ভারতের সশস্ত্র বাহিনী সম্ভবত দেশটির চাকরির বাজারে একক বৃহত্তম নিয়োগকারী সংস্থা। হাজার হাজার যুবক এর নিয়োগ সমাবেশে এবং পরীক্ষা কেন্দ্রে তালিকাভুক্তির জন্য লাইনে দাঁড়ান। কারণ, এ স্থায়ী চাকরি তুলনামূলকভাবে অনেক সুরক্ষা দেয় বলে সাধারণভাবে মনে করা হয়। চাকরির মেয়াদ শেষে সম্মানজনক পেনশন এবং স্বাস্থ্যসেবাসহ জীবনব্যাপী নিরাপত্তাবেষ্টনীর প্রতিশ্রুতি দেয়।

বাহিনীতে দীর্ঘ চাকরির মেয়াদে সেনারা পেশাদার দক্ষতার উচ্চ স্তরে যান। পদাতিক, সাঁজোয়া এবং গোলন্দাজ বাহিনী স্তরে সেনাদের পারস্পরিক দীর্ঘ আদান–প্রদানে একটি নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, যা যুদ্ধ এবং বিদ্রোহ দমন অভিযানের সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান সম্পদ হিসেবে কাজ করে। এ অগ্নিপথ যে সংক্ষিপ্ত মেয়াদের দিকে যাচ্ছে, সেটি এবং মাত্র এক-চতুর্থাংশ অগ্নিবীরের নিয়মিত বাহিনীতে যোগ দেওয়ার সুযোগ রাখার বিষয়টি তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করবে। এটি বাহিনীর মধ্যে দলগত ঐক্যের মনোভাবকে ক্ষুণ্ন করবে। এতে বাহিনীর প্রতি অগ্নিবীরদের প্রতিশ্রুতি ধরে রাখার বিষয়টিও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

ভারতের বিশাল করপোরেট খাত এই অগ্নিবীরদের পুনর্বাসনে সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এর মধ্য দিয়ে তারা এ বার্তা দিচ্ছে যে যাঁরা দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করার পর একসময় খাকি পোশাক খুলবেন, তখন তাঁদের দেখাশোনা করা তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এভাবে সরকারি-বেসরকারি প্রচেষ্টায় অগ্নিপথ স্কিমকে সফল করে তোলা সম্ভব হতে পারে।

পুরোনো ব্যবস্থার নেতিবাচক দিক হলো সেনাবাহিনীতে বয়স্ক সেনার সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। বর্তমানে ভারতের সেনাবাহিনীর সদস্যদের গড় বয়স ৩২ বছর। অগ্নিপথ নামের বিকল্পটি সেই সংখ্যাকে ২৬-এ নামিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। বয়স ইস্যু ছাড়াও পেনশনের বিপুল ব্যয়কে কমিয়ে আনার বিষয়টিও অগ্নিপথ স্কিম চালুর পেছনে কাজ করেছে। ভারতের ক্ষেত্রে সেনাদের পেনশনের পেছনে প্রতিরক্ষা বাজেটের একটি বিশাল অংশ ব্যয় হয়। সেনাবাহিনীতে এখন পুরোনো সমর সরঞ্জাম বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় পেনশনের খরচ কমিয়ে আনলেই এ সরঞ্জাম কেনাকাটার বাজেট বাড়ানো যেতে পারে।

কিন্তু অগ্নিপথের নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং সে প্রক্রিয়া ধরে রাখার নীতির ঘোষণায় তরুণদের ক্ষোভ আন্দোলনের দিকে গড়িয়েছে। যে দেশে চাকরি সহজে পাওয়া যায় না, সেখানে চাকরি পেয়ে তা হারানোর প্রবল আশঙ্কা বিক্ষোভকে উসকে দিয়েছে। তবে যে ৭৫ শতাংশ অগ্নিবীরকে চার বছরের মেয়াদ শেষে আবার বেকার হতে হবে ও নতুন করে চাকরি খুঁজতে হবে, তাঁদের জন্য সরকার সুরক্ষার ঘোষণা দেওয়ায় ক্ষোভ কিছুটা প্রশমিত হচ্ছে।

ভারত সরকার অগ্নিবীরদের জন্য কিছু সুবিধা ঘোষণা করতে পারে। যেমন ‘তেজাস’ নামের হালকা যুদ্ধবিমান নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস লিমিটেডের মতো প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে তাঁদের জন্য কোটা রাখা যেতে পারে। পুলিশ পরিচালিত সংস্থাগুলোতেও একই রকম সংরক্ষণ ঘোষণা করা হয়েছে। একইভাবে ‘ইন্ডিয়ান মার্চেন্ট নেভি’র লোকবল নিয়োগে এই অবসরপ্রাপ্ত অগ্নিবীরেরা যাতে যুক্ত হতে পারেন, সে জন্য তাঁদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং মার্চেন্ট নেভিতে তাঁদের অন্তর্ভুক্তিতে সহায়তা করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

ভারতের বিশাল করপোরেট খাত এই অগ্নিবীরদের পুনর্বাসনে সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এর মধ্য দিয়ে তারা এ বার্তা দিচ্ছে যে যাঁরা দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করার পর একসময় খাকি পোশাক খুলবেন, তখন তাঁদের দেখাশোনা করা তঁাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এভাবে সরকারি-বেসরকারি প্রচেষ্টায় অগ্নিপথ স্কিমকে সফল করে তোলা সম্ভব হতে পারে।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

এস কে চ্যাটার্জি ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার ও লেখক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন