>আগামী ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ঢাকা সিটি নির্বাচনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই প্রার্থীই নতুন। বিএনপি থেকে লড়ছেন ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেন। নির্বাচন সামনে রেখে তিনি নির্বাচনী পরিস্থিতি, প্রচার-প্রচারণা ও নিজেদের নগরভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান

প্রথম আলো: ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস বলেছেন, আপনার সঙ্গে তাঁর লড়াই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। কারচুপির আশঙ্কা করছেন, নাকি সুষ্ঠু ভোটে আশাবাদী?

ইশরাক হোসেন: প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়া আর ভোট সুষ্ঠু হওয়া আলাদা বিষয়। এখানে আশঙ্কা কথাটা কতটা কার্যকর, জানি না। কারণ, কারচুপির চেষ্টা করা হবে। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের সামর্থ্য বর্তমান ইসির নেই। সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ ঘটেছে এবং তাকে ভেঙে ফেলা হয়েছে।

প্রথম আলো: যদি তাই হবে, তাহলে নির্বাচনে কেন আছেন?

ইশরাক হোসেন: কারণ, আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আছি। তারই অংশ হিসেবে নির্বাচন করছি। ভোটের দিন মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় যা যা করণীয়, আমরা সেসব পদক্ষেপ নেব।

প্রথম আলো: নির্বাচনী প্রচারণায় আচরণবিধি লঙ্ঘন বা হিংসাশ্রয়ী ঘটনা কতটা ঘটছে?

ইশরাক হোসেন: অন্তত ১০টি। প্রতীক বরাদ্দের দিনই বংশাল থানা বিএনপির সভাপতি ও কাউন্সিলর প্রার্থীকে সাদাপোশাকধারী পুলিশ মতিঝিলের একটি হোটেলে ঘণ্টা দুই আটকে রাখে এবং পরে গ্রেপ্তার করে। পরে ওয়ারেন্ট প্রদর্শন করা হয়। ইসির সভায় ঘটনাটা বলার পর তারা বলে যে পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার করা যাবে না। এরপর প্রতিনিয়ত এলাকাবাসী ও মিডিয়াকর্মীরা প্রশ্ন করছেন, আপনাদের পোস্টার দেখি না কেন। বিভিন্ন জায়গায় কাউন্সিলর প্রার্থী ও নেতা-কর্মীরা অনবরত আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রবীণ কাউন্সিলর প্রার্থী হাজি লিয়াকত আলীর মাথা ফাটানোর ঘটনায় ওয়ারী থানায় গিয়েছিলাম। ওসির মনোভাব না হয় বিস্তারিত না-ই বললাম। কিছুক্ষণ আগে (রাত একটা) যদি আসতেন, তাহলে ঢাকা দক্ষিণের একজন দলীয় আলোকচিত্রীর সেলাইভর্তি মস্তক দেখতে পেতেন। তিন-চার দিন আগে পোস্টার ছেঁড়ার ছবি তুলতে গেলে তিনি চাপাতির কোপ পান। বংশালে মাইকিং করার সময় একজন নিরীহ রিকশাচালক প্রহৃত ও সেখানকার ক্যাম্প ভেঙে দেওয়া হয়।

প্রথম আলো: ইসিতে নালিশ করেছেন, তারা কী করেছে? আপনারা জবাবে কী করেছেন?

ইশরাক হোসেন: ইসিতে সচিত্র প্রমাণ জমা পড়েছে, কোনো প্রতিকার পাইনি। আর আমাদের প্রতিরোধ বা হামলার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ, আমরা প্রতিবাদের গণতান্ত্রিক পথ বেছে নিয়েছি। নেতা-কর্মীদের বলেছি, আইন মানবেন। জনগণই যথাসময়ে প্রতিরোধ গড়বে। আমরা আইন হাতে তুলে নেব না। দু-তিনবার আমি ইসিতে গিয়েছি, এরপর বন্ধ করে দিয়েছি। সিইসিকে আমি বলার পর তিনি রিটার্নিং অফিসারকে দেখতে বলেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে প্রতিকার পাইনি। তবে কিছু ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার সাহায্য পেয়েছি। বিনা কারণে কর্মীদের গ্রেপ্তারের পর তাঁদের জানালে তাঁরা ছাড়া পান।

প্রথম আলো: কতগুলো জায়গা ঝুঁকিপূর্ণ?

ইশরাক হোসেন: কামরাঙ্গীরচরকে আমি শুধু ব্যক্তিগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছি। আর কোনো এলাকাকে নয়। আমি ঢাকার সন্তান, আমার কিসের ভয়? কামরাঙ্গীরচরে গাড়িবহর নিয়ে যাই। যাওয়ার আগে ওসি, র‌্যাব কর্মকর্তাকে জানাই। তাঁরা অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তাচৌকি বসান। সন্ত্রাসীরা আমাদের পক্ষে গণজোয়ার দেখে স্থান ত্যাগ করে।

প্রথম আলো: দুই দলের ঐতিহাসিক বিরোধ সবার জানা। কিন্তু আপনারা দুজন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার কারণে প্রচারণায় তার কী ছাপ আছে?

ইশরাক হোসেন: সবাইকে সম্মান দিয়ে কথা বলা, জ্যেষ্ঠকে সমীহ করে চলা ইত্যাদি মেনে চলি। সেটা পরিবার থেকে পেয়েছি, পাশ্চাত্যের বিষয় নেই। প্রকৌশলী বিবেচনায় নগর-পরিকল্পনা, নগর ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমি প্রতিনিয়ত গবেষণা করি। বিশ্বের বড় শহরগুলোর বর্জ্য ও সড়ক ব্যবস্থাপনা আমার আগ্রহের বিষয়। কমন ইউটিলিটি টানেল নিয়ে আমি একটি ভিডিও চিত্র ছেড়েছি। এটা রাস্তা কাটা থামাবে।

প্রথম আলো: প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ, যা আমাদের সংস্কৃতিতে আছে?

ইশরাক হোসেন: না। তা পাইনি। বরং প্রতীক বরাদ্দের দিনে ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে। আমরা নিজ নিজ আসনে বসে ছিলাম। তিনিই করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন। এবং তিনি বলেন, আপনার বাবা আমাকে অনেক স্নেহ করতেন। আমিও সেটা জানতাম। কারণ, আমার বাবা মেয়র থাকাকালে তিনি কিছুদিন সাংসদ ছিলেন। ইউটিউবে এখনো দেখা যায়, তাঁরা একসঙ্গে একটি সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন। তিনি আমার অগ্রজ। সালাম দিয়ে আমি যথারীতি তাঁর সঙ্গে কুশল বিনিময় করি। তাঁর এক চাচাতো ভাই (নাজিউর রহমান মঞ্জুর কনিষ্ঠ ছেলে ওয়াসিক) আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সেই সুবাদে আমি তাঁকে বড় ভাই সম্বোধন করেছিলাম। আর বাবার কথায় তাঁর প্রতি আমার একটি তাৎক্ষণিক দুর্বলতা তৈরি হয়। আমার প্রতিপক্ষ যে কেউ হতে পারতেন, স্পোর্টিং মনোভাবে তাঁকে সম্মান দেখানোই আমার কর্তব্য। প্রচারণায় তিনি আমাকে অবশ্যই ব্যক্তিগত আক্রমণ করেননি, আমিও করিনি। দেড় ঘণ্টার একটা টক শোতে আমরা সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে কথা বলেছি।

প্রথম আলো: চার শ বছরের ঢাকায় এই প্রথম ইভিএম ও দুজন করে সেনাসদস্যের উপস্থিতিতে ভোট হওয়া অধিকতর নিরাপত্তাবোধ তৈরি করল কি না?

ইশরাক হোসেন: এর আগে সংসদ নির্বাচনে ছয়টি কেন্দ্রে ইভিএম আমরা দেখেছি। ইসি থেকে যতটা জেনেছি, সেনাবাহিনীর পোশাক পরিহিত বা সশস্ত্র কেউ থাকবেন না। তাঁরা সাদাপোশাকে এবং বুথের মধ্যেই থাকবেন। বাইরে থেকে তাঁদের দেখাই যাবে না। তাই নিরাপত্তার সেই প্রভাব থাকার প্রশ্ন নেই। আর দ্বিতীয় কথা হলো যন্ত্রের পেছনের মানবই আসল। যেভাবে চালানো হবে, সেভাবে যন্ত্র চলবে। আমরা জানি, সফটওয়্যারটি সেনাবাহিনী পরিচালিত বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে তৈরি হয়েছে। অবশ্য রিটার্নিং অফিসার এক প্রশ্নের জবাবে আমাকে বলেছেন, এটা জার্মানির। ইসির কাছে প্রশ্ন করায় তারা বলেছে, আমরাই তৈরি করেছি। সুতরাং বিষয়টি অস্পষ্ট। এতে পুনর্গণনার সুযোগ নেই। বড় কথা হলো, ভোটকেন্দ্র দখল হয়ে গেলে ইভিএম কাজ করবে না। নিরপেক্ষ লোক ভোট পরিচালনা করলে বর্তমান ইভিএমও কাজ দিত। দলীয় সরকারের অধীনে এটা কাজে দেবে না, বাংলাদেশে।

প্রথম আলো: পুনর্গণনার নিয়ম আইনে আছে?

ইশরাক হোসেন: আমার জানামতে, আমরা পুনর্গণনার সমস্যার কথা বলেছি, কিন্তু আইনগত দিকটি দেখা হয়নি, যা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম আলো: বিদায়ী মেয়র সাঈদ খোকনের বড় সাফল্য বা বড় ব্যর্থতা কী?

ইশরাক হোসেন: এ নিয়ে এখন কোনো মন্তব্য করব না।

প্রথম আলো: ফজলে নূর তাপস নির্দিষ্টভাবে কিছু পরিকল্পনা তুলে ধরছেন—

ইশরাক হোসেন: আমি তাতে নতুনত্ব পাইনি। কারণ, যানজট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য অপসারণের মতো সমস্যা সবারই জানা। আমি কিছু বলেছি, যা ঢাকায় নতুন হবে, বিশ্বের বড় শহরগুলোতে আছে। যেমন বর্তমান গোল পাইপের পরিবর্তে চৌকোনা বক্স কালভার্টের (ভেতর কম্পার্টমেন্ট থাকবে) মতো ইউটিলিটি টানেল হবে। আর বর্জ্য থাকবে বদ্ধ কনটেইনারে, যাকে চাপ দিয়ে বর্গাকৃতির ব্লকে পরিণত করা হবে। পরে বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে তা ব্যবহার করা যাবে।

প্রথম আলো: নগর ভবনে গেলে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে কাটছাঁট করবেন?

ইশরাক হোসেন: না, কেন আমি তা করব। তিনি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতৃত্বদানকারী। যদিও তিনি পরে বাকশাল করেছিলেন। আমি তা করব না। আশা করব, জিয়াউর রহমানের জন্মদিনের কর্মসূচিও কাটছাঁট করার দরকার পড়বে না।

প্রথম আলো: ভোটার উপস্থিতি কত শতাংশ আশা করছেন?

ইশরাক হোসেন: নির্দিষ্ট করে অনুমান করতে পারব না। তবে আমাদের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত হলো, ভোটকেন্দ্রে সর্বাধিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা। ভোটকেন্দ্রে যা-ই ঘটুক, আমাদের কর্মী-সমর্থকেরা বিপুল সংখ্যায় ভোট দিতে যাবেন। 

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

ইশরাক হোসেন: ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন