default-image

আমাদের সরকারি গুদামে চাল মজুতের পরিমাণ আড়াই লাখ টনে নেমে এসেছিল। খাদ্যনিরাপত্তার জন্য সরকারি মজুত কমপক্ষে ১০ লাখ টন থাকা প্রয়োজন বলে মনে করা হয়। বোরো এবং আমন, বিগত এ দুই মৌসুমে সরকার চেষ্টা করেও প্রয়োজনীয় পরিমাণ ধান সংগ্রহ করতে পারেনি। কৃষক সংগ্রহকেন্দ্রে সরাসরি ধান নিয়ে গেলে নানা অজুহাতে হয়রানির সম্মুখীন হন। আবার বাজারমূল্য আর সরকারি দামের ফারাক এমন নয় যে স্থানীয় পাতিনেতারা এ ব্যাপারে আগ্রহী হবেন। চাল সংগ্রহের ব্যাপারে চালকলের মালিকদের সঙ্গে দরাদরিতেও সুবিধা হচ্ছে না। অবশেষে সরকার মজুত সৃষ্টির জন্য সরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্যবসায়ীদেরও চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং চালের ওপর শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে।

বিগত বর্ষাকালে বন্যায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে বেশ। বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (ব্রি) হিসাবে, আমন ধানের প্রায় শতকরা ১০ ভাগ নষ্ট হয়ে গেছে। তবে ব্রির মতে, এরপরও দেশে প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট চাল উৎপন্ন হয়েছে এবং আগামী জুন পর্যন্ত দেশের চাহিদা মেটানোর পরও চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। ফসল কাটার এ মৌসুমে চাল আমদানির ফলে দাম কমে গিয়ে কৃষকেরা ক্ষতির সম্মুখীন হবেন, এমন আশঙ্কাও ব্যক্ত করেছে ব্রি। খাদ্যনিরাপত্তার জন্য সরকার গমও আমদানি করতে পারত। বিশ্ববাজারে গমের সরবরাহ ভালো। দামও অনেক কম।

বিজ্ঞাপন

১৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত চীন–বাংলাদেশ–মিয়ানমার ত্রিপক্ষীয় সভায় রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ নিয়ে ২৬ জানুয়ারি প্রথম আলোতে আমার একটা লেখা বেরিয়েছিল। লেখাটি পড়ে মানবাধিকারকর্মী মং জার্নি একটা টুইট করেছেন, অনুবাদ করলে যা এমন দাঁড়ায়, ‘একটু ধীরে জনাব! আমরা এখন বার্মা থেকে দেড় লাখ টন চাল কেনা নিয়ে ব্যস্ত। আর বর্মিরাও প্রত্যাবাসনের চেয়ে রাশিয়ানদের কাছ থেকে ড্রোন কেনার ওপরই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।’

সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থার অদক্ষতার কারণে দেশে চাল থাকা সত্ত্বেও সরকার আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে, মানলাম। কিন্তু মিয়ানমার থেকেই কেন সেটা করতে হবে? চাল আমদানির তো আরও অনেক উৎস আছে। যেটুকু চাল আমাদের আমদানি করা প্রয়োজন, তা ভারত ও ভিয়েতনাম থেকেই আনা যেত। মিয়ানমার কি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সেধেছে আমাদের? যত দূর জানি তা নয়। তাহলে এত কেন গরজ আমাদের? চাল কেনা অবশ্যই খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ, কিন্তু যেখানে দেশটির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের এরূপ জটিল একটি পর্যায় চলছে, সেখানে উচিত ছিল সর্বাগ্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামত নেওয়া। পৃথিবীর সব দেশেই এটা প্রচলিত প্রথা। মতামত চাওয়াতে কারও সম্মানহানি হয় না।

এবার ড্রোন প্রসঙ্গ। সম্প্রতি মিয়ানমার রাশিয়ার তৈরি অরলভ ১০-ই সামরিক ড্রোন কেনার অর্ডার দিয়েছে, সেই সঙ্গে পান্টশির এস-১ বিমান বিধ্বংসী সিস্টেম। মিয়ানমার বিমানবাহিনীতে চীন ও পাকিস্তানের তৈরি জেএফ ১৭ আধুনিক জঙ্গি বিমান আছে এবং এরই মধ্যে ক্রয়াদেশ দেওয়া এসইউ ৩০ বিমান রাশিয়ায় তৈরি হচ্ছে। এ বিমানগুলোর কর্মক্ষমতা কমবেশি মার্কিন এফ–১৬ বিমানের সঙ্গে তুলনীয়। ৩১টি মিগ-২৯ ও আছে তাদের। সর্বশেষ মিয়ানমার পঞ্চম প্রজন্মের সর্বাধুনিক এসইউ–৫৭ দূরপাল্লার এয়ার সুপিরিয়রিটি বিমানের জন্য ক্রয়াদেশ দিচ্ছে। বিগত শতাব্দীতে মিয়ানমার বিমানবাহিনীর মূল ভূমিকা ছিল বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধরত মিয়ানমার স্থলবাহিনীকে গ্রাউন্ড সাপোর্ট দেওয়া। একবিংশ শতকে তাদের দর্শনে আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। প্রতিবেশী চীন বা থাইল্যান্ডের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বপূর্ণ। মিয়ানমার বিমানবাহিনীর বিপুল শক্তি বৃদ্ধি তাহলে কোন সম্ভাব্য শত্রুকে সামনে রেখে? চালের মূল্য পরিশোধে যে অর্থ যাবে, পরোক্ষভাবে তা কি এই রণপ্রস্তুতিতে সহায়তা করছে না?

মিয়ানমারের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাবে না বাংলাদেশ। তবে সামরিক প্রস্তুতি শুধু যুদ্ধ করার জন্য নয়, যুদ্ধ ঠেকানোর জন্যও অপরিহার্য। মিয়ানমারের আকাশযান একাধিকবার বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। এ উসকানিতে বাংলাদেশ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। মানচিত্র নিয়েও মিয়ানমার উসকানিমূলক আচরণ করেছে। দীর্ঘ মেয়াদে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, তা তো আমরা জানি না। আর সে জন্য প্রস্তুতি নেওয়া দরকার এখন থেকেই।

আমাদের সামরিক সরঞ্জামের প্রায় একক সরবরাহকারীর ভূমিকায় রয়েছে চীন। এমনিতেই একক উৎসের ওপর অতি নির্ভরশীলতা বিপজ্জনক। তার মধ্যে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা গেছে যে দেশটি স্পষ্টতই বাংলাদেশের তুলনায় মিয়ানমারের বড় বন্ধু। বিরাজমান পরিপ্রেক্ষিতে তাই উৎসের বহুমুখীকরণ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে এসব সরঞ্জাম উৎপাদনে নিজেদের সক্ষমতাও বাড়ানো দরকার। ড্রোন প্রযুক্তিতে তুরস্ক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। সম্প্রতি সমাপ্ত আজারবাইজান আর্মেনিয়া সংঘাতে আজারবাইজানের জয়ে তুর্কি ড্রোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতেও তুরস্ক অনেক এগিয়ে। তুরস্ক এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অংশগ্রহণে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানা যায়। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে।

অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অপ্রত্যাশিত হলেও যদি কখনো সংঘাত হয় মিয়ানমারের সঙ্গে, সে সংঘাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে বিমানবাহিনীর। মিয়ানমার এ ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে গেছে। আমাদের বিমানবাহিনীর সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির তাই কোনো বিকল্প নেই, আর এ জন্য ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া দরকার জরুরি ভিত্তিতে। এ ক্ষেত্রে উৎস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে ইউরোপের নির্মাতারা। আমরা যদি দৃঢ় কোনো পদক্ষেপ না নিই, তাহলে বৈশ্বিক বিচারে এক ক্ষুদ্র শক্তি মিয়ানমারের উসকানিমূলক আচরণ এবং দেশটির গণহত্যাকারী সেনানায়কদের অপমানসূচক বাক্যাবলি মেনে নিতে হবে অধোবদনে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্‌যাপনকারী বাংলাদেশের জন্য তা হবে একান্তই হতাশার।

বিজ্ঞাপন

২৫ জানুয়ারি জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ ছিল মিয়ানমার নিয়ে। সেখানে চীন ও ভারত তাদের প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করেছে। উভয় দেশই মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে মিয়ানমারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে! যুক্তরাষ্ট্র আহ্বান জানিয়েছে রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য অবসানের, সেই সঙ্গে ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধনেরও। পক্ষান্তরে, যুক্তরাজ্যের ভূমিকা ছিল বিভ্রান্তিকর। রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার হরণকে পীড়াদায়ক উল্লেখ করে একই সঙ্গে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে গণতন্ত্রের পথে মাইলফলক হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাজ্য।

২০১৫ সালের নির্বাচনের মতোই ২০২০–এর নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে অং সান সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)। পূর্ববর্তী নির্বাচন যেমন মিয়ানমারের প্রকৃত ক্ষমতাকাঠামোয় কোনো অর্থবহ পরিবর্তন আনতে পারেনি, এবারের নির্বাচনও পারবে না। যে সংসদের এক–চতুর্থাংশ আসন সেনাবাহীনির উর্দি পরা সদস্যরা অলংকৃত করেন এবং যেকোনো পরিবর্তনে যেখানে সেনাবাহিনীর ভেটো ক্ষমতা রয়েছে, সেই সংসদের নির্বাচনকে ‘গণতন্ত্রের পথে মাইলফলক’ বলে আখ্যায়িত করা ভ্রান্তিবিলাস মাত্র। যুক্তরাজ্যের এ ভ্রান্তি নিরসনে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, আমাদের পররাষ্ট্র দপ্তর তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে পারে।

মো. তৌহিদ হোসেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন