>
default-image
উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত, তা চিহ্নিত করার লক্ষ্যে গবেষণা করছে কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টার। অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি সামাজিক, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত উন্নয়নের ওপরও জোর দিচ্ছে সংস্থাটি। বাংলাদেশের জন্য ভিশন ২০২১ অর্জনে এই গবেষণাভিত্তিক কিছু নিবন্ধ প্রকাশ করছে প্রথম আলো। আজ প্রকাশ করা হলো অষ্টাদশ নিবন্ধটি।

ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশ অবিশ্বাস্য সাফল্য পেয়েছে। ১৯৯০ সালে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের দুই-তৃতীয়াংশই প্রয়োজনের তুলনায় কম ওজনের ছিল, কিন্তু বর্তমানে তা এক-তৃতীয়াংশেরও কম। সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অসামান্য সাফল্যের জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা থেকে একটি ‘বিশেষ স্বীকৃতি’ পুরস্কার

লাভ করেছে।
পুরস্কার লাভ করার পরও দেশে অপুষ্টির হার এখনো বেশ উচ্চ এবং শিশুর খর্বাকৃতির সমস্যা একটি বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। শিশুরা যখন দীর্ঘদিন ধরে অপুষ্টিতে ভোগে এবং শৈশব থেকেই বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়তে হয়, তখন তারা তাদের বয়সের তুলনায় স্বাভাবিকের চেয়ে খাটো অথবা খর্বকায় হতে পারে। খর্বকায় সমস্যা শিশুর জ্ঞানের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে, তাদের স্বাস্থ্য ক্রমেই খারাপ হতে থাকে এবং স্কুলের পরীক্ষায় তারা ভালো ফল করে না। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও তাদের সমস্যা রয়ে যায়। এটি বিশেষত বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর, কারণ এখানে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৬০ লাখ শিশু খর্বকায়।
অপুষ্টি এবং এর বিপজ্জনক প্রভাবগুলোর সঙ্গে লড়াই করার সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলগুলো কী? ‘বাংলাদেশ প্রায়োরিটিজ’ প্রকল্প এই বিষয়ে এবং অন্যান্য অনেক চ্যালেঞ্জের সমাধান দিতে পারে। কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টার ও ব্র্যাক-এর মধ্যে একটি অংশীদারত্বের চুক্তির অধীনে প্রকল্পটি কাজ করছে। বাংলাদেশ কীভাবে এর উন্নয়ন প্রচেষ্টায় ব্যয়িত প্রতি টাকায় সর্বোচ্চ কল্যাণ সাধন করতে পারে, তা নিয়ে গবেষণা করতে এ দেশের আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক বেশ কিছু শীর্ষ অর্থনীতিবিদকে যুক্ত করেছে প্রকল্পটি।
সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড লিগ্যাল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস স্টাডিজের গবেষণা উপদেষ্টা জোনাথন রোজের করা নতুন গবেষণাটি অল্পবয়সী শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের কাছে পুষ্টি এবং পুষ্টি উপাদান পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে অপুষ্টির বিরুদ্ধে লড়াই করার কর্মসূচি সম্পর্কে অনুসন্ধান করেছে। কর্মসূচিটি অসহায় জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে করা, যাতে অন্তর্ভুক্ত আছে শিশুকে মায়ের দুধ পান করানো সম্পর্কে শিক্ষা, উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার, আয়োডিনযুক্ত লবণ ও ভিটামিন-এ-এর পরিপূরক, জিঙ্ক অথবা অন্যান্য অনুপুষ্টি সরবরাহ করা। এই কর্মসূচির বেশির ভাগ ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের ন্যাশনাল নিউট্রিশন সার্ভিসের কৌশলগত পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, কিন্তু সামর্থ্য ও জনবলের অভাবে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
পুষ্টি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতি শিশুর পেছনে ৯ হাজার ৮০০ টাকার কাছাকাছি খরচ হয়। (যদি প্রত্যেককেই পুষ্টি প্রদান করা হয়, শিক্ষা, পুষ্টি ও পুষ্টি উপাদানের সমষ্টি থেকে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে খর্বকায় সমস্যার হারের ওপর, যা ৩৬ শতাংশ থেকে আনুমানিক ২৯ শতাংশে নেমে আসবে— এতে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার শিশুর খর্বকায় সমস্যা দূর করা যাবে)। খর্বকায় হওয়ার অনেক ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে: এটি মানসিক বিকাশকে ব্যাহত করে, স্কুলে পারফরম্যান্স নিম্নমানের হয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস করে, স্বাস্থ্য ক্রমেই খারাপ হয় এবং পরবর্তী জীবনে নানা রোগব্যাধিতে ভোগে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাবটি হলো, এই সমস্যাগুলোর কারণে খর্বকায় শিশুদের আয় সারা জীবন কম থাকে। গবেষণাটি দেখায় যে পুষ্টি প্রচেষ্টার পেছনে ব্যয়িত প্রতি টাকা প্রায় ১৯ টাকার সামাজিক কল্যাণ সাধন করতে পারে।
একটি প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণে, পুষ্টি কর্মসূচি কীভাবে অন্তঃসত্ত্বা নারীদেরও সাহায্য করতে পারে—এই ব্যাপারে রোজ দৃষ্টিপাত করেন। বাংলাদেশে, মাতৃস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে আমরা একটি অসাধারণ উন্নতি দেখেছি, মাতৃমৃত্যুর হার গত এক দশকে ৪০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। কিন্তু এখনো আরও অনেক কিছু করার বাকি, কারণ বিশেষ করে নবজাতকের শরীরে তার মায়ের পুষ্টি বাহিত হয়। মাকে পুষ্টির জোগান দেওয়া একটি লাভজনক প্রস্তাব হতে পারে।
মাকে যদি উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার দেওয়া হয় তাহলে তা মৃত এবং খর্বাকৃতির শিশু জন্মদানের আশঙ্কাকে কমিয়ে দেয়। ক্যালসিয়াম মায়ের প্রি-একলামশিয়া রোধে সাহায্য করে, যা তাঁদের জন্য মারাত্মক হতে পারে এবং আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড মায়েদের রক্তশূন্যতা কমাতে পারে—যা মাতৃমৃত্যুর একটি কারণ। এ ছাড়া এগুলো শিশুর জন্মগত ত্রুটিও কমায়। প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও আয়রন গ্রহণের ফলে শিশু সঠিক ওজন নিয়ে জন্মায়। কম ওজন নিয়ে জন্মানো নবজাতকদের মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। এ ছাড়া তারা পরবর্তী জীবনে জটিল রোগে বেশি ভোগে এবং খর্বকায় হয়। গবেষণাটি হিসাব করে দেখেছে যে বাংলাদেশে জন্মানো ১৫ শতাংশ শিশুর জন্মকালীন ওজন কম।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাকে আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড সরবরাহ করা হলো নিঃসন্দেহে সবচেয়ে সাশ্রয়ী কৌশল। বাংলাদেশে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড জোগান দেওয়ার মাধ্যমে মায়েদের রক্তশূন্যতার ঝুঁকি ৬৯ শতাংশ পর্যন্ত কমবে এবং জন্মকালীন স্বল্প ওজন কমবে প্রায় ৩ শতাংশের কাছাকাছি। এটি শিশু ও মাতৃমৃত্যুও হ্রাস করবে এবং পরবর্তী জীবনে শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমাবে। এই প্রচেষ্টায় ব্যয়িত প্রতি টাকা বিস্ময়করভাবে ২৭ টাকার কল্যাণ সাধন করে।
যদি আপনি দায়িত্বে থাকতেন এবং বাংলাদেশের জন্য সর্বোচ্চ কল্যাণ সাধন করতে চাইতেন, আপনি মূল্যবান সম্পদগুলো কোন খাতে ব্যয়ের জন্য নির্বাচন করতেন? আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন এখানে-https://copenhagen.fbapp.io/nutritionpriorities। ব্যয়িত প্রতি টাকায় বাংলাদেশের জন্য কীভাবে সর্বোচ্চ সামাজিক কল্যাণ সাধন করা যায়, সে সম্পর্কে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া যাক।
ড. বিয়র্ন লোমবোর্গ: কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট। টাইম ম্যাগাজিনের মূল্যায়নে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির একজন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0