মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার

বিজ্ঞাপন
default-image

ব্যাংকঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ ও আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশ নির্ধারণের জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। এক বছরের বেশি সময় ধরে এ নিয়ে নানা কথাবার্তা ও নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে এক সার্কুলারে ক্রেডিট কার্ড বাদে অন্য সব খাতে অশ্রেণিকৃত ঋণ বা বিনিয়োগের ওপর সুদ বা মুনাফার হার সর্বোচ্চ ৯ দশমিক শূন্য শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে (তবে রপ্তানি ঋণের সুদহার ৭ দশমিক শূন্য শতাংশ অপরিবর্তিত রয়েছে)। এ বছর ১ এপ্রিল থেকে ব্যাংকের কোনো ঋণে ৯ শতাংশের বেশি হারে সুদারোপ না করার জন্যও ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এই নির্দেশনা জারির আগে আরেকটি ঘটনা ঘটেছে। ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের সাধারণ ও স্থায়ী আমানতের মুনাফা বা সুদের হার এক ধাক্কায় প্রায় অর্ধেক করে ফেলা হয়েছে। সাধারণ আমানতের ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ বার্ষিক সুদহার ৫ দশমিক শূন্য শতাংশ; এবং তিন বছর মেয়াদি স্থায়ী আমানতের মেয়াদপূর্তিতে গ্রাহককে প্রদেয় মুনাফার হার ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ থেকে ৬ দশমিক শূন্য শতাংশে নামানো হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ব্যাংকগুলোকে এই বার্তা দেওয়া হয়েছে যে সরকার আমানতের সুদহার সর্বোচ্চ ৬ দশমিক শূন্য শতাংশ রাখতে চায়। মূল যুক্তি হলো, কম সুদে আমানত সংগ্রহ করা না গেলে কম সুদে ঋণ দেওয়া যাবে না। সে কারণেই সুদের হার এভাবে বদলানোর প্রয়াস।

কিন্তু বাজারে বিদ্যমান চার ধরনের সঞ্চয়পত্রের (বাংলাদেশ, পরিবার, ত্রৈমাসিক মুনাফাভিত্তিক ও পেনশনার) উচ্চ মুনাফার হার (৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ) অপরিবর্তিত রেখে শুধু ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকে মুনাফার হার কমিয়ে আনার মধ্য দিয়ে বাজারে একধরনের ভুল বার্তা দেওয়া হয়েছে। আবার এক ধাক্কায় মুনাফার হার প্রায় অর্ধেক করে ফেলায় সমালোচনা-অসন্তোষের মুখে অল্প কয়েক দিন আগে অর্থমন্ত্রী বলেছেন যে দ্রুত ডাকঘর আমানতের মুনাফার হার আগের পর্যায়ে আনা হবে। এতে বিভ্রান্তি আরও বাড়ছে।

এটা ঠিক যে ঋণের সুদহার কমাতে হলে আমানতের সুদহার কমাতে হবে। কেননা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করার মাধ্যমেই সিংহভাগ তহবিল সংগ্রহ করে, যা থেকে ঋণ দেওয়া হয়। আমানতের জন্য আমানতকারীকে সুদ বা মুনাফা দেয়, ঋণের জন্য ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে সুদ নেয়। তবে আমানতের সুদের হার যদি ৬ দশমিক শূন্য শতাংশে স্থির করা হয় বা এটি সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া হয়, তাহলে তা কতটা সুফল দীর্ঘ মেয়াদে বয়ে আনবে, সেটা ভাবাও প্রয়োজন।

ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের ক্ষেত্রে যা করা হয়েছে, তাতে আমানতকারীরা আমানতের বিপরীতে বছর শেষে প্রকৃতপক্ষে কিছুই পাবেন না বলা চলে। এখানে মূল্যস্ফীতির হার বিবেচনায় নিতে হবে। জানুয়ারি মাসে গড় বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ। একই সময়ে ডাকঘরের তিন বছর মেয়াদি স্থায়ী আমানতের প্রথম বছর শেষে মুনাফার হার ছিল ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ। তার মানে জানুয়ারি মাসে এই আমানতের বিপরীতে আমানতকারীর প্রকৃত আয় ছিল ৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। অন্যভাবে বললে ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে বাজারমূল্যে ১১০ টাকা ৪০ পয়সা পাওয়া গেলেও বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রকৃত অর্থে ওই আমানতকারী বাজার খরচ বাদে হাতে পান ১০৪ টাকা ৮০ পয়সা।

এখন ফেব্রুয়ারি মাসেও গড় বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ। আর একই আমানতের নতুন মুনাফার হার ৫ শতাংশ হওয়ায় আমানতকারীর প্রকৃত আয় কমে গেল। মানে এক বছর ১০০ টাকা জমানোর পর মুনাফা হিসেবে ৫ টাকা হাতে পেলেন (আসলসহ মোট পেলেন ১০৫ টাকা), যখন বাজার খরচ বেড়েছে ৫ টাকা ৬০ পয়সা। মানে তিনি এই ১০০ টাকা জমানোর পর যা পেলেন, তাতে তাঁর প্রকৃত আয় কমে গেল। মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম হারে আমানতের সুদ বা মুনাফা নির্ধারণ করা আর আমানতকারীদের ওপর আয়ের তুলনায় বাড়তি করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া সমান বলা যেতে পারে।

সরকার আমানতকারীদের মূল্যস্ফীতির হারের সমান বা তার কম সুদ দিতে চাইছে বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা-জোগানের প্রক্রিয়াকে এড়িয়ে। অথচ বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের জন্য নিজে যখন ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিচ্ছে, তখন কিন্তু আর্থিক বাজারের নিয়মেই তা নিচ্ছে। তাই ৩৬৪ দিন বা এক বছর মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ডিসেম্বরে ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ, যা জানুয়ারিতে সামান্য কমে হয় ৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ। নভেম্বর মাসে এটি ছিল ৭ দশমিক ৫১ শতাংশ। আবার ফেব্রুয়ারিতে তা আরেকটু কমে হয়েছে ৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে, এক বছর মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ঋণ নিতে গিয়ে যখন ঋণের চাহিদা বেশি হচ্ছে, তখন এই বিলের সুদহার বাড়ছে। আবার চাহিদা কমলে কমছে। বিভিন্ন মেয়াদি অন্যান্য ট্রেজারি বন্ডের ক্ষেত্রেও এই প্রবণতা দেখা যায়। তার মানে সরকার নিজেই বাজারের স্বাভাবিক নিয়মে আর্থিক বাজার থেকে ঋণ গ্রহণ করছে। আর বাকি সবার জন্য ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশে বেঁধে দিতে চাইছে। পাশাপাশি এক বছর মেয়াদি ঋণ নিতে সরকার যে হারে সুদ গুনছে, ডাকঘর আমানতের একই মেয়াদের সুদের হার সে হারের অনেক নিচে নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ সরকারি বিল-বন্ডের আয় বা সুদের হারকে সাধারণভাবে বাজারে সুদের হারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড ধরা হয়। এই মানদণ্ড বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ ও আমানতের সুদহার ওঠানামা করে।

এভাবে একাধারে মূল্যস্ফীতির হার ও ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহারকে উপেক্ষা করে সাধারণ আমানতকারীদের জন্য নিম্নহারের সুদ বা মুনাফার হার নির্ধারণের প্রচেষ্টা আর্থিক বাজারে বিশৃঙ্খলা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

আসজাদুল কিবরিয়া: লেখক ও সাংবাদিক
asjadulk@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন