default-image

মিয়ানমারকে আবার আচ্ছন্ন করে ফেলল অন্ধকার রাজনৈতিক অতীত। স্বাধীনতার পর ৭২ বছরে দেশটির প্রায় ছয় দশক সামরিক ব্যক্তিদের শাসনেই কেটেছে। গত দশকে পরপর দুটি সফল জাতীয় নির্বাচনের পরও সেই দুর্ভাগ্যে দাঁড়ি টেনে দেওয়া গেল না। নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা কেন্দ্রে ও প্রদেশগুলোতে নতুন পার্লামেন্টে দায়িত্ব নেওয়ার আগমুহূর্তে সোমবার সেনাবাহিনী আবার ক্ষমতা দখল করে নিল সেখানে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত পাঠাতে মরিয়া বাংলাদেশের জন্য এটা উদ্বেগ মেশানো সংবাদ হিসেবেই এসেছে।

দুই সপ্তাহ ধরে রাজধানী নেপিডোতে অভ্যুত্থানের গুজব ছিল। নতুন পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন এবং নতুন সরকারের যাত্রালগ্নে সু চির সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনী ‘তাতমাদা’-এর সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের দর-কষাকষি চলছিল নানান বিষয়ে। সে জন্য অভ্যুত্থানের গুজবকে অনেকে সেনাবাহিনীর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছিল। কিন্তু উদীয়মান নির্বাচনী গণতন্ত্রকে সেনাবাহিনী এভাবে গলাটিপে হত্যা করবে, সেটা স্বাভাবিক বিবেচনায় বিশ্বাস করা কঠিন ছিল। বাস্তবতা কল্পনাকেও হার মানিয়েছে। অং সান সু চিকে আটকের পাশাপাশি শাসক দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক নেতৃত্বের প্রায় বড় অংশকে বন্দী করা হয়েছে। প্রেসিডেন্টও সশস্ত্র বাহিনীর কবজায় রয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

গণতন্ত্রের জন্য দেশটির ছাত্র-তরুণদের ছয় দশকের সংগ্রাম এভাবে আবারও ‘জিরো পয়েন্ট’-এ ফিরে গেল। মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতির এই নাটকীয়তায় বিশ্ব হতবাক হয়ে গেছে। ধরপাকড়ের যাচাই করা খবর পাওয়া যাচ্ছে না। রেঙ্গুনে ইন্টারনেট আসা-যাওয়ার মধ্যে আছে। রাজনীতিবিদ ছাড়াও পুরোনো ছাত্র আন্দোলন কর্মীদেরও অনেককে আটক করা হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। প্রধান শহরগুলোতে পুলিশি টহল ছাড়া গতকাল সোমবার মানুষ রাস্তায় বিশেষ নামেনি। অভ্যুত্থানের সমর্থনে দায়সারা ভঙ্গিতে স্লোগান দিয়ে কিছু ছোট ছোট যানবাহনকে ছুটে যেতে দেখা গেছে রেঙ্গুনে। কারা এদের নামিয়েছে, বোঝা যায়নি।

সেনাবাহিনী-সমর্থক হিসেবে পরিচিত নিউজ পোর্টালগুলো বারবার জানিয়ে যাচ্ছে, দেশে ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা হয়েছে এবং সব ক্ষমতা সশস্ত্র বাহিনী তার এখতিয়ারে নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট বন্দী হওয়ায় কে জরুরি অবস্থা জারি করল, তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে এটাও বলা হচ্ছে, বাহিনীগুলো সংবিধানের নির্দেশনা মেনে ক্ষমতা নিয়েছে! তারা একজন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টও নিয়োগ দিয়েছে। কেন অভ্যুত্থান করতে হলো, তার ব্যাখ্যা হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী ‘সর্বশেষ নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে’ বলে দাবি করছে। যদিও সেনাবাহিনী ছাড়া দেশে-বিদেশে এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বড় কোনো প্রশ্ন বা আপত্তি দেখা যায়নি এত দিন।

নির্বাচন শেষে নতুন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের আগমুহূর্তে কেন মিয়ানমারে এ রকম ঘটনা ঘটল, তার হিসাব মেলাতে চেষ্টা করছেন রাজনৈতিক ভাষ্যকারেরা। বড় কারণ হিসেবে অনুমান করা হচ্ছে সু চির সঙ্গে সিনিয়র জেনারেলের দর-কষাকষি ভেঙে যাওয়া।

মিয়ানমারে গুঞ্জন রয়েছে, ভোটের পরও সেনাবাহিনী সু চির সঙ্গে দর-কষাকষি করছিল জেনারেল মিন অংকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নেওয়ার জন্য। সু চি সেই আপসে যাননি। তারই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ অভ্যুত্থান।

সু চি এবং এনএলডি গত নির্বাচনের চেয়েও এবার বেশি জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতাসীন হতে চলেছিল। মিয়ানমারে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদগুলোতে সচরাচর ভোট হয় ১ হাজার ১৭১টি আসনে। এবার হয়েছিল ১ হাজার ১১৭ আসনে এবং তাতে সু চির দল একাই পেয়েছে ৯২০ আসন। গতবারের চেয়ে ৬৬টি বেশি।

এভাবে দেশটিতে রাজনীতিবিদদের সরকার কাজ করলে সমাজে সশস্ত্র বাহিনীর পুরোনো কর্তৃত্ব কমে আসার অবস্থা তৈরি হয়। সেটা হতে দিতে চাইছেন না জেনারেলরা। সর্বশেষ নির্বাচনে সেনাবাহিনীর সমর্থক দল ইউএসডিপি (ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি) অত্যন্ত খারাপ ফল করে। মাত্র ৭১টি আসন পায়, যা গতবারের চেয়ে ৪৬টি কম। এ ঘটনায় সেনাবাহিনী জনগণের স্বাধীন মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে। ইউএসডিপি এ রকম খারাপ ফল করবে, এটা তাতমাদা নামে পরিচিত সশস্ত্র বাহিনীর গোয়েন্দা অনুমানকে বোকা বানিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে সেনাবাহিনীর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ অনেক কমে যায়। সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং ভেবে রেখেছিলেন, ইউএসডিপি নির্বাচনে ভালো করলে সু চির সঙ্গে দর-কষাকষি করে তিনি উর্দি ছেড়ে প্রেসিডেন্ট হবেন। জনগণ ভোটের মাধ্যমে সেই ইচ্ছায় বাদ সাধে। ভোটে সশস্ত্র বাহিনীর পরিকল্পনামতো কিছুই হয়নি। এ কারণে ভোটের পর থেকে সশস্ত্র বাহিনী নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে থাকে। মিয়ানমারে গুঞ্জন রয়েছে, ভোটের পরও সেনাবাহিনী সু চির সঙ্গে দর-কষাকষি করছিল জেনারেল মিন অংকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নেওয়ার জন্য। সু চি সেই আপসে যাননি। তারই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ অভ্যুত্থান।

তাতমাদাতে এমন শঙ্কাও ছিল, জেনারেল মিন অং হ্লাইং অবসরে গেলে তিনি ও অন্য জেনারেলদের রোহিঙ্গা গণহত্যার দায়ে চলমান আন্তর্জাতিক বিচারে সু চি আর সুরক্ষা না-ও দিতে পারেন। আগামী বছরই জেনারেল মিন অংয়ের অবসরে যাওয়ার কথা ছিল। এ শঙ্কা অভ্যুত্থানের পেছনে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে থাকতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সু চির সামনে এ পরিস্থিতি চরম চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তাতমাদার বিরুদ্ধে ১৯৮৮ থেকে দুই দশক রক্তক্ষয়ী জন-আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি দেশটিতে নির্বাচনী গণতন্ত্রের সূচনা ঘটিয়েছেন। ৭৫ বছর বয়সে এসে আবার তাঁর সামনে একই করণীয় এসে হাজির। কিন্তু আগের মতো তাঁর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সমাজের সম্পর্কও ভালো নেই আর। রোহিঙ্গা নিপীড়ন রুখতে ব্যর্থতায় বৈশ্বিকভাবে তিনি হতাশ করেছেন সবাইকে। সু চিকে তাই নতুন করে জনগণকে গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামে আহ্বান করা ছাড়া উপায় নেই। পাশাপাশি অতীত ভুলগুলোর ব্যাখ্যা দিয়ে আন্তর্জাতিক সমাজের কাছেও তাঁকে সহায়তার আহ্বান জানাতে হবে নতুন করে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রাথমিকভাবে গতকাল যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সেটা সু চির জন্য আশাপ্রদই। তবে মিয়ানমারে নাটকীয় কিছু ঘটলে সবাই চীনের মতামত জানতে উদ্‌গ্রীব থাকে। সর্বশেষ অভ্যুত্থান নিয়ে চীনের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। চীনের সরকার সমর্থক গ্লোবাল টাইমস-এ অভ্যুত্থানের খবরে অভ্যুত্থানকারীদের বক্তব্যও ছাপা হয়েছে। তবে তাতমাদার চলতি দুঃসাহসী এবং কারও কারও বিবেচনায় আত্মঘাতী অধ্যায়ের পেছনে চীনের ইন্ধন রয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন।

মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক শাসনের শিকড় বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রভাব বাড়তে পারে বলে চীনের বিশেষ ভীতি ছিল। চীনের কাছে মিয়ানমারের ভূকৌশলগত গুরুত্ব উত্তর কোরিয়ার মতো। সীমান্ত লাগোয়া এই দেশগুলোতে চীন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রভাবই দেখতে চায় না। এসব বিবেচনায় ধারণা করা যায়, জনগণের মতামতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চলতি আয়োজনে নীরবে তাতমাদার পাশেই আছে তাদের পুরোনো বন্ধু চীন।

বলা বাহুল্য, বিশ্ববাসীর মতো বাংলাদেশও মিয়ানমারের ঘটনাবলি নিবিড়ভাবে দেখছে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার আলোচনা এখন কোন দিকে মোড় নেয়, সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে সবাইকে। এমনও অনুমান তৈরি হয়েছে, তাতমাদৌ রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে অভ্যুত্থানবিরোধী বিশ্বমতকে আমূল বদলে দিতে পারে। এ রকম ঘটলে সেটা সু চির জন্য খারাপ হলেও বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির হতে পারে। কিন্তু এ রকম অনুমানের সময় ভুলে যাওয়া উচিত হবে না রোহিঙ্গাবিরোধী ঘৃণার চাষবাস করেই মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী বামারদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ঘৃণার সেই বিষবৃক্ষের শিকড়েই তারও প্রাণশক্তি বাঁধা।

আলতাফ পারভেজ: দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন