকিস্তানবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে। পাকিস্তানবাদের উপাদান কী? ১. সমরতন্ত্র। বাংলাদেশের গ্রামে একজন শিক্ষক থাকলে আমরা গৌরব বোধ করি, পাকিস্তানের গ্রামে একজন সৈনিকের বাড়ি থাকলে সেই গ্রাম গর্ব বোধ করে। ২. অভিজাততন্ত্র। ওদের এলিটরা বংশপরম্পরায় এলিট, বাকি মানুষের সঙ্গে মেশাও তাদের ধাতে নেই, বরং অভিজাতদের বাইরে সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তানিদের শোষণ-শাসন-দমন করাই তাদের রেওয়াজ। ৩. আঞ্চলিক ও জাতিগত বৈষম্য। বহু জাতি-উপজাতিতে বিভক্ত পাকিস্তানে প্রদেশবিশেষের মানুষের, যেমন পাঞ্জাবিদের আধিপত্য কায়েম হয়ে আছে। তাদের সুবিধাভোগী সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, ব্যবসায়ী-শিল্পপতি-অভিজাতেরা এই বৈষম্য ও একাধিপত্যের ব্যবস্থাকে কিছুতেই বিনষ্ট হতে দিতে চায় না। এ জন্য তারা গণতন্ত্র চায় না। ৪. ধর্মতন্ত্র। এই বৈষম্যমূলক শোষণের ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে ধর্মকে সর্বক্ষেত্রে ব্যবহার করা। শোষণ-বঞ্চনা অব্যাহত রাখতে তা বড়ই উপযোগী। ৫. নারীদের শৃঙ্খলিত করে রাখা। ৬. জঙ্গিবাদ। আত্মঘাতী বোমার আঘাত থেকে বাঁচে না বিদেশি ক্রিকেটারদের বাস, কিংবা মসজিদ।

আমরা, স্বাধীন বাংলাদেশ, বহু ক্ষেত্রে বিজয়ী হয়েছি। মাথাপিছু আয়ে ভালো করছি। এমনকি মানব উন্নয়ন সূচকেও ভালো করছি। তারপরও কেন যেন মনে হয় আমাদের সেলিব্রেশন বা উদ্‌যাপন ঢাকার সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের মধ্যেই সীমিত থেকে গেল।

এই পাকিস্তানবাদের বিরুদ্ধে লড়াইটা শুরু করেন শেখ মুজিবুর রহমান। সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই। আবুল হাশিমের কলকাতার স্টাডি সার্কেলের ক্লাসে পড়ানো হতো, মুসলিম লীগকে রক্ষা করতে হবে জমিদার-আশরাফ-খাজাদের হাত থেকে। শেখ মুজিব পূর্ব বাংলায় এসে দেখলেন বৈষম্য কত তীব্র। পঞ্চাশের দশকে শেখ মুজিব যখন প্রাদেশিক মন্ত্রী, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হয়ে যাচ্ছেন পশ্চিম পাকিস্তানে, গান-নাটক-নাচ নিয়ে, শেখ মুজিব তাঁদের বললেন, যাচ্ছ যাও, দেখে এসো, ওরা আমাদের পাটের টাকা দিয়ে ওদের রাজধানীটাকে কীভাবে সাজিয়েছে। বৈষম্যটা লক্ষ কোরো। খেয়াল করে এসো।

সেই ১৯৫২ সাল থেকেই বাংলার কৃষক-শ্রমিক-সাধারণ মানুষ, গরিব মানুষ যুক্ত হয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে। ছাত্রদের ওপর গুলি চলেছে শুনে পুরান ঢাকার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সারা বাংলার গ্রামগঞ্জের চাষাভুষারা বিক্ষোভে যুক্ত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ছয় দফা ঘোষণা করলেন, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলো, তাঁর মুক্তির দাবিতে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন রক্ত দিল কারা? শ্রমিকেরা। নারায়ণগঞ্জ থেকে, তেজগাঁও থেকে, টঙ্গী থেকে শ্রমিকেরা বেরিয়ে এলেন দলে দলে, হরতাল করতে, শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে। রেহমান সোবহান তাঁর স্মৃতিকথার বইয়ে লিখেছেন, সত্তরের নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু যাবেন লঞ্চে করে তাজউদ্দীনের নির্বাচনী এলাকায় জনসভা করতে। নারায়ণগঞ্জের শ্রমিকেরা তাঁকে ছাড়বে না। তাঁকে শ্রমিকসভায় ভাষণ দিতে হলো। এরপর লঞ্চ ছাড়ল। দুপাশে শ্রমিক, কৃষক, সাধারণ মানুষ শেখ মুজিবকে তাদের মধ্যে চায়। সময় নেই। লঞ্চ ছুটে চলেছে। নদীর দুই পাশ থেকে শত শত মানুষ নদীতে ঝাঁপ দিল, তারা শেখ মুজিবের লঞ্চের কাছে আসতে চায়। রেহমান সোবহানের মনে হলো, শেখ মুজিব না মধ্যবিত্ত জাতীয়তাবাদী নেতা, তাঁর জন্য কৃষক-শ্রমিক-সর্বহারারা জীবন দিতে প্রস্তুত কেন?

১৯৭১ সালের ভিডিও ফুটেজ ইউটিউবে আছে। তারেক মাসুদের মুক্তির গান ছবিটার দৃশ্যগুলো একটু খেয়াল করে দেখুন। ১৯৭১ সালে রাইফেল কাঁধে যে মুক্তিযোদ্ধারা গাইছেন ‘আমার সোনার বাংলা’, স্লোগান দিচ্ছেন ‘তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব’, তঁাদের পরনে লুঙ্গি, পা খালি, জুতা-স্যান্ডেল নেই, গায়ে মলিন গেঞ্জি বা জামা। খালি পায়ে লুঙ্গি পরে হাতে মর্টার নিয়ে তঁারা যাচ্ছেন যুদ্ধক্ষেত্রে। তঁাদের মুখের ক্লোজআপ খেয়াল করুন। খেতে না পাওয়া গরিব মানুষ। চাষার ছেলে। মজুরের ছেলে। এই দেশ স্বাধীন করেছেন গরিব মানুষেরা। যুদ্ধ করেছেন গরিব মানুষেরা। ছাত্ররা। কিশোর-তরুণেরা।

৪.

আমরা, স্বাধীন বাংলাদেশ, বহু ক্ষেত্রে বিজয়ী হয়েছি। মাথাপিছু আয়ে ভালো করছি। এমনকি মানব উন্নয়ন সূচকেও ভালো করছি। তারপরও কেন যেন মনে হয় আমাদের সেলিব্রেশন বা উদ্‌যাপন ঢাকার সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের মধ্যেই সীমিত থেকে গেল। এটা কেবল আতশবাজিতেই যেন ফুরিয়ে না যায়। ধনি-গরিবের বৈষম্য দূর করা, গরিব মানুষের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা, আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করা, প্রত্যেক নাগরিকের মর্যাদা নিশ্চিত করা—কাজটা অনেক বড়। কাজটা দার্শনিক, নীতিগত, অগ্রাধিকার নির্বাচনের এবং প্রায়োগিকও। সামনের বছরে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, আরও আরও মেগা প্রজেক্ট চালু হলে অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে, আমাদের উন্নয়নের গাড়ি গতি পাবে। কিন্তু প্রত্যেক নাগরিক স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে একজন ভিআইপির সমান মর্যাদা পাবেন, আমাদের উন্নয়ন-নীতিতে এই দর্শনকে গেঁথে দেওয়া দরকার।

ভূমিহীন আসপিয়া আসলে ভূমিহীন কি না, মীম আক্তারকে সরকার জমি-বাড়ি দিল কি না, এগুলো বিচ্ছিন্নভাবে সমাধান করলে হবে না, নীতিগতভাবে ব্যাপারটাকে দেখতে হবে, একেবারে বঙ্গবন্ধুর সেই কথাকে আমাদের সব কাজে এবং বিশ্বাসে ধারণ করতে হবে—বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। আমরা যদি বড়লোক, ব্যবসায়ী, পুঁজিপতি, সামরিক-বেসামরিক আমলা, ধর্মতন্ত্র, বৈষম্যবাদের চক্করেই পড়ি, তাহলে তা পাকিস্তানবাদের শৃঙ্খলেই বন্দী হওয়া।

স্বাধীনতার এই আলো নিতে হবে ভূমিহীনের ঘরে। বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের সবাইকে ভিআইপি হিসেবে মর্যাদা দিতে পারতে হবে রাষ্ট্রকে। বাংলাদেশের কৃষককে, শ্রমিককে যদি ভিআইপি করতে না পারি, তাহলে এই দেশে আর কোনো ভিআইপি নেই, থাকতে পারে না—সেটাই হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

আনিসুল হক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন