default-image

ইদানীং মজার একটি বিষয় দেখা যাচ্ছে। সেটি হলো ট্রাম্প ও ‘ট্রাম্পিজম’-এর সমালোচকদের সঙ্গে এখন ডানপন্থীরাও যুক্ত হয়েছেন। ডানপন্থী বলতে আমি নমনীয় ধাঁচের ডানপন্থী (অল্টারনেটিভ রাইট), কট্টর ডানপন্থী, ইভানজেলিক্যাল রাইট অথবা বর্ণবাদী ডানপন্থীদের কথা বলছি না। আমি সেসব ডানপন্থীর কথা বলছি, যাঁরা মূলধারার রক্ষণশীল বলে পরিচিত এবং বিগত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনগুলোতে রিপাবলিকান পার্টির হয়ে কাজ করেছেন বা রিপাবলিকান পার্টির মনোনীত প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন।

এ ধরনের সাধারণ রক্ষণশীল যাঁরা রিপাবলিকান পার্টিকে সমর্থন করেন এবং গত নির্বাচনে ট্রাম্পকে সমর্থন করেও বর্তমানে ট্রাম্পবিরোধী হয়ে উঠেছেন, তাঁদের মধ্যে সাংবাদিক ডেভিড ফ্রাম (যিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের বক্তৃতালেখক ছিলেন) ও পিটার ওয়েনার এবং লিংকন প্রজেক্টের অনেক সদস্যও আছেন। রক্ষণশীল কলামিস্ট হিসেবে পরিচিত নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার নিয়মিত কলাম লেখক রস ডৌটাট এবং ব্রেট স্টিফেন কিংবা ওয়াশিংটন পোস্ট-এর জেনিফার রুবিনও এই দলের মধ্যে আছে। তাঁরা ট্রাম্পের কাজকারবার নিয়ে সম্প্রতি বেশ সমালোচনামুখর হয়ে লিখছেন এবং ট্রাম্পিজমের নানা দিক নিয়ে চিন্তা উদ্রেক করার মতো বিতর্ক উসকে দিচ্ছেন।

প্রশ্ন উঠছে, কেন তাঁরা এমনটা শুরু করেছেন?

আমার মনে হয়, ট্রাম্পবিরোধী রক্ষণশীলেরা বামপন্থীদের মতো নীতির প্রশ্নে একগুঁয়ে ও নাক উঁচু স্বভাবের নন। তাঁরা নিজেদের মতাদর্শের শিবিরের সমালোচনার বিষয়ে বামপন্থীদের চেয়ে উদার। রুচিজ্ঞানরহিত বক্তব্য ও ছেলেমানুষি কর্মকাণ্ডের জন্য প্রথম থেকেই উদারপন্থীদের সমালোচনার শিকার হয়ে আসছেন। কিন্তু ট্রাম্পের এসব বিষয় বড় ধরনের কোনো ক্ষতির বিষয় ছিল না বলে এ নিয়ে রক্ষণশীলেরা তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করেননি।

রক্ষণশীলেরা, অর্থাৎ প্রকৃত রক্ষণশীলেরা সাধারণত প্রতিষ্ঠানগুলোর গোঁড়া সমর্থক হয়ে থাকেন। তাঁরা আসলে ঐতিহ্য ও আমেরিকান মূল্যবোধকে সংরক্ষণ করতে চান। এ কারণে উদারপন্থীদের চেয়ে প্রকৃত রক্ষণশীলেরাই বেশি উপলব্ধি করতে পারছেন, ট্রাম্প প্রকৃত রক্ষণশীল নন, তিনি আমেরিকান মূল্যবোধের সংরক্ষণে বিশ্বাসী নন বরং তা তিনি ধ্বংস করছেন। তাঁর যদি আদৌ আদর্শিক অবস্থান থাকত তাহলে তিনি একজন বিপ্লবীর মর্যাদা পেতেন।

কট্টর বামপন্থীদের ট্রাম্পবিরোধী সমালোচনা বাস্তবিক অর্থে খুব বেশি কার্যকর নয়। কারণ, তাঁরা ট্রাম্পের মূল ক্ষতিকর দিক উন্মোচন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁরা ট্রাম্পকে নিকৃষ্ট, অশ্লীল, পচা-গান্ধা, মোটা মাথা—এসব বিশেষণ যোগ করে একেবারে খারিজ করে থাকেন। তাঁরা আমেরিকানদের এটি দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন, আমেরিকার উদার গণতন্ত্রের গভীরে যে পচন ধরেছে, সেই পচনের রোগলক্ষণ হচ্ছেন ট্রাম্প, যিনি ধনী, শ্বেতাঙ্গ ও পুরুষাধিপত্যের পক্ষে সাফাই গেয়ে থাকেন। অনেকে মনে করেন, ট্রাম্পের আগামী নির্বাচনের প্রতিপক্ষ জো বাইডেন তুলনামূলকভাবে সামান্য গ্রহণযোগ্য, কিন্তু জো বাইডেনকে দিয়ে কিছুই হবে না।

ট্রাম্পবিরোধী রক্ষণশীলদের অনেকেই রিপাবলিকান ঐতিহ্যের বিষয়ে কোনো সমঝোতা করতে চান না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্টাইলের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই যে কায়দায় সামরিক তৎপরতা চালিয়ে এসেছে, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প তা করছেন না বলে নব্য রক্ষণশীলদের অনেকেই তাঁর ওপর খাপ্পা হয়েছেন। এঁরা ইরাক যুদ্ধের কট্টর সমর্থক ছিলেন। মার্কিন স্টাইলের গণতন্ত্রের সমর্থক হওয়ায় তাঁরা ট্রাম্পকে বিশ্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন।

অর্থাৎ তাঁরা মনে করছেন, ট্রাম্প বিশ্বব্যবস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে গুটিয়ে নেওয়ার কারণে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব হাতছাড়া হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্টাইলের গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্র তার সাম্রাজ্যবাদী চেহারা নিয়ে গোটা বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে, বিশ্ববাসী যুক্তরাষ্ট্রকে যথাসম্ভব ভয়ের চোখে দেখবে—এটি রক্ষণশীলদের আসল চাওয়া। সেই চাওয়া ট্রাম্প পূরণ করতে পারবেন বলে তাঁরা আর মনে করছেন না। এ কারণে ট্রাম্পই এখন তাঁদের বড় মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

ইয়ান বুরুমা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ডাচ লেখক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন