মার্জিত রুচির মানুষ তৈরি হবে কীভাবে

অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নতি নিয়ে দ্বিমত নেই। বৈষম্য–বঞ্চনার প্রসঙ্গ এখানে তুলব না। দৃশ্যমান উন্নয়নের কথাও থাক। যে কথা চেপে যাওয়া মুশকিল তা হলো মানবসম্পদের অধঃপতন। অকাতরে মিথ্যা ও কপটাচার চলছে, অসহিষ্ণুতা ও নিষ্ঠুরতা বাড়ছে। লুণ্ঠন, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার সীমা ছাড়িয়েছে। মানুষে মানুষে আস্থা নষ্ট হচ্ছে, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর দুর্বলের প্রত্যাশার ভিত দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতাবানের দাপটে তারা অসহায়। মেয়েরা আজ সবচেয়ে অনিরাপদ। অন্য দেশের দৃষ্টান্ত টেনে নিজেদের বাস্তবতাকে হালকা করে দেখার উপায় নেই। গভীরভাবে বিচার করলে এ থেকে বেরোনোর পথ কি নেই? ছিল না? প্রশ্ন হলো কেন এমন হলো?

যে রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ফসল বাংলাদেশ, তার সম্পূর্ণ অভিনিবেশ ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করে বাংলাদেশ রাষ্ট্র কায়েম। সে কাজ হয়েছে। তৎকালীন রাজনীতি ও আন্দোলনমুখী সংস্কৃতি ছিল অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক উদার মানবতাবাদী ধারার। কিন্তু তা ছিল রাজনৈতিক বক্তৃতায়-ভাষ্যে-বিবৃতিতে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, মঞ্চে, সেমিনারে, নানা প্রকাশনায় সীমাবদ্ধ। সমাজের অভ্যন্তরে, পরিবারের গণ্ডিতে, একাডেমিক জগতেও আলোচনা বা তর্কবিতর্ক হয়নি। নবীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো পুরোনো সমাজের ওপর।

বিজ্ঞাপন
আইনকে উপেক্ষা করার প্রবণতা থেকেই লুণ্ঠন, পাচার, অবৈধ কারবার লাগামহীনভাবে অনেক দিন ধরে চলছে। লোভ বাড়তে বাড়তে ভোগের উৎসব শুরু হয়েছে, যাতে নারীকে বলি দিচ্ছে একদল পুরুষ। বোঝা যাচ্ছে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বন্ধের আইন রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যর্থ।

গত ৫০ বছরে রাষ্ট্র অনেক গণতান্ত্রিক দলিল ও আইন প্রণয়ন করেছে, আন্তর্জাতিক অনেক মানবিক দলিলে স্বাক্ষর করেছে, কিন্তু সমাজকে এসব মানাতে পারেনি। ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের অঙ্গীকারকে অকেজো করে সংবিধানের একতরফা ধর্মীয়করণ হয়ে গেল উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই। কুদরাত-এ-খুদা কমিশনের শিক্ষা রিপোর্ট কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বেইজিং ঘোষণায় বাংলাদেশ স্বাক্ষর করলেও, এর ভিত্তিতে কিছু আইনি বিধান হলেও, বাস্তবে নারীর স্বাধীনতা তো সংকুচিত হচ্ছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং আদালত হয়েও তো বাস্তবে নারীর দুর্দশা কমছে না, বেড়েই চলেছে। বলা যায়, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষাকে সমাজ তেমন গুরুত্ব দেয়নি।

আইনকে উপেক্ষা করার প্রবণতা থেকেই লুণ্ঠন, পাচার, অবৈধ কারবার লাগামহীনভাবে অনেক দিন ধরে চলছে। লোভ বাড়তে বাড়তে ভোগের উৎসব শুরু হয়েছে, যাতে নারীকে বলি দিচ্ছে একদল পুরুষ। বোঝা যাচ্ছে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বন্ধের আইন রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যর্থ। এ অপরাধকে লুট বা দখলের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। এটি এক ব্যক্তির রিপুর তৃপ্তি সাধনের জন্য অনিচ্ছুক অন্যের ওপর অবৈধ জবরদস্তিমূলক আচরণ, এ এমন এক অপরাধ যাতে দেহের পুরোগামী হয় তার মন, যা বিকৃত অবৈধ বাসনাকে লালন করে।

এই ধর্ষণ-অপরাধের মঞ্চ রাষ্ট্র নয়, সমাজ। সমাজ রাষ্ট্রের মতো কাঠামোবদ্ধ নয়, স্পষ্ট কোনো আইনেও চলে না, চলে যে প্রথা-সংস্কারের কানুনে সেগুলোর পরিবর্তন ঘটে ধীরে। রাষ্ট্রের আইনে নারী-পুরুষের সমানাধিকার স্বীকৃত হলেও সমাজে বহুকাল ধরেই পুরুষশাসিত অসাম্য ষোলো আনা বিরাজমান। এ ঐতিহ্য সনাতন, নারী-পুরুষ সবাই এখানে পুরুষের আধিপত্য মেনে চলতে অভ্যস্ত। এমনকি পুরুষের অপরাধের প্রতি প্রশ্রয়ের উপেক্ষাই যেন সামাজিক রীতি নারীর প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রেও। এ কারণেই ধর্ষণের মামলার নিষ্পত্তির হার লজ্জাজনকভাবে কম। এ সূত্রে ফ্রেডারিক অ্যাঙ্গেলসের প্রাসঙ্গিক একটা কথা মনে পড়ছে। তিনি লিখেছিলেন, পুরুষ সংসারে তার আধিপত্য নিশ্চিত করে নিয়েছে নারীকে দাসী পর্যায়ে অবনমিত করে। স্ত্রীর পরিণতি ঘটেছে স্বামীর কাম চরিতার্থ করার দাস ও সন্তান উৎপাদনের যন্ত্রে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া পুরুষের মনোভাব কি একালেও খুব বেশি পাল্টেছে?

সত্যি যদি আমরা একটি সুস্থ অগ্রসরমাণ সমাজ তৈরি করতে চাই, তাহলে ছেলেমেয়েদের সুষ্ঠু বিকাশকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাদের বিকাশকে রুদ্ধ করার বা ভুল পরিচালনার সব অপচেষ্টা বন্ধ করে মুক্তির পথ দেখাতে হবে

এ কথা ঠিক বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তিগত বিপ্লবের ফলে সামাজিক ছক পরিবর্তিত হয়েছে। নতুন বাস্তবতায় যেমন চ্যালেঞ্জ আছে, তেমনি সুযোগও তৈরি হয়েছে। ক্ষুদ্রঋণ, তৈরি পোশাক খাত, নির্মাণকাজ, এমনকি বিদেশের শ্রমবাজার নিম্নবর্গের নারীদের জন্য উপার্জন করে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুলে দিয়েছে। এর সঙ্গে যৌন হেনস্তার আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে, তবে নারীর পথ রুদ্ধ না করেই এর সমাধান খুঁজতে হবে।

স্বামী-স্ত্রী উভয়েই উপার্জন করেন এমন পরিবার শহরে-গ্রামে সর্বত্র বেড়ে চলেছে। কিন্তু নারীর এই দৃশ্যমান ক্ষমতায়ন এবং চলাচলের স্বাধীনতা তাঁর সামাজিক শৃঙ্খলমুক্তি বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। এই ক্ষমতায়নে পুরুষের যৌন আধিপত্য এবং যৌন আগ্রাসন কি সংসারে কি সমাজে রুখে দেওয়া যায়নি। সামাজিক ছক পরিবর্তন সত্ত্বেও পুরুষতন্ত্রের দুর্ভেদ্য দেয়ালে চিড় ধরেনি, সমতা ও সমঝোতার গরজ সে বোধ করে না।

পুরুষ সংসারে ও সমাজে নারীর আওতার বাইরে থেকে তার একচ্ছত্র স্বাধীনতা ভোগ করে চলেছে। জার্মান দার্শনিক স্পেংলার বলেছিলেন, পুরুষ হলো শিকারি প্রাণীর মতো। ফলে তাকে মানুষ করে তোলার, তার মনুষ্যত্ব রক্ষার ব্যবস্থা চাই। তার নিজেরও মানুষ থাকার দায় রয়েছে, সে যোগ্যতা তার অর্জিত হওয়া চাই। বলা বাহুল্য, প্রকৃত শিক্ষাই পুরুষের এই প্রবৃত্তির লাগাম টেনে ধরতে পারত। তাই এখন কবুল করতে হয়, আমরা যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার সন্ধান পাইনি, যদিও তা দুর্লভ কিছু নয়।

ধর্ষণের প্রবৃত্তির কাছে পুরুষের আত্মসমর্পণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারত শৈশব থেকে বুদ্ধিবৃত্তি ও সুকুমার বৃত্তিচর্চার অপরিমেয় সুযোগ। এর ফলে কৈশোরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তার একটি মার্জিত মন ও পরিশীলিত রুচি তৈরি হতো, যা তাকে দিত আত্মমর্যাদার বোধ। এমন ছেলের মনে নিজের একটি পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির ধারণা তৈরি হয় এবং তা রক্ষার দায় সে বোধ করে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাই মানুষকে উন্নত চরিত্রের অধিকারী করে। বাঙালির এ দুয়ের ঘাটতি নিয়ে তিনি বহুকাল আগেই আফসোস করে গেছেন।

বিজ্ঞাপন

আমাদের সমাজের গরিষ্ঠাংশ মানুষের মন-মানসিকতা যে অমার্জিত রুচিহীন হয়ে পড়েছে, তার দায় নিতে হবে রাষ্ট্রকে। এই সূত্রে তিনটি বিষয় উল্লেখ করব। প্রথমত, রাষ্ট্রশক্তি যে রাজনীতির ওপর নির্ভর করছে তাকে ক্ষমতার যূপকাষ্ঠে বলি দেওয়া হয়েছে, তাতে সুরুচিসম্পন্ন মার্জিত মনের মানুষ রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়েছেন। আজ রাজনীতি চেতনার বৃহত্তর পটভূমি হারিয়ে ব্যক্তি ও দলের আশু ক্ষুদ্র স্থূল লক্ষ্যের বিবরে ঢুকে পড়েছে। দ্বিতীয়ত, এই ব্যাধির প্রতিকারে মূল দাওয়াই তো শিক্ষা। কিন্তু শিক্ষাকে পরীক্ষার যূপকাষ্ঠে বলি দিয়ে বিশুদ্ধ জ্ঞান, বুদ্ধিবৃত্তি ও সুকুমার বৃত্তির চর্চা অসম্ভব করে মার্জিত মন ও পরিশীলিত রুচির মানুষ সৃষ্টির কাজকে ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে। তৃতীয়ত, আমাদের অজান্তে, কোভিড-১৯–এর হামলার অনেক আগে থেকেই, এ দেশে শিশু-কিশোরেরা অন্দরের বাসিন্দায় পরিণত হয়েছে, বাসা হলো খাঁচা, স্কুল কারাগার, কোচিং সেন্টার কনডেমড সেল। তাদের জীবন থেকে মাঠ, খেলাধুলা প্রায় হারিয়ে গেছে; সমবয়সীদের সঙ্গে মিলে সংঘ গড়ে পাঠাগার, দেয়াল পত্রিকা, পিকনিক, আড্ডা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক উধাও; কলেজে নেই সুস্থ ছাত্ররাজনীতি, নির্বাচন ও ছাত্র সংসদ, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। তাদের জীবনে সমবয়সী মেয়েদের সাহচর্য নেই। একটু বড় যে আপু ও দিদিমণিরা কিশোরদের জীবনে সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রেরণাদাত্রী, তারা সব আজ অনুপস্থিত।

এ সমাজে শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য সত্যিকারের প্রাণবন্ত আনন্দময় সুস্থ পরিবেশ থেকে বঞ্চিত। নিরানন্দ বন্দিজীবনে কিশোর-তরুণদের বয়সোচিত যৌন তাড়নাকে উসকানোর উপাদান ঘরে বসে বা প্রতিবেশেই মেলে। প্রাণহীন বিপন্ন অসুস্থ পরিবেশ মানুষ তৈরির উপযোগী নয়, এ পরিবেশ ধর্ষক, মাদকসেবী, কিশোর গ্যাং আর আইন ভেঙে বাহাদুরি দেখানোর মাস্তান তৈরি করতেই সক্ষম। শরীর মনের রূপান্তর বা সদ্য প্রাপ্ত ক্ষমতায় তারা থাকে স্পর্শকাতর, অস্থির, নাজুক অবস্থায়। ফলে দূষিত পরিবেশ তারা ভুল অ্যাডভেঞ্চারে প্রবৃত্ত হয়ে অন্যায় অপরাধে জড়িয়ে যায়। এটা একটা ভয়ানক ট্র্যাজেডি এ সমাজ ঘটাচ্ছে, ঘটতে দিচ্ছে।

সত্যি যদি আমরা একটি সুস্থ অগ্রসরমাণ সমাজ তৈরি করতে চাই, তাহলে ছেলেমেয়েদের সুষ্ঠু বিকাশকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাদের বিকাশকে রুদ্ধ করার বা ভুল পরিচালনার সব অপচেষ্টা বন্ধ করে মুক্তির পথ দেখাতে হবে।


আবুল মোমেন কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

মন্তব্য পড়ুন 0