default-image

ইউরোপের দেশগুলোতে বাংলাদেশ যে বাণিজ্যসুবিধা পায় তা ধরে রাখার শর্ত হিসেবে মানবাধিকার যুক্ত হতে যাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেওয়া অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা বা জিএসপির (জেনারেলাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স) কারণে সেখানকার বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশ সহজ হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পের। বাংলাদেশকে ইইউর দেওয়া এ সুবিধা ২০২৩ সালে শেষ হতে যাচ্ছে।

ইংরেজি দৈনিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর এক খবরের শিরোনাম হচ্ছে হিউম্যান রাইটস কামস এজ নিউ কন্ডিশন ফর ইইউ জিএসপি। খবর হচ্ছে ২০২৩ সালের পর জিএসপি–সুবিধা নবায়ন করতে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই মানবাধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। জিএসপি–সুবিধা দেওয়ার শর্ত হিসেবে এবারই প্রথম মানবাধিকারের বিষয়টি যুক্ত হয়েছে।

বিদেশি যেকোনো সাহায্য–সুবিধা এমনকি ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা শর্ত থাকে। বাণিজ্যসুবিধা পাওয়ার বিষয়টিও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশ্বরাজনীতির নানা হিসাব-নিকাশ ও ধারা এখানে কাজ করে। ফলে এসব শর্ত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেও যায়। কিছু কিছু বাদ পড়ে আবার নতুন অনেক কিছু যুক্ত হয়। ইউরোপে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি করতে এখন যেসব বাধ্যবাধকতা মানতে হয়, শুরুতে তেমন কিছুই ছিল না। তৈরি পোশাকের কারখানাগুলোকে ইউরোপীয় ক্রেতাদের শর্ত হিসেবে সার্বিক মান (কমপ্লায়েন্স) নিশ্চিত করতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বাণিজ্যসুবিধার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রথমবারের মতো মানবাধিকারের বিষয়টি যুক্ত করতে যাচ্ছে—এ খবরের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, তা বিস্ময়কর। তিনি মনে করেন, এ জন্য কিছু সাংবাদিক ও এনজিও দায়ী। ‘আমাদের দেশের কিছু সাংবাদিক এবং এনজিও সব সময় এসব নিয়ে মাথা ঘামায়। তারা এটা করে কারণ, এ জন্য বিদেশ থেকে তারা অর্থ পায়। এসব নিয়ে তারা বিদেশিদের কাছে নিয়মিত ধরনা দেয় আর এ কারণেই বিদেশিরা এসব নিয়ে কথা বলে।’ তিনি এসব নিয়ে মাতামাতি না করাকে মঙ্গলজনক বলে মন্তব্য করেছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের দেশের কিছু সাংবাদিক আর এনজিও কি এত শক্তিশালী হয়ে গেল যে তারা দেশে দেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি–সুবিধার শর্ত কী হবে, তা ঠিক করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে! সরকারের এত বড় কূটনৈতিক ব্যবস্থাও তাদের সঙ্গে পেরে উঠছে না? বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধার সঙ্গে ভবিষ্যতে মানবাধিকারের যে শর্ত যুক্ত হবে, তা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যেই অন্য দেশে কার্যকর করেছে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে মানবাধিকার ইস্যুতে ইইউ কম্বোডিয়ার বাণিজ্যসুবিধা কমিয়ে দিয়েছে। ইইউ তখন যুক্তি দিয়ে বলেছিল, ২০১৭ সাল থেকে অব্যাহতভাবে কম্বোডিয়ার রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিষয়টি লঙ্ঘিত হওয়ায় তারা এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। কম্বোডিয়াকে দেওয়া শুল্কমুক্ত ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ বা ইবিএ (অস্ত্র ছাড়া সব পণ্য) বাণিজ্যসুবিধা আংশিক স্থগিত করায় ইউরোপীয় দেশগুলোতে দেশটির রপ্তানি ২০ ভাগ কমে যাবে বলে তখন বলা হয়েছিল। ইইউর এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ফলে কম্বোডিয়ার তৈরি পোশাক, জুতা ও চিনি ইউরোপের দেশগুলোতে শুল্ক ছাড়া প্রবেশের সুযোগ হারিয়েছে। ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল এক বিবৃতিতে তখন বলেছিলেন, গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে এমন কিছুর পাশে ইইউ দাঁড়াবে না।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে সম্পর্ক আবার জোরালো হলে বিশ্বরাজনীতিতে পশ্চিমের ভূমিকা আবার জোরদার হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, দুর্নীতি—এসব বিষয় নিয়ে তাদের নজরদারি বা খবরদারি যা-ই বলি, সামনের দিনগুলোতে নতুন করে বাড়তে পারে

কম্বোডিয়ায় ইইউর জিএসপি আংশিক স্থগিত করার পেছনে সেখানকার সাংবাদিক বা এনজিওগুলোর কোনো ভূমিকা ছিল কি না বা দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমন অভিযোগ করেছিলেন কি না, আমাদের জানা নেই। তবে কম্বোডিয়ার বিরুদ্ধে নেওয়া ইইউর ব্যবস্থাটি ছিল অনেক দেশের জন্যই একটি সতর্কবার্তা।

কম্বোডিয়ার ঘটনার পর পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, ‘কম্বোডিয়ার বিরুদ্ধে ইইউর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়ার আছে। কারণ, শ্রম অধিকার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্যই তাদের জিএসপির আংশিক বাতিল হয়েছে। অর্থাৎ কম্বোডিয়ার বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা থেকে আমরা বুঝতে পারি, এসব বিষয়ে আমরা যদি সাবধান না হই, তাহলে আকস্মিক খড়্গ নেমে আসতে পারে। (প্রথম আলো, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০)

বাংলাদেশের ওপর আকস্মিক কোনো খড়্গ নেমে আসেনি। ২০২৩ সালের পর নতুন করে জিএসপির সুবিধা পেতে হলে মানবাধিকারে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। ইইউ এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারকে একটি চিঠি দিয়েছে। তারা সরকারকে জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউর (ইউপিআর) সুপারিশ মেনে মানবাধিকারসংক্রান্ত বিষয়গুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারে সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরার কথা বলেছে। মানবাধিকারের পাশাপাশি শ্রম অধিকারের মান নিশ্চিত করার শর্তও থাকছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়ায় এটা মনে হওয়া স্বাভাবিক যে ইইউর মানবাধিকারবিষয়ক শর্তের বিষয়টিকে তিনি ভালোভাবে নেননি। মানবাধিকারের ক্ষেত্রে সরকার যা দাবি করে আসছে তাতে এ ধরনের শর্তে বিচলিত হওয়ার তো কোনো কারণ নেই। এ বছরের জানুয়ারিতে আইনমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সারা বিশ্বে প্রশংসনীয় এবং মানবাধিকারকে কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায়, সে ব্যাপারে তাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি এ মন্তব্য করেছেন মানবাধিকারসংক্রান্ত ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউর বাস্তবায়নবিষয়ক কর্মশালায়। এর আগে ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে জেনেভায় জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটির সভায় হাজির হয়ে আইনমন্ত্রী দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ মানবাধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা পূরণে সচেষ্ট আছে এবং সেই ধরা অব্যাহত থাকবে।

বিজ্ঞাপন
সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ধারণা আর সরকারের দাবির মধ্যে ফারাকটি অনেক বেশি।

তবে সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ধারণা আর সরকারের দাবির মধ্যে ফারাকটি অনেক বেশি। অন্যদিকে বিশ্বরাজনীতির গতি–প্রকৃতিতে কিছু বদলের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পশ্চিম একসময় যে ভূমিকা পালন করত, তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর উদ্যোগ লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয় ও বাইডেনের বিজয় তাকে বাড়তি গতি দিতে পারে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউরোপের উদার গণতান্ত্রিক দেশগুলোর বদলে হাঙ্গেরি, স্লোভেনিয়া ও পোল্যান্ডের মতো চরম ডানপন্থীরা ক্ষমতায় আছে এমন কিছু দেশের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফল ইউরোপের নেতৃস্থানীয় দেশগুলোকে চাঙা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে সম্পর্ক আবার জোরালো হলে বিশ্বরাজনীতিতে পশ্চিমের ভূমিকা আবার জোরদার হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, দুর্নীতি—এসব বিষয় নিয়ে তাদের নজরদারি বা খবরদারি যা-ই বলি, সামনের দিনগুলোতে নতুন করে বাড়তে পারে।

এ কে এম জাকারিয়া প্রথম আলোর উপসম্পাদক

akmzakaria@gmail.com

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন