বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির অজুহাতে ডিজেলের দাম যদি বাড়ানো হয়, তাহলে তো প্রশ্ন উঠবে, করোনাভাইরাস মহামারি শুরু হওয়ার পর যখন গত ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমতে কমতে প্রতি ব্যারেল ৩০ ডলারের নিচে নেমে এসেছিল, তখন এ দেশে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম প্রতি লিটার ৬৫ টাকা বহাল রেখে সরকার যে মুনাফাবাজি করেছে, সেটা কি ভোক্তাদের ওপর নিকৃষ্ট জুলুমবাজি নয়? প্রকৃতপক্ষে চার বছর ধরেই বাংলাদেশে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম আমদানি ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি নির্ধারণের মাধ্যমে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। তেলের আন্তর্জাতিক দাম কমার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের অভ্যন্তরীণ দাম কমিয়ে আনাই ছিল যুক্তিসংগত, অথচ সরকার উচ্চমূল্য বহাল রেখে মুনাফাবাজি করার সিদ্ধান্তই নিয়েছিল ওই সময়ে। ওয়াকিবহাল মহল দাবি করছেন, এই মুনাফাবাজির মাধ্যমে পেট্রোলিয়াম করপোরেশন প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে।

সরকারের তহবিলে এই সেক্টরের শুল্ক, মূসক (ভ্যাট) ও অন্যান্য কর বাবদ প্রতিবছর আরও চার থেকে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব যুক্ত হয়। অতএব রাজস্ব ও মুনাফা যোগ করলে সরকার তেল খাতকে কয়েক বছর ধরে ‘কামধেনু’ হিসেবে ব্যবহার করেছে বলা যায়। কই, তখন তো এই মুনাফাবাজি থেকে ‘রিলিফ’ দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা সরকার গ্রহণ করেনি? এখন লোকসানের অজুহাতে একলাফে ২৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ দাম বাড়ানোর আগে অর্থনীতিতে এই সিদ্ধান্তের বহুল বিস্তৃত ও সুদূরপ্রসারী অভিঘাতের বিষয়টি সম্পর্কে আদৌ কি চিন্তাভাবনা করা হয়েছে? কেরোসিন তো প্রধানত দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত একটি পণ্য, এতে ভর্তুকি থাকলে অযৌক্তিক হবে কেন?

২০১৮ সালের ব্যালট জবরদখলের নির্বাচনী প্রহসনের মাধ্যমে এ দেশে যে একটি ‘ব্যবসায়ীদের সরকার’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, সেটাই আরেকবার প্রমাণিত হলো ডিজেল-কেরোসিনের এবারের খামখেয়ালিপূর্ণ দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে।

পেট্রল ও অকটেনের দাম বেশি রেখে এই ভর্তুকি দেওয়ার কথা বরাবরই বলে থাকে সরকার। অর্থমন্ত্রীসহ কয়েকজন মন্ত্রী যুক্তি দিয়েছেন, ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে ডিজেলের দাম অনেক কম থাকায় ডিজেল ভারতে চোরাচালান হয়ে যাচ্ছিল। এখনো ভারতে ডিজেল ও পেট্রলের দাম বাংলাদেশের চাইতে বেশি, কিন্তু তাতে এ দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলা কি ঠিক হবে? আমি মনে করি, সরকার যত যুক্তিই দিক, একলাফে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া নিঃসন্দেহে বড়সড় ভুল। বরং সরকার যদি শুল্ক-ভ্যাট-করহার কিছুটা কমিয়ে পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসান কমাত এবং ভোক্তাদের প্রদেয় দাম ধাপে ধাপে বাড়াত, তাহলে অভিঘাত অনেক সহনীয় হতো। অর্থমন্ত্রী এহেন দ্রুত দাম বৃদ্ধির অভিঘাত ঠিকমতো বিশ্লেষণ করেছেন কি?

এবার ভোক্তাদের প্রতি সরকারের এবং পরিবহনমালিকদের নগ্ন জুলুমবাজির ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যাক। পরিবহনের মোট ভাড়ার এক-চতুর্থাংশের বা তার চেয়ে কম দায় পড়ে ডিজেলের খরচের ভাগে, বাকি তিন-চতুর্থাংশ মালিকের জমা (মুনাফা), পরিবহনের অবচয়ন বা ডিপ্রেসিয়েশন, ড্রাইভার-কন্ডাক্টর-সহকারীর বেতন, কর-চাঁদা তোলা ও যানবাহনের মেরামতি খরচের ভাগে পড়ে থাকে। এই মোটা দাগের হিসাবটা যদি মেনে নেওয়া হয়, তাহলে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ভাড়া যৌক্তিকভাবে বাড়ার কথা সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ। কিন্তু সরকারি দলের পৃষ্ঠপোষকতা-ধন্য মালিক সমিতিগুলোর ‘গোপন সমঝোতা’র ধর্মঘটকে পুঁজি করে সরকারের সঙ্গে সমঝোতার বৈঠকে পরিবহন ভাড়া একলাফে বাড়িয়ে দেওয়া হলো ২৭ শতাংশ। ভোক্তার পকেট কেটে মুনাফাবাজি আর কাকে বলে?

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে সরাসরি প্রশ্ন করছি, দয়া করে ২৭ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির অঙ্কটি মিলিয়ে দিন। দেখা যাচ্ছে এ ক্ষেত্রে শুধু পরিবহনমালিকদের স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে। এটা কি গণবিরোধী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ নয়? ডিজেলের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ একটি জ্বালানির দাম বৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে পরিবহনমালিকেরা যে তাঁদের স্বার্থ একতরফাভাবে হাসিল করে নিলেন, তা কি আপনারা বুঝতে পারলেন না? এই সরকার তো নিজেদের জনগণের সরকার দাবি করে, এটা কি তার নমুনা? পুরো বাজারে ইতিমধ্যে মূল্যস্ফীতির আগুন লেগে গেছে। লঞ্চের ভাড়াও বাড়ানো হলো। শোনা যাচ্ছে, শিগগিরই বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের দামও বাড়ানো হচ্ছে। লঞ্চের ভাড়ার ক্ষেত্রেও ডিজেলের অবদান এক-চতুর্থাংশের বেশি হওয়ার কারণ নেই। অথচ ওখানেও ৬ শতাংশের পরিবর্তে ভাড়া বাড়ল অযৌক্তিক ১৫ শতাংশ হারে। পরিবহনের ভাড়া ২৭ শতাংশ বাড়ানোর মোক্ষম অজুহাত লঞ্চমালিকেরা ছাড়বেন কেন?

বাংলাদেশের বাজারে এ রকম ভালো অজুহাত পেলে অহরহ দাম বাড়ানোটাই ‘সংস্কৃতিতে’ পরিণত হয়েছে। পালা-পার্বণ, ঈদ, পূজা, রমজান, বন্যা-সাইক্লোন, হরতাল-ধর্মঘট, আমদানি বিপর্যয়—যেকোনো একটি অজুহাত পেলেই বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা মুনাফাবাজির মওকা ছাড়তে রাজি নন। এ জন্যই বাংলাদেশকে বলা হয় ‘ট্রেডার্স প্যারাডাইস’ বা বণিকদের স্বর্গ। এবার যখন সরকারই ডিজেলের এহেন দামে উল্লম্ফন সৃষ্টির মাধ্যমে মওকা দিয়ে দিল, সেই মহাসুযোগ ব্যবসায়ীরা ছাড়বেন কেন? এবারের ২০১৮ সালের ব্যালট জবরদখলের নির্বাচনী প্রহসনের মাধ্যমে এ দেশে যে একটি ‘ব্যবসায়ীদের সরকার’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, সেটাই আরেকবার প্রমাণিত হলো ডিজেল-কেরোসিনের এবারের খামখেয়ালিপূর্ণ দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে।

যেসব মন্ত্রী ভারতে ডিজেলের দাম বাংলাদেশের চেয়ে এখনো বেশি থাকার নজির টেনে ডিজেলের ২৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করছেন, তাঁদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, কলকাতায় এখনো বাসের ভাড়া ঢাকার অর্ধেকের কাছাকাছি। ডিজেলের দাম ওখানে বেশি হওয়া সত্ত্বেও ভাড়া কম নেওয়া কীভাবে সম্ভব হলো? এর মানে, ওখানেও পরিবহনমালিকেরা ঠিকই মুনাফা করেন কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সরকার পরিবহনমালিকদের এখানকার মতো লাগামছাড়া মুনাফা করতে দিচ্ছে না। ভোটের গুরুত্বটা এখানেই স্পষ্ট, কারণ সেখানে জনগণের ভোট পেয়ে সরকারকে নির্বাচিত হতে হয়। তাই জনগণের কথা মাথায় রাখতে হয়, এখানে তা লাগে না।

এখন হেমন্তকালে সারা দেশে আমন ধান কাটার মৌসুম চলছে, এরপর শুরু হবে বোরো ধান লাগানোর মহাযজ্ঞ। ইতিমধ্যে সিলেটের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান রোপণ শুরু হয়ে গেছে। মনে রাখতে হবে, এখন বোরো ধানই বাংলাদেশের প্রধান ধান। দেশের ৬০ শতাংশ ধান বোরো মৌসুমেই উৎপাদিত হয়। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই বোরো ধানের জমিতে পানি সেচের পাম্প এবং শ্যালো টিউবওয়েলগুলো চালু করতে হবে। ওগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশই ডিজেলচালিত। সরকার বড় গলায় সারা দেশের শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ–সুবিধার আওতায় নিয়ে এসেছে দাবি করলেও দেশের সেচপাম্প এবং ডিপ ও শ্যালো টিউবওয়েলগুলোর ১০ শতাংশও এখনো বিদ্যুৎ–চালিত হয়নি। অথচ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব সেচপাম্প ও শ্যালো টিউবওয়েল এখন বিদ্যুৎ–চালিত। এখানেও পশ্চিমবঙ্গের অতীতের বাম ফ্রন্ট সরকারগুলো কৃতিত্বের দাবিদার। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ফলে এবারের বোরো চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে বিশেষজ্ঞ মহল থেকে সাবধানবাণী উচ্চারিত হচ্ছে।

আমার একান্ত অনুরোধ, সময় থাকতে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পাঁচ টাকায় নামিয়ে আনা হোক। প্রয়োজনে ডিজেলে ভর্তুকি দেওয়া হোক, অথবা সরকারের শুল্ক-ভ্যাট-কর নামিয়ে আনা হোক। বোরো উৎপাদন বিপর্যস্ত হলে সরকার বিপদে পড়বে। সাধু সাবধান!

  • মইনুল ইসলাম অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন