default-image

বঞ্চিতদের দীর্ঘশ্বাস জমে জমে খুব কমই ঘূর্ণিঝড় হয়, দুঃখীদের কান্নার সুনামি শতবর্ষে দু-একবার ঘটে, ক্ষুধা কিংবা মহামারিতে মৃতদের লাশ জমিয়ে কেউ পাহাড় বানায় না বলে জানা যায় না, সেই মৃতের সৌধ পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু ও দামি মূর্তির সমান হয় কি না। তেমনি মিসরের নতুন ফারাও জেনারেল সিসির কাছে করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত মানুষের চেয়ে তিন হাজার বছর আগে মৃত ফারাওদের সম্মান অনেক অনেক বেশি।

চলতি এপ্রিল মাসের শুরুতে মিসরের স্বনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, নব্য ফারাও জেনারেল সিসি মিসরীয়দের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছেন ২২ জন ফারাও রাজা–রানির মমি। এঁদের মধ্যে ১৮ জন রাজা, ৪ জন রানি। এই রাজকীয় ভূতেরা এত দিন মিসরের লুক্সর শহরে শায়িত ছিলেন। সেখানেই তাঁদের প্রদর্শনী চলত।

কিন্তু সিসির বাসনা হয়েছে, তিনি তাঁদের রাজধানীর কাছে আনবেন। তাঁদের জন্য বানাবেন নতুন রাজকীয় জাদুঘর। ফারাওদের আমলেও মিসরীয়রা পিরামিড নির্মাণ আর রাজকীয় শ্রেণি ও পুরোহিতদের দাস হিসেবে, শ্রমিক হিসেবে ভুগেছে।

বিজ্ঞাপন

আধুনিককালেও তাদের ভাগ্যের খুব পরিবর্তন হয়েছে, তা বলা যায় না। ফারাওদের পুনর্বাসন, তাদের জন্য রাজকীয় প্রাসাদ (নতুন জাদুঘর) নির্মাণে ব্যয় হবে মোট ২ বিলিয়ন ডলার। অথচ গত বছর মিসর করোনাভাইরাসের আক্রমণে অত্যন্ত বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল।

ব্যাপারটা খুবই প্রতীকী। যে তাহরির স্কয়ারের আন্দোলনকে প্রতারণা ও দমনের মাধ্যমে নিস্তেজ করে কৌশলে সিংহাসন দখল করেছেন সিসি, সেখান থেকেই প্রাচীন মিসরীয় ফারাওদের ২২টি কফিন রাজকীয় সোনালি গাড়িতে করে বিশাল উৎসবের মাধ্যমে প্যারেড করে মাত্র ৭ কিলোমিটার দূরে নতুন জাদুঘরে নেওয়া হলো। ২১ বার তোপধ্বনি হয়েছে, দেশের বিখ্যাত শিল্পীরা গান গেয়েছেন, অভিনেতা-অভিনেত্রীরা ফারাও রাজা-রানি সেজে মহড়া দিয়েছেন, ফারাও মমিদের অভ্যর্থনা দিয়েছেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট। সোনায় মোড়ানো গাড়ি ও কফিন এভাবে মিসরীয়দের পরিহাস করেছে। এই রাজকীয় যাত্রার ব্যয় দিয়ে করোনাক্রান্ত মিসরকে স্বস্তি দেওয়া যেত।

স্বৈরশাসকেরা জমকালো জিনিস পছন্দ করেন। নিজেদের তাঁরা যত অতিকায় মনে করেন, তত বড় মূর্তি, ভাস্কর্য, প্রদর্শনী ও প্রকল্প তাঁরা হাতে নেন। বলা বাহুল্য, সবই হয় জনগণের পয়সায়। যে দেশ যত বড় ‘মহান’ নেতা পায়, সেই দেশের মানুষের তত করুণ অবস্থা হয়। ফেরাউন, হিটলার, মুসোলিনিরা গত হননি। মিসরের জেনারেল সিসির মতো মানুষের মধ্যে দিয়ে তাঁরা বেঁচে ওঠেন। স্বৈরাচার অতীতের স্বৈরাচারীদের ভাব, স্মৃতি, চলন ফিরিয়ে আনেন। জীবিতদের কাঁধে চাপান মৃতদের ভারী ভূত। তাঁরা বোঝাতে থাকেন, ইতিহাসের মহাপুরুষেরা তাঁদেরই পক্ষে।

এভাবে জীবিতদের শাসন করতে মৃতদের ভাবমূর্তির ব্যবহার চলে। এভাবে অতীতমুখী দেশ ভবিষ্যৎ দেখতে ব্যর্থ হয়।

কথায় বলে, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। সিসি ভেবেছিলেন, ফারাও উৎসব করে তিনি বিশ্বের সংস্কৃতিমনা মানুষের নজর কাড়বেন। ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর অগাধ প্রেম, তাঁর মানবিক এক ভাবমূর্তি গড়ে দেবে অনেকের মনে। কিন্তু সেই সপ্তাহেই মিসরীয় অর্থনীতির প্রধান ধমনি সুয়েজ খালে অতিকায় এক জাহাজ আটকে গেল। সুয়েজ খাল অচল হওয়ার পর জানা গেল, এত বড় জাহাজ সরানোর ক্রেন, ড্রেজার বা জাহাজ নেই। যা আছে তা বাংলাদেশের লঞ্চডুবির পর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘এমভি রুস্তম’ পদের।

মনে পড়ে এল সালভাদরের স্বৈরশাসক জেনারেলি এর্নানদেস মার্তিনেসের কথা। তিনি নিজেকে দিব্যজ্ঞানী মনে করতেন। এক নৃশংস গণহত্যায় তিনি ৩০ হাজার কৃষককে হত্যা করেন। এই প্রেসিডেন্ট তাঁর দেশে স্কার্লেট জ্বরের মহামারি ঠেকাতে রাস্তার সব বাতি লাল কাগজে মুড়ে দেন। যদিও তা কোনো কাজে আসেনি।

ভারতে দেখা যাচ্ছে, সরকার কুম্ভমেলার আয়োজনে কোনো কার্পণ্য করেনি, কিন্তু ভুলে গিয়েছিল অক্সিজেন তৈরির কথা। কুম্ভমেলার লাখ লাখ মানুষের জমায়েতে করোনা মহামারি সেখানে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠার পর মনে পড়েছে, হাসপাতালে তো অক্সিজেন নেই!

অনেকের মনে থাকবে, ২০১৭ সালে অক্সিজেন সরবরাহ না থাকায় ভারতের একটি সরকারি হাসপাতালের ৬০ শিশু দুঃখজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেছিল। তখন কোনো করোনা ছিল না।

বিজ্ঞাপন

স্বৈরশাসকদের উদ্ভট আচরণের উদাহরণে হিটলারই এগিয়ে থাকবেন। জার্মান সেনাবাহিনীর পর তিনি সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেন ‘প্রপাগান্ডা’ খাতে। নারী চলচ্চিত্রকার লেনি রাইফেনস্টাহল নির্মিত বিপুল ব্যয়ের ‘ট্রায়াম্ফ অব উইল’ বা ‘সংকল্পের বিজয়’ ছিল ব্যক্তি হিটলার ও তাঁর আর্যবন্দনায় নিবেদিত। ভারতের গুজরাটে বানানো হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভাস্কর্য। ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার। অথচ সেই গুজরাটের মানুষ করোনাক্রান্ত হয়ে অক্সিজেনের অভাবে মারা যাচ্ছেন, শ্মশানগুলো লাশ পুড়িয়েও কুলাতে পারছে না বলে খোলা জায়গায় চলছে হতভাগ্য মৃতদের সৎকার।

এসব লাশের কথা আমরা ভুলে যাব। করোনায় আক্রান্ত মানুষের কষ্ট আর দরিদ্রদের মানবেতর অভিজ্ঞতার কথাও আমরা মনে রাখব না। কেননা, গণমৃত্যু ও গণবঞ্চনা স্মরণে কোনো দুর্ভিক্ষ, মহামারি ও স্বৈরাচার জাদুঘর তৈরি হয় না। তাই জীবিতরা মনে রাখতে পারে না, কী অবহেলা ও নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছিল অতীতের মানুষেরা। বিরাট ভাষণ, বিরাট উদ্‌যাপন, আতশবাজি, ভাস্কর্য, সিনেমা, নামকরণের সামনে সাধারণ মানুষ নিজেদের এতই ছোট ও তুচ্ছ মনে করে যে, তারা মনে করে স্বৈরশাসকেরা আসলেই বোধ হয় মহান। যে শাসক নিজেকে যতটা শক্তিশালী ও মহান বলে দাবি করেন, তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতোই জনগণের জীবনকে মহামারির মুখে অরক্ষিত ও অ-সহায় বানিয়ে রাখেন।

সম্পদ ও জীবনের বিপুল অপচয় না করে কেউ ফেরাউন হতে পারে না। কিন্তু ফেরাউনদের দম্ভ সেখানেই ফুরিয়ে যায়, যেখানে তারা এক সিলিন্ডার অক্সিজেন কিংবা একটা টিকার ব্যবস্থা নাগরিকদের জন্য করতে ব্যর্থ হয়।

ফারুক ওয়াসিফ লেখক ও সাংবাদিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন