২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ-ভারত তিস্তা চুক্তি করার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল। সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশে এসেছিলেন। আসার কথা ছিল পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও। কিন্তু তিনি আসেননি এবং তাঁর বিরোধিতার কারণেই সেই চুক্তি হয়নি।
প্রায় চার বছর পর সেই তিনি বাংলাদেশ সফর করলেন এবং তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে তাঁর ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানালেন। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে তাঁর আন্তরিকতা যে কম, তা বোঝা যায় কলকাতা থেকে প্রকাশিত আনন্দবাজার পত্রিকা সূত্রে। ২০ ফেব্রুয়ারি আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঢাকা আসার আগমুহূর্তে কলকাতায় বলে এসেছেন, ‘তিস্তা নিয়ে কিছু বলছি না। তবে ছিটমহল নিয়ে অবশ্যই কথা হবে।’ অর্থাৎ তিস্তা নিয়ে তিনি কোনো কথাই বলতে
চাননি। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের পরবর্তী প্রায় চার বছরে তিস্তার পানি দেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি কখনোই তাঁর দেশে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেননি। বরং ‘বাংলাদেশে তিস্তার পানি পাচার হচ্ছে’—এমন অভিযোগই করেছেন। ভারতের কংগ্রেস সরকার তিস্তা চুক্তি করতে চেয়েছিল, বিজেপি সরকারেরও আপত্তি নেই। তাই মোদি সরকার চাইলে এবার তিস্তা চুক্তি হতে পারে—এমনটাই আমরা আশা করতে পারি।
তিস্তায় অভিন্ন অধিকার প্রশ্নে ২০১৪ সালের ১৭ আগস্টের আগের প্রেক্ষাপট এবং তার পরের প্রেক্ষাপটও এক নয়। ১৯৯৭ সালের ‘পানিপ্রবাহ কনভেনশন’ অনুযায়ী ৩৫টি দেশের অনুসমর্থনের ৯০ দিন পর তা আইনে পরিণত হওয়ার কথা। ২০১৪ সালের ১৯ মে ভিয়েতনাম ৩৫তম দেশ হিসেবে চুক্তিটি অনুসমর্থন করেছে। ফলে নিয়ম অনুযায়ী ১৭ আগস্ট থেকে সব অভিন্ন নদীতে আমাদের আইনি অধিকারও তৈরি হয়েছে। অবশ্য তিস্তার পানি চাওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ কতখানি আন্তরিক, সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ চুক্তিটি অনুসমর্থন করেনি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে আশ্বাস দিয়েছেন, সেটাকে কাজে পরিণত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখা উচিত হবে না। কারণ, ভারত বাংলাদেশকে পানি না দিলে ভারতের ক্ষতি নেই, ক্ষতি বাংলাদেশের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নীরব থাকলেও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সব সময়ই তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়ে আশ্বাস দিয়ে আসছে। ২০১৩ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেছিলেন, ‘তিস্তা সই হয়নি ঠিকই, কিন্তু তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহেও ভারত বাধা দেয়নি।’ এসব মৌখিক নিশ্চয়তা বক্তব্যসর্বস্ব হিসেবেই আছে এখন পর্যন্ত।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল এই মুহূর্তে যে সংকটে পড়েছে, তা হলো তিস্তা সেচ প্রকল্প প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ১৯৯০ সালে তিস্তা সেচ প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার আগে বোরো মৌসুমে প্রায় ৭ হাজার কিউসেক পানি থাকার কারণে প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ১ লাখ ১১ হাজার হেক্টর লক্ষ্যমাত্রা নির্ণয় করা হয়। কিন্তু ১৯৯৩ সালে সেচ প্রকল্প শুরু হওয়ার পর পানি কম থাকায় সর্বোচ্চ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা সম্ভব হয়েছে। ভারত পানি সরিয়ে নেওয়ার কারণে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল। ২০১৪ সালে ভারত আন্তনদীসংযোগ প্রকল্প অনুযায়ী তিস্তার পানি একতরফা প্রত্যাহার করে নেওয়ার কারণে সেই পানির পরিমাণ ৩০০ কিউসেকে নেমে এসেছিল। এ বছরের ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহেই নেমে এসেছে ১৫০-১৬০ কিউসেকে। ভারত অংশে তিস্তায় পানি নেই, তা নয়। ভারত পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ার কারণে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে এই হাহাকার দেখা দিয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে পানি বেশি করে প্রত্যাহার করার কারণে গত বছর ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রকল্পের অধীনে চাষাবাদ শুরু হলেও ১০-১২ হাজার হেক্টরের চেয়ে বেশি জমিতে পানি দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে কৃষকেরা চরম সংকটে পড়েছিলেন। বাসদসহ (মার্ক্সবাদী) অনেক সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণের জন্য সরকারের কাছে দাবি করে আসছে। এ বছর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ২০ হাজার হেক্টর জমি। কিন্তু এই জমিতেও পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে তিস্তার পানি চেয়ে এ বছর বাসদ (মার্ক্সবাদী) ১৯ ফেব্রুয়ারি তিস্তা অভিমুখে রোডমার্চ করেছে। রোডমার্চের সঙ্গে গিয়েছিলাম আমিও। বড়ভিটা নামক স্থানে একটি পথসভায় যোগ দিয়েছিলেন অনেক সাধারণ কৃষক। সেখানকার একজন কৃষক খুব দুঃখ করে বলছিলেন, ‘শুধু রোয়া লাগানোর সময়ে জমিতে সেচের পানি পাইছি, আর নাই।’ সেচ প্রকল্পের একজন মাস্টাররোল কর্মচারী জিকরুল বললেন, ‘রেশনিং সিস্টেমে ছয় দিন পর পর পানি দেওয়া হয়।’ নীলফামারীর জলঢাকাসংলগ্ন সেচ প্রকল্পের খালের পাশে কথা হচ্ছিল কয়েকজন সুবিধাভোগীর সঙ্গে। পাশেই ছানারুল নামের অন্য একজন কৃষক বললেন, ‘পানি এত কম থাকে যে একটু উঁচু জমিতে পানি যায় না। যেটুকু বা যায়, এক দিনেই শুকি যায়।’ অশীতিপর বৃদ্ধ জমশেদ নামের একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, সেচ প্রকল্প হওয়ার আগে এখানকার মানুষের জীবন কেমন ছিল? তিনি বললেন, ‘এটেকোনা (এখানে) ধান হইত না। পাট আর কাউন হইত। অভাবে এখানকার মানুষে কাউনের ভাত খায়া আচলো (ছিল)। সেচের পানি পাওয়ার পর থাকি এঠাকার (এখানকার) মানুষের ভাগ্য বদলি গেইছে। পানি না থাকলে ফির অভাব হইবে।’
সেচ প্রকল্প এলাকার অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এক একর জমিতে ধান চাষ করতে সেচ প্রকল্পের পানিতে মোট খরচ হয় ৪৮০ টাকা। আবার নদীর পানিতে সারও কম দিতে হয়। যদি গভীর নলকূপের পানিতে ধান চাষ করতে হয়, তাহলে এলাকাবিশেষে ১৫ থেকে ২০ গুণ, অর্থাৎ প্রায় ছয় হাজার থেকে আট হাজার টাকা দিতে হয় পানি বাবদ। আবার সারও প্রয়োজন হয় তুলনামূলক বেশি। সে জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে আশ্বাস দিয়েছেন, তা বাস্তবায়ন করার জন্য বাংলাদেশের কালক্ষেপণ করা যাবে না। যদি তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমানে যে সামান্য পানি পাওয়া যাচ্ছে, সেই পানিই পাওয়া যায়, তাহলে তিস্তা নদীকে বাঁচাতে তিস্তা সেচ প্রকল্প বন্ধ করতে হবে। তিস্তাপারের মানুষের জীবনে এটা হবে একটি ভয়াবহ বিপর্যয়। তিস্তায় পানি না থাকলে যমুনেশ্বরী, বুড়ি তিস্তা, ঘাঘট, করতোয়াসহ অনেক নদীই শুকিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় তিস্তা পানিশূন্য থাকলে উত্তরাঞ্চল মরুকরণের আশঙ্কাও আছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে থেকে আগ্রহ করে বাংলাদেশ সফর করেছেন। এই সফরে দ্বিদেশীয় সম্পর্কোন্নয়নের চেয়ে তাঁর নিজের রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা ছিল অনেক বেশি। বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেসের সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগ ওঠার কারণে সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয়েছে এবং নিজ দেশে তাঁর সমর্থনও কমেছে। ঢাকায় আসার পর বাংলাদেশের মানুষের তিস্তা নিয়ে উৎকণ্ঠা লক্ষ করে তিনি কৌশলে আশ্বাসবাণী শুনিয়ে গেছেন কি না, সেটাও ভাবার বিষয়।
তিস্তা ও স্থলসীমান্ত চুক্তি নিয়ে ৪ আগস্ট ২০১৩ প্রথম আলোয় প্রকাশিত রাজ্যসভা টিভির একটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ভারতের সাবেক তিনজন হাইকমিশনার দেব মুখার্জি, বীণা সিক্রি ও রঞ্জিত মিত্তারের আলোচনার সারকথা উদ্ধৃত করা হয়, ‘আলোচনার নির্যাস হচ্ছে, দুই চুক্তি বাস্তবায়নে ভারত যে প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশকে দিয়েছিল, তা যেকোনোভাবেই পূরণ করা দরকার ছিল।’
তিস্তার পানি পেতে হলে আরও কূটনৈতিক-রাজনৈতিক-সামাজিক সম্পর্ক জোরদার করা প্রয়োজন। যদি সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়, তাহলে অভিন্ন নদীতে অভিন্ন অধিকার প্রতিষ্ঠায় যে আইন প্রণীত হয়েছে, তার আলোকে হলেও আমাদের নদী অধিকার প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর ও সংগঠক, রিভারাইন পিপল।
[email protected]

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন