default-image

ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীকে বিয়ে করতে হাইকোর্টের নির্দেশনা একটি অত্যন্ত জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়। কারণ সারা দেশে যেভাবে ধর্ষণের মতো ঘটনা বেড়েছে, সেখানে আমরা দেখলাম নির্বাহী বিভাগ আনুষঙ্গিক কোনো প্রতিকার অর্থাৎ নতুন কোনো সংস্কারের দিকে যায়নি। তারা জনপ্রিয় দাবির মুখে একটি অধ্যাদেশ জারি করেছে। ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড করেছে। যদিও সবার জানা, ধর্ষণের দায়ে যাবজ্জীবন সাজার মতো গুরুতর শাস্তিপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা কোনোকালেই যথেষ্ট ছিল না। তদুপরি কেউ কেউ মনে করেন, এটা মন্দের ভালো। ভুল-শুদ্ধ যা-ই হোক, দাবি যখন উঠেছে, নির্বাহী বিভাগ তাতে সাড়া দিয়েছে।

সংসদও গত সপ্তাহান্তে অধ্যাদেশটিকে অবিকল আইনের অংশে পরিণত করেছে। সংসদ ভাবতে পারে, সেও তার দায়িত্ব সেরেছে। এখন যা করার, তা করবে বিচার বিভাগ। এবং আমরা লক্ষ করি যে কাকতালীয় হোক বা না হোক, উচ্চ আদালত থেকেও একটি নতুন পদক্ষেপ এসেছে।

হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চের আদেশের ভিত্তিতে ফেনীর কারাগারে গত ১৯ নভেম্বর একটি বিয়ে হয়েছে। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, এ রকম পদক্ষেপের ফলে ধর্ষকদের উৎসাহিত করা হবে কি না? মামলাটি পর্যবেক্ষণ করছেন, এমন দুজনের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছি। আদালতের আদেশের সঙ্গে একমত হতে পারেননি, এমন একজন মানবাধিকারকর্মীর অকাট্য যুক্তি হলো:
১. যেকোনো ধরনের আইনি মারপ্যাঁচ কিংবা বাদী-বিবাদীর সম্মতির ভিত্তিতেই ‘কারাগারে বিয়ের’ সিদ্ধান্তে হাইকোর্ট সম্মত হোন না কেন, দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে যৌন অপরাধীদের মনস্তত্ত্ব এর কোনো প্রতিরোধমূলক প্রভাব পড়বে, সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ। বরং সাধারণভাবে নারীর জন্য আরও ভয়ানক উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিতে পারে। কারণ, অভিযুক্ত ব্যক্তির দরকার মামলার ঝামেলা থেকে রেহাই পাওয়া। এই মুহূর্তে তাঁর ছাড়া পাওয়াই তাঁর কাছে সব থেকে প্রার্থিত বিষয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের আর একটা নতুন অর্জন হলো।

বিজ্ঞাপন

২. কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে আসামি-স্বামী নিরুদ্দেশ হতে পারেন। আসামি দূর থেকেই তাঁর স্ত্রীকে ‘আইনানুগভাবে’ তালাক দিতে পারেন। তখন যেটা দাঁড়াবে, আসামি আর মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধের দায়ে অপরাধী থাকবেন না। অন্যায়ভাবে তালাক দেওয়ার অপরাধে ভাগ্যবিড়ম্বিত স্ত্রীকে প্রতিকারের আশায় যেতে হবে পারিবারিক আদালতে।
৩. ধর্ষণের আসামি থেকে স্বামীতে পরিণত হওয়া ব্যক্তি তাঁর বৈধ স্ত্রীকে তালাক দিয়ে যদি দেনমোহর খোরপোষ ও ভরণপোষণের বিষয়গুলো সঠিকভাবে কার্যকর করেন, তখন কী হবে? বিষয়টি চূড়ান্ত বিচারে এটাই দাঁড়াল কি না, আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে একজন অভিযুক্ত ধর্ষক ‘টাকার বিনিময়ে’ দীর্ঘ কারাবাস, জামিন, পলাতক হওয়া, ফাঁসি হওয়ার মতো শাস্তির ভয় থেকে নিজকে মুক্ত করে নেওয়ার পথ পেল।
মানবাধিকারকর্মীর এই পর্যন্ত যুক্তি শোনার পর আমি তাঁকে অনুরোধ করি, আদালতের আদেশের পক্ষের যুক্তিগুলো শুনতে এবং তাঁর সুচিন্তিত মত দিতে। একজন পুরুষ পর্যবেক্ষণকারীর কাছ থেকে এই আদেশের পক্ষে যে যুক্তি পেলাম, সেটাও তাঁকে যথাসম্ভব অবিকল শোনালাম। আমাদের আলোচনার বিবরণটি তুলে ধরছি;
তাঁকে বললাম, প্রথমত, হাইকোর্ট উভয় পক্ষকে শুনে একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছেন। এটি কোনো চূড়ান্ত রায় নয়। উভয় পক্ষের পূর্ণ শুনানি শেষে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় দেওয়ার সুযোগ খোলা আছে।

মানবাধিকারকর্মী বললেন, ‘আমজনতা বিশেষ করে যৌন অপরাধীদের কাছে বার্তা যেতে পারে, হাইকোর্ট মনে করেন ধর্ষণের পর মামলা খেয়ে বিয়ে করে নিলেই জামিন মিলবে। ফাঁসি থেকেও বাঁচা যাবে। কোনটি রায় আর কোনটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ, তার ফারাক সাধারণ জনগণের বোঝার কথা নয়।
এই যুক্তির পিঠে বললাম, আমি খোঁজ নিয়েছি। এক সচেতন পর্যবেক্ষকের বরাতে যত দূর জেনেছি, সেটা হলো, কিছু সংবাদমাধ্যম যেভাবে ‘ধর্ষকের’ সঙ্গে ভিকটিমের বিয়ে বলে চিত্রিত হয়েছে, তা আদৌ সত্য নয়। কারণ ফেনীর ক্ষেত্রে হাইকোর্টের সামনে পরিষ্কার হয়েছে, ‘দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিন। তাঁদের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি হয় অভিভাবকদের কারণে। এ কারণেই মামলার উৎপত্তি। দুই পরিবারের মধ্যে মিলনের সংবাদ হাইকোর্টের কাছে খুব ইতিবাচক মনে হয়েছে।’ সুতরাং এটা তো আর দশটা ধর্ষণ মামলা নয়। এই ঘটনা একটি ব্যতিক্রম এবং বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখা যেতে পারে।
আর নারী অসহায় বলেই কি ধরেই নিতে হবে যে ধর্ষণের অভিযোগ তোলা অসত্য বা কৌশলগত হতে পারেই না? যে বিয়েটি ফেনীতে হলো, সেটা তালাকে গড়াতে পারে, সেটা ধরে নিয়ে আদালতের আদেশের বিরোধিতা করা যদি যুক্তি হয়, তাহলে এই বিয়ে টিকে যেতে পারে, কারণ তাঁদের মধ্যে প্রমাণিত প্রেমের সম্পর্ক ছিল—এটা কেন যুক্তির কথা হবে না? অভিযুক্ত ব্যক্তির জামিন নাকচ করা হলেই বাদীর জন্য ন্যায়বিচার হবে কিংবা তাঁর জন্য নিরাপত্তার সুরক্ষা তৈরি হবে, সেটাই কি নিশ্চিত করে বলা যায়?

বিজ্ঞাপন
প্রবীণ মানবাধিকারকর্মী তাঁর চার দশকের অভিজ্ঞতার দাবিতে বললেন, আপাতদৃষ্টিতে এটা যুক্তিগ্রাহ্য মনে হলেও এটা চূড়ান্ত বিচারে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন। আদালতের আদেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলেও একই সঙ্গে আমি প্রবীণ মানবাধিকারকর্মীর বক্তব্য ও অবস্থানকে দৃঢ়তার সঙ্গে নাকচ করতে পারি না।

প্রবীণ মানবাধিকারকর্মী তাঁর চার দশকের অভিজ্ঞতার দাবিতে বললেন, আপাতদৃষ্টিতে এটা যুক্তিগ্রাহ্য মনে হলেও এটা চূড়ান্ত বিচারে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন আদালতের আদেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলেও একই সঙ্গে আমি প্রবীণ মানবাধিকারকর্মীর বক্তব্য ও অবস্থানকে দৃঢ়তার সঙ্গে নাকচ করতে পারি না।
অবশ্য সামগ্রিক দিক বিবেচনায় অনেকেই হয়তো বলবেন যে মামলাটিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা উচিত। একটি ধর্ষণ মামলাকে কেন্দ্র করে কারাগারে বিয়ে এবং মিষ্টিমুখ নিশ্চয় কোনো অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে না। এটা অবশ্যই কোনো বিচারিক মডেল নয়। যদি পাত্রপাত্রীর অভিভাবকদের মধ্যকার ভুল-বোঝাবুঝি থেকেই মামলার উৎপত্তি, আর যদি সত্যিই তাঁদের মধ্যে ‘মিলন’ ঘটে, তাহলে তো হাইকোর্টের আদেশ লাগে না। সেই অর্থে হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশটি প্রকারান্তরে নারীর পক্ষে দাঁড়ানো। কারণ হাইকোর্ট ঝুঁকি নিতে চাননি। বিষয়টি কি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য হতে পারে? যেখানে দাবি করা হবে যে অনিচ্ছুক অভিভাবকদের রাজি করাতে অভিযুক্ত পুরুষের কৌশলগত সম্মতিতে ভিকটিম নারী তাঁদের প্রেমের জয় নিশ্চিত করতে এই মামলা সাজিয়েছেন?
আর তারই পরিণতি দাঁড়াল, এক হাতে কাবিন, অন্য হাতে জামিন!
আলোচ্য বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ আছে। একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ঘটনায় একটি নির্দিষ্ট প্রতিকার হতে পারে না, এটা যুক্তিসিদ্ধ নয়। এই ঘটনায় যেভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকার জেলার এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উভয়ের ‘পূর্ব প্রেম’ বিবেচনায় সম্পৃক্ত হয়েছেন, সেটা তো অন্যান্য মামলায় দেখা যায় না।

বিয়ের মিথ্যা আশ্বাসে যৌন সম্পর্ক অবশ্যই ধর্ষণ। ধর্ষণ কোনোক্রমেই আপসযোগ্য অপরাধ নয়। বিয়ে করলেও ধর্ষণের সাজা তাকে খাটতে হবে।

হাইকোর্টের যে বেঞ্চ বিয়ের অনুমতি দিয়েছেন, সেই বেঞ্চ গত অক্টোবরে আরেকটি আদেশ দিয়েছিলেন। জামিনে মুক্তি পেলে ভিকটিমকে বিয়ে করবেন, এই শর্তে ধর্ষণের দায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কারাবন্দী হাইকোর্টে জামিন চান। সেখানেও উভয় পক্ষ সম্মত ছিল। সংখ্যালঘু পরিবার। প্রেমের সম্পর্কে মেয়েটি গর্ভবতী (তখন তার বয়স ১৪) হয়। গত ২২ অক্টোবর হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছিলেন কারাফটকেই বিয়ের ব্যবস্থা করতে। জেলারকে বলেছিলেন ৩০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টকে অগ্রগতি জানাতে। কিন্তু সেটা বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জানানো হয়নি। ২০ নভেম্বর খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, আদালতের সামনে পক্ষগুলো সব তথ্য প্রকাশ করেনি। বিশেষ করে উভয়ে যে সম্পর্কে কাজিন, সেটা আদালতের গোচরে আনা হয়নি। হিন্দু আইন অনুযায়ী কাজিনদের মধ্যে বিয়ে বৈধ নয়।
উল্লেখ্য, ধর্ষক এবং ধর্ষণের শিকার নারীর মধ্যে বিয়ের আদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের একাধিক হাইকোর্ট দিয়েছেন। ২০১৫ সালে ডিএনএ টেস্টে এক বাচ্চার পিতৃ পরিচয় প্রমাণিত হয় ওডিশায়। ৭ বছরের দণ্ডিত ধর্ষক ‘আপসের’ বিয়েতে সম্মত হন এবং জামিন পান। ‘সন্তানের মঙ্গলচিন্তায়’ দেওয়া ওডিশা হাইকোর্টের সেই সিদ্ধান্ত উল্টে দিয়েছিলেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়গুলো এ রকম: লিভ টুগেদারে থাকা নারীর সম্মতিতে যৌন সম্পর্ক ধর্ষণ নয়। বিয়ের মিথ্যা আশ্বাসে যৌন সম্পর্ক অবশ্যই ধর্ষণ। ধর্ষণ কোনোক্রমেই আপসযোগ্য অপরাধ নয়। বিয়ে করলেও ধর্ষণের সাজা তাকে খাটতে হবে। সুতরাং আমরা উল্লিখিত মানবাধিকারকর্মীর সঙ্গে একমত হতে পারি, যখন তিনি বলেন, আমাদের আইনজীবী ও সংবাদকর্মীরা পুরুষতান্ত্রিক। ফেনীর নারীর ব্যক্তিগত বিষয় গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু ধর্ষণের শিকার অন্য দশ নারীর আইনি সুরক্ষা ও তার সংবেদনশীলতা গুরুত্বপূর্ণ।
ফেনীর আদেশটি যদি একটি নির্দিষ্ট প্রেম-বিরোধের মীমাংসা এনে দেয়, তাহলে তা নিশ্চয় সুখকর। নারীর পক্ষে জয়। কারণ অনেকে বলবেন, এ জগৎ-সংসারে নিরঙ্কুশ বলে কিছু নেই। সবকিছুই আপেক্ষিক। কী হতে পারে, এ বিষয়ে অনেক কিছু বলা যেতে পারে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও বিয়ে ভেঙে যায়, তালাক হয়। তাই সমাজে একটা আত্মজিজ্ঞাসাও দরকারি।

মিজানুর রহমান খান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন