default-image

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল নিয়ে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার জাতিগুলোর সহযোগিতা সংস্থা আসিয়ান মুখ খুলেছে; যদিও অনেকে আসিয়ানের কাছে এ বিষয়ে যত জোরালো বক্তব্য আশা করেছিল, ততটা জোরালো বক্তব্য তাদের পক্ষ থেকে আসেনি। তবে আসিয়ানভুক্ত আশাবাদী পক্ষগুলো বিশ্বাস করে, নেপিডোর জান্তা সরকারকে আসিয়ান শান্তিপূর্ণ সমাধানে উদ্যোগী হতে যে বার্তা দিয়েছে, তা তারা পরিষ্কারভাবে পেয়ে গেছে।

তবে বাস্তবতা হলো মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী এখনো যেভাবে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন জারি রেখেছে, তা আশাবাদীদের পক্ষে আশাবাদ ধরে রাখা কঠিন করে তুলেছে।

এত কিছুর পরও থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেভাবে শান্তি উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে মিয়ানমার সর্বাত্মক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির খাদের কিনারা থেকে ফিরে আসতে পারবে—এমন আশা করাটা অমূলক নয়।

বিজ্ঞাপন

আসিয়ানের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতি ও আসিয়ানভুক্ত কয়েকটি দেশের নেতাদের আলাদা বক্তব্য থেকে মিয়ানমারের জান্তা নিয়োজিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী উন্না মং লুইনের বুঝতে মোটেও কষ্ট হওয়ার কথা নয় আঞ্চলিক সংস্থা ও বাকি বিশ্ব চলমান সংঘাত-সংঘর্ষের অবসান ও রাজবন্দীদের মুক্তি চায়। ২ মার্চ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক শেষে সংস্থাটির চেয়ারম্যান যে বিবৃতি দিয়েছেন, সেখানে তিনি সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজায় মিয়ানমারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

কিন্তু মিয়ানমার কীভাবে এ বিবৃতির জবাব দেবে, তা কি আসিয়ান শুধু বসে বসে দেখে যাবে? নিশ্চয়ই নয়, অন্তত থাইল্যান্ড যতক্ষণ এ বিষয়ে চেষ্টা–তদবির করছে ততক্ষণ, সেটি হবে না। মিয়ানমারের ঘটনাপ্রবাহের ওপর থাইল্যান্ডের ভালো–মন্দ অনেকখানি নির্ভর করছে। মিয়ানমারের পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে থাইল্যান্ডই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

মিয়ানমারের সঙ্গে থাইল্যান্ডের ২ হাজার ৪০০ কিলোমিটারের স্থলসীমান্ত। এ সীমান্তঘেঁষা এলাকায় মিয়ানমারের ভূখণ্ডে কয়েক ডজন সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আদিবাসী গ্রুপ আছে। মিয়ানমারে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হলে এ গ্রুপগুলো সক্রিয় হয়ে উঠবে, যা থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকাকেও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ফেলে দিতে পারে। তা ছাড়া মিয়ানমারের সেনারা যদি সর্বাত্মক দমনাভিযানে নামে, তাহলে এ সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারের লোকজন দল বেঁধে শরণার্থী হয়ে থাইল্যান্ডে ঢুকতে শুরু করবে।

থাইল্যান্ডের বাইরে আসিয়ানভুক্ত যে দেশটিকে মিয়ানমার ইস্যুতে সরব হতে দেখা যাচ্ছে, সেটি হলো ইন্দোনেশিয়া। এই দেশও মিয়ানমারের সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে মধ্যস্থতা করার বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসাদি ব্যাংককে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উয়ানা মং লুইন এবং থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডন প্রামুদিনাইয়ের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত ত্রিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন। অবশ্য সে বৈঠকে আশাবহ কোনো ফল হয়নি। রেতনো মারসাদি মিয়ানমারে সফর করার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। কিন্তু মিয়ানমার সরকার তাঁর সফরের প্রস্তাবে রাজি হয়নি।

অন্যদিকে, আসিয়ানের অন্য দুই সদস্যদেশ সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার নেতারা মিয়ানমারের জান্তা সরকারের দমন–পীড়নের কঠোর সমালোচনা করেছেন।

তবে তুলনামূলকভাবে থাইল্যান্ড তার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের বিষয়ে কথা বলছে। গত সপ্তাহে জান্তা বাহিনী অনেক বিক্ষোভকারীকে গুলি করে হত্যার পর থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডন বলেছেন, তাঁরা এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা চান এবং এ ক্ষেত্রে আসিয়ান সদস্য হিসেবে তাঁরা মিয়ানমারের জনগণের স্বার্থে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে চান। সে ক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের কমান্ডার ইন চিফ মিন অং হ্লাইং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী প্রাউত চান-ওচার কাছে একটি চিঠি লিখে মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার বিষয়ে তাঁর কাছে করণীয় ও পরামর্শ চেয়েছেন। এটি প্রমাণ করে, থাইল্যান্ডের প্রতি মিয়ানমার সরকারের সেই আস্থার জায়গাটি আছে।

বিজ্ঞাপন

দুই দেশের নেতারাই মনে করেন, এই পারস্পরিক আস্থার জায়গাটি রাতারাতি তৈরি হয়নি। ব্যাংককের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংককে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর যখন কথা হয়, তখন থাইল্যান্ডের পক্ষ থেকে মিয়ানমারকে বিক্ষোভের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার পরিণতি সম্পর্কে হুঁশিয়ার করা হয়। সেখানে বলা হয়, এ আন্দোলন যদি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে গোটা অঞ্চলে ব্যাপক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়বে।

এ কারণে থাইল্যান্ডসহ আসিয়ানভুক্ত বেশির ভাগ দেশ চায় সেনাবাহিনী অং সান সু চির দল এনএলডির নেতাদের সঙ্গে আপস বৈঠকে বসুক। সেখানে আসিয়ান নেতারা মধ্যস্থতাও করতে পারেন। তবে এখন পর্যন্ত জান্তা সরকারের তরফে এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া আসেনি।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, সেনাবাহিনী যদি গোঁ ধরে বসে থাকে এবং দমনাভিযান চালিয়ে যায়, তাহলে সমাধানের পথ সংকীর্ণ হয়েই থাকবে। তবে এ ক্ষেত্রে চীন যদি এগিয়ে না আসে, তাহলে সংকটের সমাধান খুবই দুরূহ হয়ে পড়বে। আর চীনকে এ বিষয়ে আন্তরিক ভূমিকা পালন করতে রাজি করানোর দায় আসিয়ানের।

দ্য ইরাবতী পত্রিকা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

থেপচাই ইয়ং থাইল্যান্ডের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন