default-image

ভারতের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর আমন্ত্রণে পাকিস্তানের রিপাবলিকান-আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী মালিক ফিরোজ খান নূন ভারত সফরে গিয়েছিলেন। সেই সরকারি সফরে প্রধানমন্ত্রী নূনের সঙ্গী হয়েছিলেন তাঁর পত্নী ভিকারুননিসা নূন। পিআইএর বিশেষ বিমানে তাঁরা নয়াদিল্লি যান। প্রধানমন্ত্রী নেহরু পাকিস্তানি অতিথিদের পালাম বিমানবন্দরের গ্যাংওয়েতে গিয়ে অভ্যর্থনা জানান। মালিক ও ভিকারুননিসা বিমানের সিঁড়ি দিয়ে পাশাপাশি নামছিলেন। সিঁড়ির কয়েক ধাপ থাকতেই কীভাবে বেগম ভিকারুননিসার এক পাটি জুতা নিচে পড়ে যায়। নিশ্ছিদ্র সিকিউরিটির বহু কর্মকর্তা বিমান ঘিরে ছিলেন। তাঁদের কেউ নন, সিঁড়ির নিচ থেকে বেগম নূনের জুতাটি স্বয়ং জওহরলাল নেহরু তুলে আনেন। সিকিউরিটির লোকেরা ও অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা হতবাক। হতবাক পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও। কিন্তু তাঁদের হতবাক হওয়ার মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায় যখন তাঁরা দেখেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জুতাটি বেগম নূনের পায়ে পরিয়ে দিতে এগিয়ে গিয়ে নিচু হচ্ছেন। সে এক অকল্পনীয় দৃশ্য।
বেগম নূনের পায়ে জুতা পরিয়ে দিতে গিয়ে নেহরু ছোট হয়েছেন, সে-কথা নিতান্ত ছোটলোক কেউ ছাড়া দুনিয়ার মানুষ বলবে না। বরং প্রকাশ পেয়েছে নেহরুর ঔদার্য, পরম সৌজন্যবোধ ও শিষ্টাচার।
নেহরু, নূন বা ভিকারুননিসা—কেউই ছোট পরিবার থেকে উঠে আসা মানুষ নন। একজন এলাহাবাদের অভিজাত পরিবারের মানুষ, আরেকজন পাঞ্জাবের অভিজাত সামন্ত-ভূস্বামী পরিবারের। নেহরুর বাবা মতিলাল নেহরু ছিলেন ভারতের ব্রিটিশবিরোধী শীর্ষ স্বাধীনতাসংগ্রামীদের একজন এবং পরে মহাত্মা গান্ধীর বন্ধু ও সহকর্মী। নেহরু যদি প্রধানমন্ত্রী নাও হতেন, ছিলেন একজন বিশ্বমানের বুদ্ধিজীবী। ফিরোজ খান নূন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরও ছিলেন পঞ্চাশের দশকে। ভিকারুননিসা ছিলেন একজন সমাজকর্মী। বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় তিনি গভর্নর হাউসে বসে থাকতেন না। বাঙালি নারীনেত্রীদের সঙ্গে মিশে তিনি বহু কাজ করেছেন নারীর উন্নতির জন্য। বাংলার চিত্রশিল্পীদের ভিকারুননিসা পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। ঢাকায় সেকালে একটি চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজকও ছিলেন। বেইলি রোডের ভিকারুননিসা নূন স্কুলটি তাঁরই প্রতিষ্ঠিত ও তাঁর নামে।
স্যার ফিরোজ খান তাঁর এক স্মৃতিকথায় লিখেছেন, জওহরলাল ভিকারের জুতা কুড়িয়ে ওর পায়ে পরিয়ে দিতে গিয়ে কোনো বিপদে পড়েননি। প্রশংসিত হয়েছেন। কিন্তু ব্যাপারটা যদি বিপরীত হতো? নেহরু পিন্ডি আসতেন। বেগম নেহরুর বা তাঁর কন্যা ইন্দিরার জুতা আমি তাঁদের পায়ে পরিয়ে দিতাম? পাকিস্তানের নেতারা আমাকে ছিঁড়ে ফেলত।
বছর খানেকের মতো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ফিরোজ খান নূন। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর তাঁকে সরিয়ে দিয়ে জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেন। পরে আইয়ুব তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেছেন, আমার দুঃখ যে একজন ভালো মানুষের কাছ থেকে আমাকে ক্ষমতা নিতে হয়।
প্রতিপক্ষ বা বিপরীত চিন্তার মানুষকে অসুন্দর ভাষায় নিন্দা বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মধ্যে কিছুমাত্র বাহাদুরি নেই। তা করে কোনো লাভ হয় না। বরং একজন সম্মান্য ব্যক্তির সম্মান রক্ষা করাই একজন সম্মানিত ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের বৈশিষ্ট্য।
পশ্চিমবঙ্গের দলমত-নির্বিশেষে সব মিডিয়াই খালেদা জিয়ার প্রতি বিরূপ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাওয়ের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ভারত সফরে গিয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের কোনো কোনো কাগজ লিখল, তিনি ভালো ইংরেজি জানেন না, ভারতের নেতাদের সঙ্গে কী আলোচনা করবেন? দিল্লি থেকে ফেরার পথে খালেদা জিয়া কলকাতায় ঘণ্টা খানেক যাত্রাবিরতি করেন। মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বিমানবন্দরে গিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা ২০ মিনিট একান্তে কথা বলেন। বৈঠকের পর সাংবাদিকেরা জ্যোতি বসুকে ঘিরে ধরেন। তাঁরা জানতে চান, ‘কী কথা কইলেন? বাংলায়ই তো কইলেন? উনি তো ইংরেজি জানেন না।’ জ্যোতি বসু ছিলেন মুরব্বিস্থানীয় নেতা। তিনি ধমক দেন, ‘কী সব বাজে কথা বলো। তাঁর সঙ্গে তো আমার ইংরেজিতেই কথাবার্তা হলো। ভালোই ইংরেজি বলেন।’ এক বিখ্যাত দৈনিকের সাংবাদিক চুপ হয়ে যান। ওই দিন আমি কলকাতার কাছেই বারাকপুর গান্ধী ভবনে ছিলাম।
আদব-কায়দা, ভদ্রতা, সৌজন্য-শালীনতা প্রভৃতি মানবিক গুণ পেশা ও স্থান-কাল-পাত্রনির্বিশেষে সবার জন্যই এক। একজন অধ্যাপক, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, স্থপতি, ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, লেখক-কলামিস্ট-অভিনেতার জন্য একরকম আর একজন রাজনৈতিক নেতার জন্য অন্য রকম নয়। একজন ডাক্তার বা স্থপতি আরেকজন ডাক্তার বা স্থপতিকে, যিনি তাঁর পেশাগত প্রতিপক্ষ, তাঁকে অসুন্দর বা কুরুচিপূর্ণ ভাষায় নিন্দা করেন না। রাজনীতির বিতর্ক কিছুটা কড়াই হয়। কিন্তু তার মাত্রা কতটা? একজন রাজনীতিককে তাঁর প্রতিপক্ষকে অথবা ভিন্নমতাবলম্বীকে অশালীন ভাষায় গালমন্দ করার অধিকার কে দিয়েছে?
সন্তোষের এক বৃদ্ধ নেতাকে তালের টুপি মাথায় দিয়ে পল্টন ময়দানের জনসভায় বলতে শুনেছি, ‘ফেরেশতারা যদি আমার কাছে আসিয়া বলে তোমারে জান্নাতুল ফেরদৌসে (সর্বোচ্চ বেহেশত) নিয়া যাইতেছি, তবে ওই বেহেশতে আমেরিকার সরকারের দুই-একজন আছে, আমি তাদের বলব, ওই বেহেশতে আমি যাব না, যাব না, যাব না।’ মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির আমরাও অবিচল বিরোধী। কিন্তু সে দেশের কোনো রাষ্ট্রদূতকে আমার বাড়ির কাজের মেয়ের সঙ্গে তুলনা করা খুবই অনুচিত। তা ছাড়া, ওই কথায় রাষ্ট্রদূত মজীনা নন, মারাত্মক অপমান করা হয়েছে মর্জিনা নামের গৃহকর্মীকে শুধু নয়, মর্জিনা নামের দেশের সব নারীকে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত সে দেশের কোনো জুনিয়র মন্ত্রী দেখতে যদি রূপসী নাও হন, তা বলতে নেই এবং তাঁকে দু-আনার মন্ত্রী বলে তাচ্ছিল্য করা খুবই অশোভন।
এবং নিশা দেশাইয়ের পর্যায়ের কর্মকর্তার সঙ্গে বর্তমান সরকারের নেতারা অতীতে বহুবার বৈঠক করেছেন। নিশা দেশাই সম্পর্কে যে মন্তব্য করা হয়েছে, তা সাম্প্রদায়িকতাদুষ্ট ও বর্ণবাদী। বর্ণবাদ সারা বিশ্বে ধিক্কৃত।
খালেদা জিয়ার ছেলের মৃত্যুর পরে শেখ হাসিনা অবরুদ্ধ খালেদা জিয়ার গুলশানের কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ক্ষমতাসীন দলের প্রধান শুধু নন, দেশের প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী একটি প্রতিষ্ঠান। সংবাদমাধ্যম থেকে জানলাম, প্রধানমন্ত্রী যখন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের সামনে যান, তখন ওই ভবনের ভেতরে দলের সিনিয়র নেতারা কেউ কেউ ছিলেন। তাঁরা বেরিয়ে এসে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানিয়ে ভেতরে নিয়ে বসাতে পারতেন। এবং সেটাই করা ছিল তাঁদের ১০০ ভাগ সামাজিক ও দলীয় দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অসৌজন্য দেখিয়ে বিএনপির নেতারা এবং খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা অত্যন্ত নীচুতার পরিচয় দিয়েছেন। কাজটির জন্য ধিক্কার জানাই।
বিএনপির চেয়ারপারসন সভা-সমাবেশ করার অনুমতি না পেয়ে লাগাতার অবরোধ-হরতালের ডাক দিয়েছেন। ওই কর্মসূচিতে মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। মরছে মানুষ হানাহানিতে। অনেকে পেট্রলবোমায় পুড়ে। কেউ ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টারে। আর দেরি না করে দেশে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার আকুতি দেশবাসীর। খালেদা জিয়াকে কঠোর সমালোচনা করার অধিকার শুধু সরকারি দলের নয়, যেকোনো নাগরিকের আছে। কিন্তু সমালোচনার যে বাহন, সেই ভাষা ব্যবহারেরও একটা সীমা আছে। সমালোচনা ও পাল্টা সমালোচনা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির রীতি। অসুন্দর ভাষায় কাউকে গালাগাল দেওয়া আর গায়ে হাত তোলার মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
অর্থমন্ত্রী গাজীপুরে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, খালেদা স্টুপিড মহিলা, দেশ ধ্বংস করতে চায়। অন্যান্য নেতার ভাষাও খুবই কটু। ছেলেমেয়েরা যদি তাদের চাচা-মামা-ফুফু-খালাকে স্টুপিড বলে, তাদের দোষ দেওয়া যাবে না।
বর্তমানে দেশে যে একটি অস্বাভাবিক অবস্থা চলছে, তা কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁর অবসান চাইছেন। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাব্যবস্থা—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটা মীমাংসায় পৌঁছানো দরকার। আগেও এ–জাতীয় রাজনৈতিক সংঘাত-সংকটে বুদ্ধিজীবী নাগরিক সমাজ যা-ই বলা হোক—অনেকে উদ্যোগ নিয়েছেন। এবারও কয়েকজন নাগরিক রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির নেত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছেন আলোচনার মাধ্যমে দেশে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। যাঁরা ওই আবেদন করেছেন, তাঁদের ঢাল-তলোয়ার কিছুই নেই। তাঁরা যদি গভীর রাতে বন-জঙ্গলে গিয়ে বা গোপন আস্তানায় বসে কোনো ষড়যন্ত্র পাকিয়ে থাকেন, সংঘবদ্ধভাবে অথবা ব্যক্তিগতভাবে কেউ, গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে সরকার। কিন্তু যে ভাষায় গালাগাল দেওয়া হচ্ছে, তা খুবই দুঃখজনক। আমাদের সমাজটা ছোট। অনেকের সঙ্গেই অনেকের ব্যক্তিগত সম্পর্ক। অনবরতই দেখা হয়ে থাকে। সৌজন্য দূরে থাক, ন্যূনতম চক্ষুলজ্জা থাকবে না—তা কি হয়!
আমি যদি সরকারের পরামর্শদাতা হতাম, হতভাগ্য নাগরিকদের ওই উদ্যোগের কথা শুনে বলতাম: বেশ তো, আপনারা বলছেন, দেখি কী হয়। দরখাস্ত দিয়ে যান। অথবা বলতাম: আপনাদের প্রস্তাব এই-এই কারণে গ্রহণযোগ্য নয়। ল্যাঠা চুকে যেত। কিন্তু এভাবে বিষাক্ত বাণ নিক্ষেপ, তাতে নাগরিক উদ্যোক্তাদের যা-ই হোক, দেশের মানুষ কী ভাবছে? এ করে কী লাভ?
বাঙালির অন্যকে অপমান করার প্রতিভা সীমাহীন। কঠোর সমালোচনাও ভদ্র ভাষায় করা যায়। রাজনৈতিক নেতাদের পরামর্শ দেওয়া তো দূরের কথা, অনুরোধ করাও অপরাধ ও ধৃষ্টতার মধ্যে পড়ে। তবু করজোড়ে মিনতি করব, মানুষকে কম অপমান করুন। মানুষ আপনাদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দেবে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন