default-image

সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে বাউলশিল্পী রণেশ ঠাকুরের সংগীত সাধনার ঘরটি পুড়িয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের শিষ্য রণেশ ঠাকুর। তাঁর ঘর পুড়িয়ে ফেলা ব্যক্তির ওপর আক্রোশ নয় কেবল। শত শত বছর ধরে এ দেশে যে বাউলসাধনা চলে আসছে, বাউলগানের মাধ্যমে তাঁরা সমাজে সম্প্রীতি ও মিলনের বাণী প্রচার করে আসছেন, তার ওপর আঘাত। কারণ যা-ই হোক না কেন দুর্বৃত্তদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। শাস্তি পায় না বলেই এরা বারবার বাউলদের ওপর হামলা করে।

শাহ আবদুল করিম মারা যাওয়ার পর যেসব শিষ্য তাঁর গানের ধারা বহন করে চলেছেন এবং বাউলসাধনাকে জীবনের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান মনে করছেন, রণেশ ঠাকুর তাঁদের একজন। তাঁরাই শাহ আবদুল করিমের যোগ্য উত্তরসূরি।

রণেশ ঠাকুর নিজের বসতঘরের পাশে প্রতিষ্ঠা করেন এই সংগীতপীঠ। এখানে নিয়মিত আসর হতো। দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা আসতেন। এই ঘরেই ছিল রণেশ ঠাকুরের প্রিয় দোতরা ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র। ছিল গানের বই, খাতা ইত্যাদি। ১৯ মে গভীর রাতে ঘরটি পুড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। শিল্পী তখন পাশের ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। ঘুম থেকে উঠে দেখেন দুর্বৃত্তরা পালিয়ে গেছে। এরপর আশপাশের লোকজন এসে আগুন নেভান। কিন্তু বাউলশিল্পীর প্রিয় দোতারা, অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র এবং গানের বই-খাতা রক্ষা করা যায়নি। পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ছবিতে দেখা যায়, বাউলশিল্পী তাঁর অগ্নিদগ্ধ ঘরে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।

দুর্বৃত্তদের আগুনে শুধু ঘর, গানের বই ও দোতারাই পুড়ে যায়নি। পুড়ে গেছে শিল্পীর মনও। তারপরও রণেশ ঠাকুর আশা হারাননি। সেই অগ্নিদগ্ধ ঘরেই পরদিন তিনি অনেককে গান গেয়ে শুনিয়েছেন। রণেশ ঠাকুর শিল্পী। জমিজমা বা সম্পদ নিয়ে কারও সঙ্গে তাঁর বিবাদ ছিল না। পুলিশকে তিনি বলেছেন, আমার কোনো শত্রু নেই। তিনি কাউকে সন্দেহও করেননি। বাউলরা উদার হন। তাঁরা লালন ও শাহ আবদুল করিমের জীবন-দর্শনে বিশ্বাসী। মানুষে মানুষে কোনো তফাত করেন না।

বাউলশিল্পী রণেশ ঠাকুর গান গেয়ে সম্প্রীতির কথা বলতেন। মানুষকে ভালোবাসার কথা বলতেন। আধ্যাত্মিক সাধনা ও ধর্মতত্ত্বের কথা প্রচার করতেন। এর আগে ২০১০ সালে শাহ আবদুল করিমের আস্তানায়ও সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল। কিন্তু হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নেয়নি। এসব ঘটনায় দুর্বৃত্তরা ধরা পড়লে, শাস্তি পেলে হয়তো এ ধরনের হামলা এড়ানো যেত। বিচারহীনতাই তাদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।

কেবল সুনামগঞ্জ নয় গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাউলদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার একতারপুর গ্রামে লালন অনুসারী এক বাউলের আখড়ায় হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। তারা বাউলদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপায় এবং রড দিয়ে বেধড়ক আঘাত করে।

একই বছর মে মাসে কুষ্টিয়ার শিশির মাঠ এলাকায় দুর্বৃত্তদের চাপাতির আঘাতে নিহত হন বাউলভক্ত চিকিৎসক মীর সানাউর রহমান। তিনি বিনা পয়সায় মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিতেন। সন্ত্রাসী হামলায় আক্রান্ত হওয়ার সময় সঙ্গে ছিলেন সানাউরের বন্ধু ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাইফুজ্জামান। হামলাকারীদের বাধা দিতে গেলে তাঁদের চাপাতির আঘাতে তিনিও গুরুতর আহত হন। ২০১৪ সালের নভেম্বরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বাউলসাধক এ কে এম শফিউল ইসলামকেও হত্যা করা হয়। ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে একইভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক সংগীতপ্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে।
এর আগেও আমরা দেখেছি, ধর্মবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে বাউলদের চুল-দাড়ি কর্তনের ঘটনা ঘটেছে; লালন উৎসবে হামলা হয়েছে, বাউলের আখড়ায় আগুন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুর্বৃত্তদের শনাক্ত করা ও শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসন অনেকটাই নির্বিকার। অনেক সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাউলদের আখড়া ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে হামলাকারীরা আরও আশকারা পেয়ে যায়। মৌলবাদী-জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী বাউলদের বিরুদ্ধে অবিরাম অপপ্রচার চালায়। কিন্তু সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না। এই গোষ্ঠীর হাতে কেবল বাউলেরাই আক্রান্ত হননি। আক্রান্ত হয়েছেন মুক্তচিন্তার লেখকেরাও।

অন্যদিকে কোনো বাউলশিল্পীর কোনো বক্তব্য নিয়ে কেউ মামলা ঠুকে দিলেই সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়। মামলার মেরিটও ভেবে দেখা হয় না। বলা হয়, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গত জানুয়ারিতে টাঙ্গাইলে শরিয়ত বয়াতি নামের এক বাউলশিল্পীর বক্তব্য নিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয়। এখনো তিনি কারাগারে আছেন। তার মানে কোনো গোষ্ঠী অভিযোগ করলেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হবে, তিনি অপরাধী হোন বা না হোন।

সরকারের মন্ত্রী থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরা বলেন, আইন নিজস্ব গতিতে চলবে। কিন্তু আইন সব ক্ষেত্রে সমান চলে না। বাউলদের আস্তানায় যখন হামলা হয়, যখন তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন আমরা আইনকে নিজের গতিতে চলতে দেখি না।

ধর্মীয় অনুভূতির কথা বলে যারা মামলা করেন, তাদের মতলব হলো অন্যের মুখ বন্ধ করে দেওয়া। কিন্তু ধর্মীয় অনুভূতির নামে যারা বেআইনি কাজ করে, অন্য ধর্মের ও গোত্রের মানুষের ওপর হামলা চালায় তখন প্রশাসন নির্বিকার। রাষ্ট্রের এই দ্বৈতনীতি সংখ্যালঘুদের মনে শঙ্কা বাড়ায়।

তবে আমরা স্বীকার করি, রণেশ ঠাকুরের ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন দ্রুততার সঙ্গেই পদক্ষেপ নিয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। জেলা প্রশাসন রণেশ ঠাকুরকে ২০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েছে, ঘর তৈরির টিন দিয়েছে। তাঁর পুড়ে যাওয়া ঘরটি তৈরি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে তারা। পুলিশ সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্যদের ধরার চেষ্টা করছে।

এসব ভালো উদ্যোগ। কিন্তু সরকারকে এই নিশ্চয়তা দিতে হবে যে ভবিষ্যতে কোনো বাউলশিল্পীর ঘর পড়িয়ে দেওয়া হবে না। কোনো আখড়ায় হামলা করবে না কেউ। আর সেটি করতে হলে যারা রণেশ ঠাকুরের ঘরে আগুন দিয়েছে, তাদের খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। অন্যথায় একসময় ঘুমন্ত রাষ্ট্রের ওপরই এই অপশক্তি সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে।

সোহরাব হাসান: কবি ও সাংবাদিক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন