আরব আমিরাত–ইসরায়েল সম্পর্ক

মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক নতুন সমীকরণ

বিজ্ঞাপন
default-image

আজ ১৫ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও বাহরাইনের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বেশ পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এর ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্যনীতি বহু বছর ধরে ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ইসরায়েলের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পূর্বসূরিদের তুলনায় ভিন্ন। ট্রাম্প তাঁর ইহুদিধর্মাবলম্বী জামাই জারেড কুশনারকে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত এবং কার্যত উপদেষ্টা নিয়োগ করার পর থেকে এ প্রচেষ্টা চলমান। ইসরায়েলের দাবি অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ট্রাম্প প্রশাসন জেরুজালেমকে ইসরায়েলের একক রাজধানীর স্বীকৃতি দিয়ে জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের ১৪১ নম্বর প্রস্তাবকে যেমন উপেক্ষা করেছে, তেমনি ফিলিস্তিনিদের কড়া বার্তা দিয়েছে। ফিলিস্তিনিরা তাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ৭০ বছরের সংগ্রামে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করার স্বপ্ন দেখে এসেছে।

ইউএই হবে তৃতীয়, আর বাহরাইন চতুর্থ আরব দেশ, যারা ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে যাচ্ছে। প্রকাশ্যে বলা হয়েছে, ইউএই ও বাহরাইনের মতো প্রভাবশালী ও সম্পদশালী দেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনি তথা পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপন ও ভূমি দখল থেকে বিরত রাখবে। অন্যদিকে এই কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে। দুই রাষ্ট্রের ফর্মুলা নিয়ে জেরাড কুশনার কাজ করছেন বলে ট্রাম্পের মুখ থেকে শোনা যায়।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এ সম্পর্ক ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিতে এবং অবৈধ বসতি স্থাপন বন্ধ করতে ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগ করবে বলে যে ধারণা দেওয়া হচ্ছে, তা যুক্তিতে টেকে না। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যসহ আফ্রো-এশীয় ১৬টি মুসলিমপ্রধান দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে, কিন্তু তা ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করেনি, ফিলিস্তিনিদের কোনো কাজে আসেনি। ১৯৭৯ সালে মিসর ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলেও ইসরায়েল কোনো ছাড় দেয়নি। জর্ডানে প্রায় ৭০ বছর ধরে সবচেয়ে বড় ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু শিবির আছে। তুরস্ক ও ইরান ইসরায়েলের জন্মলগ্ন থেকেই ঘনিষ্ঠ। (ইরান ১৯৫৩ সালে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন করে, যা ১৯৭৯ বিপ্লবের পর ছিন্ন হয়।) এসবও ফিলিস্তিনিদের কোনো কাজে আসেনি। কাজেই ইউএই যে কারণ দেখাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র যে কারণকে সমর্থন দিচ্ছে, তা যৌক্তিক নয়।

যে ১৬টি মুসলিমপ্রধান দেশ এর আগে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে, বিশেষ করে আরব দেশগুলো, তাদের বেশির ভাগই রাজতন্ত্রশাসিত। জনগণের মতামতের মূল্য ওই দেশগুলোতে নেই। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় রাজদরবার থেকে

ইউএই ও বাহরাইনের সঙ্গে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থেকে মনে করার কারণ আছে যে এতে সৌদি আরবের পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের ওপর দিয়ে ইসরায়েলের জাতীয় পতাকাবাহী এলএল বিমান নিয়ে জেরাড কুশনার এবং ইসরায়েলি প্রতিনিধিদল ইউএইতে অবতরণ করে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতারসহ অন্যান্য আরব দেশ যেভাবে ইরানের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হয়েছে, তারাও অচিরেই এ প্রক্রিয়ায় যোগ দেবে। সৌদি আরব দক্ষিণ ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে যে অভিযান চালাচ্ছে, তার সহযোগী ইউএই এবং পরোক্ষ সহযোগিতায় রয়েছে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ইসরায়েল ও ইউএইর দৃষ্টি বহুদিন ধরে আরব সাগরের এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরের কাছে ইয়েমেনের দক্ষিণের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সোকোতরার ওপর নিবদ্ধ রয়েছে। ভূরাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপ দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা দখলে নিয়েছে ইউএইর সহযোগিতায়। এখানে বর্তমানে ইউএই ও ইসরায়েলের যৌথ গোয়েন্দা ও ছোট পরিসরের সেনাঘাঁটি তৈরির অবস্থায় রয়েছে। সোকোতরার অবস্থান ভূরাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এখান থেকে ইরান ও পাকিস্তানের ওপরও গোয়েন্দা নজরদারি চালানো যায়। এ অঞ্চলে চীন-ইরান তৎপরতাকে নজরদারির মধ্যে রাখা, বিশেষ করে ইরানকে কোণঠাসা করতে সুন্নি জোট গঠনে এটা সহায়ক হবে। তা ছাড়া বর্তমানে ইরান, উত্তর কোরিয়া ও হামাস যেভাবে হুতিদের সহযোগিতা করছে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ইসরায়েলের সহযোগিতার প্রয়োজন। কাজেই এই সম্পর্ক স্থাপনের পর ইসরায়েল এ অঞ্চলে যে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে, তাতে সন্দেহ নেই।

নেপথ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যার অন্যতম উদ্দেশ্য এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব খর্ব করা এবং ইরানকে কোণঠাসা করা। প্রসঙ্গত, ইরানের চাবাহার বন্দরের বেশির ভাগ শেয়ার চীনের হাতে চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে চাবাহার-জাহিদান রেলওয়ের ও বন্দর আব্বাসের কাছে নতুন টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে চীনের। এর অন্য পাশেই রয়েছে ইউএই। কাজেই ইউএই এখন ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইসরায়েলের এই কূটনৈতিক তৎপরতা শুধু সামরিক নিরাপত্তার দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং ইসরায়েলের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে দারুণ গতিসঞ্চার করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসরায়েল প্রায় ৪০ বছর পর আকাবা উপসাগরের ইলাত বন্দর থেকে উত্তর ইসরায়েলের বন্দর আসকালন পর্যন্ত প্রায় ২৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ আরব পাইপলাইন আবার চালু করতে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে ইউএই ও সৌদি আরবের জ্বালানি তেল ইউরোপে রপ্তানির পথ সুগম হবে। এই দ্বিমুখী পাইপলাইন মধ্য এশিয়ার জ্বালানি বহন করে উপসাগরীয় টার্মিনাল থেকে আফ্রো-এশীয় দেশগুলোতেও পৌঁছে দেবে। ইসরায়েলের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, চীন এতে যোগ দিতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে ইরানি জ্বালানিও সহজে ইউরোপীয় দেশগুলোতে সস্তায় পৌঁছাতে পারবে। বর্তমানে মিসরের সুয়েজ খাল দিয়ে সুপার ট্যাংকার চলাচল করতে না পারায় জ্বালানির পরিবহন খরচ বেড়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের যে বৃহৎ তেল শোধনাগার পূর্ণ সক্ষমতায় না চলার কারণে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এবার তা চালু হবে। এই চুক্তির ফলে ইসরায়েল আরব আমিরাত ও বাহরাইনে মূলধন লগ্নি করতে পারবে এবং ইসরায়েলের পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানিগুলো লাভবান হবে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এখন প্রশ্ন হলো এসবের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ কোথায়? শেষ পর্যন্ত কি কিছু ছিটমহল নিয়ে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের প্রস্তাব চাপানো হবে? স্মরণযোগ্য যে ফিলিস্তিনি ভূমির প্রায় ৬০ শতাংশ বর্তমানে ইসরায়েলের অংশ এবং সেখানে প্রায় ৪ লাখ ইহুদির বসতি রয়েছে। এই ভূখণ্ড ইসরায়েল ছেড়ে দেবে এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। ইউএইসহ ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি আরব রাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করলেও গণতান্ত্রিক নন–আরব বৃহৎ মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে জনগণের মতামত উপেক্ষা করে এ প্রক্রিয়ায় যোগ দেওয়া সহজ হবে বলে মনে হয় না। এরই মধ্যে ফিলিস্তিনিরা এ প্রয়াসকে বিশ্বাসঘাতকতা বলে অভিহিত করেছে।

যে ১৬টি মুসলিমপ্রধান দেশ এর আগে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে, বিশেষ করে আরব দেশগুলো, তাদের বেশির ভাগই রাজতন্ত্রশাসিত। জনগণের মতামতের মূল্য ওই দেশগুলোতে নেই। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় রাজদরবার থেকে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মালয়েশিয়াসহ যেসব দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান, সেসব দেশের সরকার জনমত এড়িয়ে সহজে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। বাংলাদেশ এবং ওপরে উল্লেখিত দেশগুলোর জনমত ফিলিস্তিনের স্বাধীন মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রের পক্ষে।

ইসরায়েলকে এসব রাষ্ট্রের সমর্থন পেতে হলে অবৈধ দখলদারির অবসান ঘটিয়ে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে দিতে হবে। ১৯৭২ সালে এ কারণেই ইসরায়েলের স্বীকৃতির দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিল বঙ্গবন্ধুর সরকার।

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন নির্বাচন বিশ্লেষক, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং এসআইপিজির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো (এনএসইউ)

hhintlbd@yahoo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন