চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগ থেকে রেজাউল করিম চৌধুরীর মনোনয়ন পাওয়া নিঃসন্দেহে বড় ধরনের চমক। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে নেতা-কর্মীদের আলোচনা গুঞ্জন বা পত্রপত্রিকা ও সংবাদমাধ্যমের পূর্বাভাসগুলোতেও কখনো রেজাউল করিম চৌধুরীর নাম উঠে আসেনি। নগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বটে, তবে দলের ‘ছায়াতল’ ছাড়া ব্যক্তিগত উদ্যম ও উদ্যোগের কোনো নজির তিনি কখনো স্থাপন করতে পারেননি। পৃথক কোনো ভাবমূর্তি বা ক্যারিশমাও গড়ে ওঠেনি সে কারণেই। তবে তিনি মুক্তিযোদ্ধা, পরিবার-পরম্পরায় আওয়ামী লীগ ঘরানার মানুষ। রাজনীতির নানা পালাবদলের সময়েও তাঁর দলীয় আনুগত্য ছিল অটুট। ‘বহদ্দারহাট’ খ্যাত বহদ্দার পরিবারের সন্তান তিনি। সব মিলিয়ে বিনয়ী, সৎ, সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। ফলে মেয়র হিসেবে তাঁর মনোনয়ন ঘোষণা যদিও কর্মীদের মধ্যে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে, তাঁর যোগ্যতা নিয়ে নিঃসংশয় হতে পারেননি অনেকে, কিন্তু ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণও খুঁজে পাননি কেউই।

আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরী বা বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের মতো নিজস্ব কর্মী বাহিনী রেজাউল করিমের নেই। অর্থাৎ সেই অর্থে দলের অভ্যন্তরে গ্রুপিং চর্চা করেননি তিনি। মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে এটা হয়তো তাঁর পক্ষে গেছে। শীর্ষ নেতৃত্ব হয়তো অন্তর্কোন্দলের বিরুদ্ধে একটি বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি তৃণমূলের সৎ ও ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন করার একটি দৃষ্টান্তও তুলে ধরতে চাইলেন।

এখন নিজস্ব কর্মী বাহিনী না থাকার ব্যাপারটা শক্তি না সীমাবদ্ধতা, সময়ই তা বলে দেবে। চট্টগ্রামের দলীয় রাজনীতিতে রেজাউল করিম দৃশ্যত মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন। সেই দিক থেকে তাঁর মনোনয়ন পাওয়া মহিউদ্দিন গ্রুপের বিজয় ভেবে উল্লসিত হতে পারেন এই প্রয়াত নেতার কর্মী-সমর্থকেরা। তবে মাঠে থাকার কতটা প্রেরণা তাঁরা পাবেন, সেটাও দেখার বিষয়। অন্য দিকে মনোনয়ন না পেয়ে হতাশ আ জ ম নাছির উদ্দীন পুরো ব্যাপারটিকে গ্রহণ করেছেন রাজনীতির কুশলী খেলোয়াড়ের মতো। নিজেকে ‘অপরাজনীতির’ শিকার বলে উল্লেখ করলেও তাঁকে ‘বঞ্চিত’ করার জন্য তিনি কারও বিরুদ্ধে আঙুল তোলেননি। নিজের কর্মী-সমর্থকদের দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা, বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রেও যে তাঁর ঘনিষ্ঠ ও অনুসারীদের বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, সেটা বুঝেও তাঁদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করার নির্দেশ দিয়ে তিনি যে এখনো দলের নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক, সেই কথাটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন।

আ জ ম নাছির উদ্দীন মাত্র এক মেয়াদে মেয়রের দায়িত্ব পালন করার পর তাঁকে পুনরায় দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হলো না কেন—এ নিয়ে নানা রকম আলোচনা আছে। এ বিষয়ে ভবিষ্যতে আলোচনার সুযোগ থাকল। তবে এ মুহূর্তে শুধু এটুকু বলা যায়, হাইকমান্ড যে তাঁর ওপর আস্থা রাখতে পারেনি, তার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল আগেই। ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা ও নারায়ণগঞ্জে দলীয় টিকিটে নির্বাচিত মেয়রদের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা দেওয়া হলেও চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ নগরের মেয়রকে এ মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

অপর বড় দল বিএনপি এখানে মেয়র পদে মনোনয়ন দিয়েছে শাহাদাত হোসেনকে। এই মনোনয়ন অপ্রত্যাশিত ছিল না মোটেই। শাহাদাত বর্তমানে নগর বিএনপির সভাপতিই শুধু নন, সরকারবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় থেকে, কারাভোগ করে নিজের সংগ্রামী একটি ভাবমূর্তিও কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে গড়ে তুলতে পেরেছেন। এ ছাড়া শাহাদাতের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অসততার কোনো অভিযোগও ওঠেনি কখনো। ফলে দলের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা প্রায় প্রশ্নাতীত। 

বড় দল হিসেবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিএনপি বিভেদ-কোন্দলে জর্জরিত দীর্ঘদিন। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান খুন হয়েছিলেন চট্টগ্রামে। বলা হয়ে থাকে, সেবারও দলীয় কোন্দল মীমাংসা করার জন্যই চট্টগ্রামে এসেছিলেন তিনি। সেই অন্তঃকলহের ধারাবাহিকতা থেকে এখনো বেরোতে পারেনি দলটি। এখনো যেকোনো বড় সমাবেশ বা কমিটি গঠনের সময় বিভিন্ন নেতার সমর্থক ও কর্মীদের মধ্যে মারামারি ও গোলযোগ প্রমাণ করে, আমাদের দেশের দুটি বড় দলের চিরাচরিত আচরণের গণ্ডি থেকে বেরোতে পারেননি এর নেতা বা কর্মী-সমর্থকেরা। তবে সময় এখন ভালো না, এটা ভালো করেই জানা আছে জ্যেষ্ঠ নেতা থেকে তরুণ কর্মী পর্যন্ত সবারই। যেমন মেয়র পদে মনোনয়ন চেয়েছিলেন দলের মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর। কিন্তু দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তিনি বা তাঁর সমর্থকেরা হতাশ বা ক্ষুব্ধ হয়েছেন, এমন কোনো আলামত চোখে পড়েনি। ওয়ার্ডগুলোতে দলের একক প্রার্থী দেওয়ার চেষ্টায় অনেকটাই সফল বিএনপি। দলের এই দুঃসময়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে যদি নিজেদের প্রার্থীকে বিজয়ী করা যায়, তাহলে সেটা যে সঞ্জীবনী শক্তির মতো কাজ করবে, এই বোধও আছে সবার মধ্যে। বিরোধী দলে থেকেও মেয়র পদে জয়লাভ করা যে সম্ভব, তার নজির নিকট বা দূর-অতীতে আছে। বিএনপির আমলে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী এবং আওয়ামী লীগের আমলে বিএনপির প্রার্থী মনজুরুল আলম এই পদে জয়লাভ করেছিলেন।

এ অঞ্চলে বড় দুটি দলের জনসমর্থন ও অতীতের নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করলে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জোর লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখা যায়। কিন্তু সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি এখানে উঠছে, লড়াইয়ের মাঠটি সমতল হবে কি না। বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের বড় অংশ মামলার আসামি। গ্রেপ্তার বা হয়রানির ভয় কাটিয়ে প্রকাশ্যে প্রচার–প্রচারণায় কতটা যুক্ত হতে পারবেন তাঁরা? যে নির্বাচনে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই, সেখানে কতটা ঝুঁকি নেবেন এই কর্মী-সমর্থকেরা?

নির্বাচন কমিশন বা প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ থাকবে, প্রশ্ন আছে সেটা নিয়েও। দলীয় মনোনয়ন নিয়ে চট্টগ্রাম ফেরার পর রেলস্টেশনে রেজাউল করিম চৌধুরীকে সংবর্ধনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। কিন্তু বিএনপির প্রার্থী শাহাদাতকে সেভাবে বরণ করার সুযোগ পাননি এই দলের নেতা-কর্মীরা। এ রকম বৈষম্য চলতে থাকলে সাধারণ ভোটারেরা আগ্রহ হারাবেন। তখন নির্বাচনে ভোটারদের স্বল্প উপস্থিতি, কেন্দ্র দখল ইত্যাদি সাম্প্রতিক কালের নির্বাচনী চিত্রের আরেকটি পুনরাবৃত্তিই হয়তো প্রত্যক্ষ করবে দেশের মানুষ।

বিশ্বজিৎ চৌধুরী প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক, কবি ও সাহিত্যিক
bishwabd@yahoo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন