বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অনেকে টুটুর কর্মকাণ্ডকে দুটি ভাগে ভাগ করেন। প্রথমত, বর্ণবাদ অবসানে তাঁর প্রচেষ্টা (এ জন্য ১৯৮৪ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান)। দ্বিতীয়ত, তাঁর জাতি গঠনের প্রচেষ্টা। দক্ষিণ আফ্রিকানদের জন্য তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধা নেলসন ম্যান্ডেলা রেইনবো নেশন খ্যাত বর্ণবৈষম্যহীন সমাজ গঠনের অনন্য ধারণাটি মূর্ত করে তুলেছিলেন। প্রথমটার জন্য তিনি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। পরেরটির জন্য বিতর্কের মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। যদিও স্বাধীনতার আগে এবং পরের টুটুর মধ্যে পার্থক্য খুব সামান্য।

১৯৭০-৮০-এর দশকে ডেসমন্ড টুটু সাউথ আফ্রিকান কাউন্সিল অব চার্চেসের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাধীনতাসংগ্রামের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। অভিযাত্রা ও বর্জন আন্দোলনের যুগটাতে আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন তিনি। কিন্তু একই সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার সংঘাতের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায়টিতে শেষকৃত্যে পৌরোহিত্য তাঁকে করতে হয়েছে।

সেটা ছিল দুর্দান্ত এক সময় এবং টুটু প্রায়ই ছিলেন ঘটনার কেন্দ্রে। আজকে টুটুর যে প্রবাদতুল্য প্রতিচ্ছবি, সেটার জন্ম ওই সময়েই। স্বজন হারানো মানুষেরা যাতে তাদের শোক প্রকাশ করতে পারে, সে জন্য পুলিশের সঙ্গে দর-কষাকষির ক্ষেত্রে ‘যাজকের বেগুনি আলখাল্লায় মোড়া পোশাকে’ তিনিই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি।

ডেসমন্ড টুটু যে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাবেন, সেটা মোটেই অপ্রত্যাশিত ছিল না। নোবেলপ্রাপ্তির পর স্বাগত বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘নিপীড়ন নিপীড়ক ও নিপীড়িত, দুজনকেই অমানবিক করে তোলে। প্রকৃত মুক্তি ও মানুষ হওয়ার জন্য নিপীড়ক ও নিপীড়িতকে একে অপরের প্রয়োজন। আমরা মানুষ হয়ে উঠতে পারি কেবল পরস্পরের সাহচর্য, ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও শান্তিতে।’

এক দশক পরে তাঁর দেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন টুটু তাঁর তত্ত্ব প্রয়োগের সুযোগ পান। ১৯৯৫ দক্ষিণ আফ্রিকার সদ্য গঠিত শান্তি ও পুনর্মিলন কমিশনের (টিআরসি) চেয়ার নির্বাচিত করা হয় তাঁকে। এর এক বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার ঐতিহাসিক নির্বাচনে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস বিজয়ী হয় এবং নেলসন ম্যান্ডেলা প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশ পরিচালনার ভার নেন। জনগণের সামষ্টিক ক্ষত নিরাময়ের নতুন এক পরীক্ষামূলক অভিযাত্রা শুরু হয় টুটুর।

প্রতিশোধের ওপরে পুনর্মিলনকে গুরুত্ব দেওয়ায় টিআরসি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিল। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকায় জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। একদিকে কমিশন উন্মুক্ত গণশুনানির আয়োজন করেছিল, এ ধরনের স্বচ্ছ শুনানি দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিল প্রথম। অন্যদিকে ক্ষমার প্রতি টুটুর যে অবস্থান, তাতে অনেক সময়ই মনে হয়েছে, জবাবদিহির চেয়ে ক্ষমাপ্রদর্শনই মুখ্য হয়ে উঠছে। বর্ণবাদী অপরাধে কারও বিরুদ্ধে ভুল অভিযোগ আনা হলে টুটু কেঁদে ফেলতেন, করজোড়ে মিনতি করতেন এবং ক্ষমা চাইতেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটা ছিল চমৎকার ব্যাপার, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিও তৈরি করত।

ডেসমন্ড টুটুর নেতৃত্বে টিআরসি বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের যাঁরা হত্যা করেছেন, তাঁদের একটি তালিকা সরকারের হাতে তুলে দিয়েছিল। এরপর দুই দশক চলে গেছে; কিন্তু আফ্রিকান জাতীয় কংগ্রেস সরকার তাঁদের বিচারের আওতায় আনেনি। বর্ণবাদের শিকার পরিবারগুলো প্রতিকার কী করে পাবে কিংবা তাঁদের ক্ষতিপূরণের প্রশ্নটি কখনোই সরকার তোলেনি।

এর দায় অবশ্য ডেসমন্ড টুটুর নয়। তাঁর মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে বর্ণবাদ থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের সেই সময়কে এবং তাঁর অসমাপ্ত কাজকে। এই দায়িত্ব এখন আমাদের। আমরা যাঁরা ক্লান্ত, তাঁদের এই মহৎ মানুষের কর্মের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ডেসমন্ড টুটুর সেই অবিস্মরণীয় উক্তি, ‘তুমি যদি শান্তি চাও, তবে তোমার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলো না। কথা বলো শত্রুদের সঙ্গে।’ এই জেদই ছিল ডেসমন্ড টুটুর সব কাজের প্রাণশক্তি।

আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ

  • সিসঙ্ক মিজোমঙ্ক দক্ষিণ আফ্রিকার লেখক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার’

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন