মৃত্যুঝুঁকি তাঁদের নিতেই হয় প্রতিনিয়ত

ঝালকাঠি বাসস্ট্যান্ড। নেমেই রিকশা নিলাম। গন্তব্য জানা নেই। তাই ঘুরে বেড়ালাম উদ্দেশ্যহীন। স্টেশন রোড, হোগলাপট্টি, সদর চৌমাথা থেকে কামারপট্টি—ঘুরতে ঘুরতে পুরোনো কলেজ রোড ধরে একসময় পৌঁছলাম ঝালকাঠি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের কাছে। এ পর্যন্ত আসতে না-আসতেই একঝলক শীতল বাতাস স্পর্শ করল নাসিকার অগ্রভাগ। কোনো জলাশয় কি আছে কাছেই? রিকশাচালক মোমেন আলী কোনো উত্তর না দিয়ে একটি বিশাল নদীর সামনে নিয়ে গেলেন আমাদের। নদীর নাম সুগন্ধা। নয়নাভিরাম এই নদীটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু চমকপ্রদ তথ্য। পৌরাণিক মতে, স্বামী-নিন্দা সইতে না পেরে পিতৃগৃহে দেহত্যাগ করেন শিবপত্নী সতী। এ ঘটনায় শিব শোকাহত, ক্ষুব্ধ ও রোষানলে দগ্ধ হন। অতঃপর সতীর শবদেহ কাঁধে নিয়ে পৃথিবী ধ্বংসের তাণ্ডব নৃত্যে মেতে ওঠেন তিনি। দেবতারা তাই প্রমাদ গোনেন। অতি দ্রুত পালনকর্তা বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন তাঁরা। বিষ্ণু দেবতাদের আশ্বস্ত করেন। তিনি তাঁর সুদর্শন চক্রের সাহায্যে শিবের কাঁধে থাকা সতীর শবদেহ ৫১ খণ্ডে বিচ্ছিন্ন করেন। সেগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, সতীর নাসিকাটি পতিত হয় বরিশালের শিকারপুরে, একটি আঙুল পতিত হয় ঝালকাঠির পোনাবালিয়ায়। সেকালে শিকারপুর এবং পোনাবালিয়ার মধ্যবর্তী স্থানেই ছিল সুগন্ধা নদী। লোকশ্রুতি, সতীর নাসিকাজাত সুগন্ধ থেকেই এই নদীর নাম হয় সুগন্ধা।স্রোতস্বিনী সুগন্ধা নদীর তীরঘেঁষে একটি জরাজীর্ণ দ্বিতল ভবনের ভগ্নাবশেষ। রিকশা থেকে নেমে দূর থেকে ভবনটিকে দেখি আমরা। দেখতে দেখতে অতি প্রাচীন এই ভবন সম্পর্কে কৌতূহল জাগে আমাদের। সুগন্ধার জলে স্নানে উদ্যত আবুল হোসেনের কাছে জানতে চাই ভবনটির পরিচয়। পুলিশলাইনে কর্মরত আবুল হোসেন আমাদের বলেন, ‘ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী ঘোষাল জমিদারদের কাচারিবাড়ি এটি।’ আধুনিক ঝালকাঠির প্রতিষ্ঠাতা ঘোষাল পরিবার ঝালকাঠির এই জমিদারি লাভ করে রায়েরকাঠি রাজপরিবারের নবম পুরুষ শিবনারায়ণ রায়ের সময়।উইলিয়াম হান্টারের মতে, একসময় ঝালকাঠি ও তার আশপাশের বিস্তীর্ণ জনবিরল অঞ্চল সেলিমাবাদ পরগনার অন্তর্ভুক্ত ছিল। মোগল সম্রাট সেলিম জাহাঙ্গীরের নামানুসারে দক্ষিণ বাংলার এই পরগনার নামকরণ। সম্রাট শাহজাহানের সময় রায়েরকাঠি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা মদনমোহন রায়ের পুত্র শ্রীনাথ রায় এই পরগনার পাট্টা লাভ করেন। শ্রীনাথ রায়ের পুত্র রুদ্রনারায়ণ রায় শক্তিমান জমিদার ছিলেন। রুদ্রনারায়ণের প্রপৌত্র জয়নারায়ণ রায়ের সময় আগাবাকের নামের একজন সাহসী পাঠান সেলিমাবাদ দখলের চেষ্টা করেন। সেই সূত্রে ভীষণ যুদ্ধ হয় সুতালরী ও বারৈকরণে। ঢাকার দেওয়ান রাজবল্লভের আশীর্বাদপুষ্ট জমিদার জয়নারায়ণ সেই যুদ্ধে প্রথমবার জয়লাভ করলেও দ্বিতীয় দফার যুদ্ধে মুর্শিদাবাদের ভাবী নবাব সিরাজউদ্দৌল্লার কৃপাধন্য আগাবাকের ১৬৪৮ খ্রিষ্টাব্দে জয়নারায়ণকে পরাজিত করেন। ১৭৫৩ খ্রিষ্টাব্দে আগাবাকের নিহত হলে দেওয়ান রাজবল্লভ সেলিমাবাদ দখল করেন। পরে জয়নারায়ণের পুত্র শিবনারায়ণ চট্টগ্রামের দেওয়ান গোকুলচন্দ্র ঘোষালের সহায়তায় ঢাকার দেওয়ানের দখল থেকে সম্পত্তির প্রায় বেশির ভাগই উদ্ধার করেন। সম্পত্তি পুনরুদ্ধারে সন্তুষ্ট হয়ে শিবনারায়ণ রায় উদ্ধারকৃত জমিদারির পাঁচ আনা ১৫ গণ্ডা অংশ গোকুলচন্দ্র ঘোষালকে প্রদান করলে সেলিমাবাদে ঘোষাল জমিদারদের রাজত্ব শুরু হয়। ঘোষাল পরিবার কলকাতার ভূকৈলাশে বাস করত। জমিদারি রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধার্থে তারা ঝালকাঠিতে একটি কাচারিবাড়ি নির্মাণ করে। এই পরিবারের চতুর্থ পুরুষ সত্যশরণ ঘোষাল ঝালকাঠিতে তিনটি সুরম্য দালান, রাস্তা ও বেশ কয়েকটি সেতু নির্মাণের পাশাপাশি কাচারিবাড়িটিকে অনিন্দ্যসুন্দর করে গড়ে তোলেন।সে যা-ই হোক, ঘোষাল জমিদারদের কাচারিবাড়িটির প্রায় শতভাগই আজ সুগন্ধার গর্ভে বিলীন। নদীতীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমরা প্রবেশ করি সেই বাড়িটির অভ্যন্তরে। বাড়িটির প্রতিটি দেয়ালেই ফাটল, অন্দরে খসে পড়া ইটের স্তূপ দৃশ্যমান। জায়গায় জায়গায় ভেঙে কাত হয়ে আছে ছাদ। গোলাকৃতি প্যাঁচানো অন্ধকার একটা সিঁড়ি ভেতরে। ‘ছাদের যে কিয়দংশ দণ্ডায়মান এখনো, ইচ্ছে করলে সে অংশে ওঠা যায় এই সিঁড়ি বেয়ে।’ বললেন এই পরিত্যক্ত বাড়িতে সপরিবারে বসবাসরত রবিন মণ্ডল নামের এক সহজ-সরল যুবক। বরিশাল অমৃতলাল দে কলেজে মানবিক বিভাগ দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত এই যুবকের সহায়তায় অন্ধকার হাতড়ে ছাদে উঠে আসি আমরা। দাঁড়াই ভয়ে ভয়ে। ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ শ্যাওলাপড়া ভাঙা ছাদ থেকে কাছের সুগন্ধা নদীকে করালগ্রাসী, ভয়ংকর মনে হয়। এই ভয়ংকর সুন্দরকে পেছনে রেখে রবিন মণ্ডলের মুখোমুখি হই আমরা। জানতে চাই এই মৃত্যু-উপত্যকায় তাঁদের বসবাসের কারণ। বিপন্ন দৃষ্টিতে রবিন তাকান আমাদের দিকে। তারপর লজ্জিত ভঙ্গিতে বলেন, তাঁরা ছাড়া আরও ১১টি পরিবারের প্রায় ৬০ জন সদস্য মৃত্যুভয় আলিঙ্গন করে এই কাচারিবাড়িতেই বসবাস করেন। তাঁরা সবাই জানেন, যেকোনো সময় তলিয়ে যেতে পারে এই ভবন, ভবনের সঙ্গে সঙ্গে তলিয়ে যেতে পারেন তাঁরাও সুগন্ধার অতল জলে। কিন্তু এ ছাড়া যে কোনো বিকল্পও নেই তাঁদের। ভীষণ দরিদ্র তাঁরা। তাই মৃত্যুঝুঁকি তাঁদের নিতেই হয় প্রতিনিয়ত!