default-image

সংকট সব সময় সম্ভাবনার জন্ম দেয় এটা যেমন সত্য, তেমনই সত্য, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ কখনো হাতছাড়া করেন না। সবার আগে প্রতিবেশীদের করোনার টিকা পাঠানোর সিদ্ধান্ত সেই সুযোগ সদ্ব্যবহারের সর্বশেষ উদাহরণ।

বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, মিয়ানমার ও সেশেলস-এ ভারতে প্রস্তুত উপহারের টিকা পৌঁছে গেছে। আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মরিশাসে উপঢৌকন পৌঁছানো সময়ের অপেক্ষামাত্র। পাকিস্তান চাইলে তাকেও টিকা দিতে ভারত রাজি; কারণ, ‘অতিমারির মোকাবিলায় মানবিক ভারত বন্ধু-শত্রু বিবেচনা করতে চায় না।’ যদিও পদ্ধতিগত প্রশ্ন রয়েছে। সরাসরি না হলেও তৃতীয় দেশ মারফত তা পৌঁছাতে পারে।

বিজ্ঞাপন

এটা সত্য, ভারতে সংক্রমণের প্রথম ধাক্কার সময় সরকার বিশেষ গা করেনি। শাসক দল ও সরকার তখন ‘নমস্তে ট্রাম্প’ ও মধ্যপ্রদেশকে কংগ্রেসমুক্ত করায় আচ্ছন্ন। গুজরাট সফরে ট্রাম্পকে আবিষ্ট করা ও কংগ্রেস ভাঙিয়ে মধ্যপ্রদেশ পুনর্দখলের ভাবনায় মোদি তখন বুঁদ। ট্রাম্প থাকাকালীন শাহিনবাগ আন্দোলন ঘিরে শুরু হয় দিল্লি দাঙ্গা। চার-পাঁচ দিনে তা থামিয়ে বিজেপি নজর দেয় মধ্যপ্রদেশে। সেই কাজ নির্বিঘ্নে শেষ করতে জিইয়ে রাখা হয়েছিল সংসদের অধিবেশন। করোনার দিকে ঠিকঠাক তাকানোর ফুরসত বিজেপি পায় মার্চ মাসের ২০ তারিখে, মধ্যপ্রদেশের কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী কমলনাথের ইস্তফার পর। ২২ তারিখ সারা দেশে ‘জনতা কারফিউ’ পালিত হয়। ২৪ মার্চ রাত ১২টা থেকে শুরু তিন সপ্তাহের প্রথম লকডাউন।

করোনার মোকাবিলায় এই ঢিলেমি ও লকডাউন পর্বে চূড়ান্ত অব্যবস্থা সরকারকে অসহায় করে তুলেছিল। কিন্তু ক্রমেই প্রধানমন্ত্রী মোদি পরিত্রাণের উপাদানগুলো বেছে নেন। সংকটকে সম্ভাবনায় বদলাতে দেরি করেননি। প্রবল সংসদীয় গরিষ্ঠতা ও নির্বিষ ছন্নছাড়া বিরোধিতার সুবাদে সরকার কী কী গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কোন কোন বিতর্কিত আইন পাস করেছে, এত দিনে সবার তা জানা। এ–ও জানা, বেহাল অর্থনীতিতে দেশ কেমন শনৈঃ শনৈঃ এগোচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সম্ভাবনার খোঁজে তিনি থমকে থাকেননি। টিকা কূটনীতি তারই সর্বশেষ নমুনা।

টিকা উদ্ভাবনে ভারত উন্নত দেশের সঙ্গে টেক্কা দিচ্ছে দুটি কারণে। দাম ও সংরক্ষণ-বণ্টনে সুবিধা। পশ্চিমা দেশের তুলনায় ভারতে তৈরি টিকা সস্তা। দ্বিতীয়ত, ভারতে তৈরি টিকা সংরক্ষণ ও বণ্টন সহজতর।

বিশ্বে বছরে যত প্রতিষেধক উৎপাদন হয়, ভারত তার ৬০ শতাংশের ভাগীদার। জাতিসংঘ বছরে যত প্রতিষেধক কেনে তারও ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ ভারতের অবদান। করোনার প্রতিষেধক তৈরিতে ভারত তাই শুরু থেকেই সচেষ্ট। উন্নত দেশের সঙ্গে এই ক্ষেত্রে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা রীতিমতো পাল্লা দিয়ে গেছেন। সাফল্যের ইঙ্গিত পাওয়ামাত্র মোদি তাই জানিয়ে দেন, মানবিক ভারত বিশ্ববাসীর পাশে দাঁড়াবে। টিকার সুফল ছড়িয়ে দেবে। টিকা দেওয়ার অঙ্গীকার ছাড়াও প্রাথমিক ধাক্কা সামলাতে বিভিন্ন দেশকে ভারত হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন, রেমডেসিভির, প্যারাসিটামল, মাস্ক, পিপিই, গ্লাভস ও টেস্ট কিট দেদার সরবরাহ করেছে। সংক্রমণ রুখতে আয়োজন করেছে শিক্ষা শিবিরের। বুঝিয়েছে, ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি নিছকই কথার কথা নয়। এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল ও সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর পাশে দাঁড়ানোর যে নীতি স্বাধীন ভারত গ্রহণ করেছিল, সেই ধারাবাহিকতা মোদি বজায় রেখেছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকে সেই কথা জানিয়ে মোদি বলেন, ‘ভারতের প্রতিষেধক উৎপাদন ও বণ্টন ক্ষমতা সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে উৎসর্গীকৃত।’

টিকা তৈরিতে ভারত উন্নত দেশের সঙ্গে টেক্কা দিচ্ছে দুটি কারণে। দাম ও সংরক্ষণ-বণ্টনে সুবিধা। পশ্চিমা দেশের তুলনায় ভারতে তৈরি টিকা সস্তা। দ্বিতীয়ত, ভারতে তৈরি টিকা সংরক্ষণ ও বণ্টন সহজতর। এই টিকা গৃহস্থের সাধারণ রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করা যায়, পশ্চিমা টিকা সংরক্ষণে প্রয়োজন মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও বণ্টনে বিশেষায়িত কোল্ড চেইন। এই জন্য এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের কিছু দেশে ভারতের টিকার চাহিদা প্রবল। ভারতও সাধ্যমতো চেষ্টা করছে সেই চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের পাশাপাশি সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করতে।

বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রী মোদির ভাষায়, এই টিকা তাই ‘মৈত্রী টিকা’। সবচেয়ে কাছের ও বিশ্বস্ত বন্ধু বাংলাদেশ উপহার পেয়েছে সবচেয়ে বেশি। ২০ লাখ টিকা। তারপর মিয়ানমার ১৫ লাখ ও নেপাল ১০ লাখ। ভুটান ও মালদ্বীপ যথাক্রমে দেড় লাখ ও এক লাখ। মরিশাসকে ভারত দিয়েছে এক লাখ ও সেশেলস দ্বীপপুঞ্জকে ৫০ হাজার। উপহারের যা বহর, তাতে মনে করা হচ্ছে, সংখ্যাটা সব মিলিয়ে এক কোটি ছুঁয়ে ফেলতে পারে।

‘মৈত্রী টিকা’ উপহারের পাশাপাশি রয়েছে টিকাসংক্রান্ত চুক্তিবদ্ধতা। প্রতিবেশী প্রায় সব দেশই ভারতীয় প্রতিষেধক পেতে কোনো না কোনোভাবে চুক্তিবদ্ধ। প্রতিবেশীদের বাইরে চুক্তিবদ্ধ দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল ও মরক্কোতে টিকা পাঠানোর তোড়জোড় এই মুহূর্তে তুঙ্গে। শতভাগ ভারতীয় টিকা হায়দরাবাদের ভারত বায়োটেকের ‘কোভ্যাক্সিন’ তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল বাংলাদেশে করতে চাইছে। অনুমতি পেলে তা হবে বাংলাদেশ-ভারতের দৃঢ় বন্ধুত্বের আরও এক প্রমাণ।

টিকা কূটনীতিতে ভারত নিশ্চিতভাবেই টেক্কা দিয়েছে করোনার সূতিকাগৃহ চীনকে। বিশেষত এশিয়ায়। চীন তার টিকা ‘সিনোভ্যাক’ বিক্রিতে অনেক দিন থেকেই সচেষ্ট। বিশ্বে করোনার প্রসার তাদের যে বদনাম দিয়েছে, টিকা দিয়ে তা ঘোচাতে তারা আগ্রহী।

টিকা কূটনীতিতে ভারত নিশ্চিতভাবেই টেক্কা দিয়েছে করোনার সূতিকাগৃহ চীনকে। বিশেষত এশিয়ায়। চীন তার টিকা ‘সিনোভ্যাক’ বিক্রিতে অনেক দিন থেকেই সচেষ্ট। বিশ্বে করোনার প্রসার তাদের যে বদনাম দিয়েছে, টিকা দিয়ে তা ঘোচাতে তারা আগ্রহী। সেখানেও তারা ভারতের অনুসারী। ‘মৈত্রী টিকার’ সঙ্গে পাল্লা দিতে চীন তাই মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও ফিলিপাইনকে ‘সিনোভ্যাক’ উপহার দেবে জানিয়েছে। পাকিস্তানকে দিয়েছে ৫ লাখ টিকার প্রতিশ্রুতি।

কূটনৈতিক সাফল্য সত্ত্বেও এ কথা ঠিক, টিকা নিয়ে ভারতের নানা মহলে আড়ষ্টতা এখনো কাটেনি। সংশয় চিকিৎসাকর্মীদের মধ্যেও। সেই কারণে দৈনিক ৩ লাখ টিকা দানের লক্ষ্যমাত্রা এখনো অধরা। আড়ষ্টতা ও অনীহা প্রধানত ‘কোভ্যাক্সিন’ নিয়ে, যেহেতু তার তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল প্রশ্নবিদ্ধ। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও যে হচ্ছে না, তা নয়। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ কেন্দ্র ও রাজ্যস্তরের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারাও এখনো টিকা নেননি। সব মিলিয়ে সাধারণের মনে অনীহা ও সংশয়ের সঙ্গে জন্ম নিয়েছে একধরনের শঙ্কা। এই শঙ্কা দ্রুত দূর হওয়া দরকার। শুধু বিবৃতি নয়, দৃষ্টান্ত স্থাপনে নেতাদের এগোতে হবে। তাঁদের টিকা নিতে দেখলে জনগণ ভরসা পাবে। উৎসাহিত হবে।

‘মৈত্রী টিকা’ অবশ্যই বিরাট কূটনৈতিক সাফল্য। সার্বিক সাফল্যের ভার কিন্তু নেতাদেরই। জনমনে আস্থা, ভরসা ও সাহস জোগানোর দায়িত্ব তাঁদেরই।


সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন