default-image

মতামতসুজনের সম্মেলনে সাবেক সিইসি শামসুল হুদা বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের নামে চলছে নির্বাচিত একনায়কতন্ত্র।’
এ কথাটি ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের আগেও সত্য ছিল। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন যদি হতো, তাহলেও এই মন্তব্যে অসার বা অমূলক হয়ে যেত না। আরেকটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে এই একনায়কতন্ত্র বদলে যাওয়ার কোনো আলামত নেই। যেসব মুখ্য কারণ মানুষকে নির্বাচন ও বিএনপির আন্দোলন সম্পর্কে ভাবলেশহীন করেছে, এটা তার অন্যতম।
তবে আমরা মনে করি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রধান চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক শূন্যতা ও রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতা। সাম্প্রতিক কালে রাজনীতিতে এত বড় ভারসাম্যহীনতা দেখা যায়নি। আইনের শাসন ও জনপ্রশাসনে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার জন্য এই ভারসাম্যহীনতা বিরাট অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। আর সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে আছে ক্ষমতাসীন দলের গণতন্ত্রায়ণ। দলটি আর কিছুতেই অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা করতে পারছে না। ফলে শূন্যতা পূরণে তারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করছে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে অযোগ্যতা ও অদক্ষতা এখন দুর্নীতির চেয়ে জনস্বার্থের জন্য বহুগুণ বেশি ক্ষতিকর ভূমিকা রাখছে। এখনই হিসাব করে দেখতে হবে যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অরাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার মাধ্যমে তারা নিজেদের কতটা বেশি নিরাপদ করতে পেরেছে।
জনপ্রশাসন চালাতে গেলে রাজনৈতিক বা বহুদলীয় ভারসাম্য লাগে। প্রশাসনের কিছু লোক আওয়ামী লীগ এবং কিছু লোক বিএনপি করবে। এটা কোনো লুকোছাপার বিষয় থাকবে না। অথচ বাস্তবে এই রাজনৈতিক মতামতের জন্য পুরস্কার বা তিরস্কারের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু তার চেয়ে জনস্বার্থের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে যদি ‘দলীয় অানুগত্য বা বিশ্বস্ততা’ এবং ‘ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা’র মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করা সম্ভব না হয়। বর্তমানে যা চলছে তাকে দলীয়করণ এমনকি ‘পার্টিয়ার্কি’ বা দলতন্ত্র দিয়ে বর্ণনা করা চলে না।
‘দলীয় নিয়ন্ত্রণ’ কথাটির মধ্যে একটি সমষ্টিগত চিন্তার প্রতিফলন ঘটে। কিন্তু ব্যক্তিতন্ত্র বা দলতন্ত্র এ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। নারায়ণগঞ্জে বা এমন অনেক নির্দিষ্ট এলাকায় পেশিশক্তিনির্ভর অর্থনৈিতক কর্মকাণ্ড চলছে। আওয়ামী লীগ চাইলেই এসব চিত্র পাল্টে দিতে পারে না। অনেকের মতে, আমলাতন্ত্রের চাপে আওয়ামী লীগ স্বকীয়তা হারাচ্ছে। একজন কনিষ্ঠ মন্ত্রী আলাপ প্রসঙ্গে আমাকে বললেন, নেত্রী নিরাপত্তার ঘেরাটোপে বন্দী। তাঁর কাছে ঘেঁষা ক্রমেই দুরূহ হয়ে উঠেছে।
সরকার পরিচালনায় দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কতগুলো নীতিনির্ধারণী সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত এ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছে, তার তালিকা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। রাজনৈতিক শূন্যতা বা বিরাজনৈতিকীকরণের সুযোগে আমলাতন্ত্র সবকিছু দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আওয়ামী লীগ সর্বশেষ গাজীপুরেও রাজনৈিতকভাবে বিএনপিকে মোকাবিলা করতে পারেনি। তারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে যত বেশি ব্যবহার করবে, ততই আওয়ামী লীগের ক্ষয় বাড়বে। আর ভয়াবহভাবে দুর্নীতির পাশাপাশি অদক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।
শিশু জিহাদের উদ্ধার-তৎপরতা দেশবাসীকে সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। পাইপের ভেতরে মানুষের চিহ্নমাত্র না থাকার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণা কুয়াশায় মিলিয়ে না যেতেই জিহাদের নিথর দেহ খুঁজে পেল স্বেচ্ছাসেবীরা। এই ব্যর্থতা আমাদের রানা প্লাজা ধসের কারণ হিসেবে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘নাড়াচাড়া’ তত্ত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তখনো কিন্তু স্বেচ্ছাসেবীরাই অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
কোনো গণতান্ত্রিক দল তার নিজের অস্তিত্ব শক্তিশালী করতে গিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পদ্ধতিগতভাবে দুর্বল করার নীতি গ্রহণ করতে পারে না। এটা বুমেরাং হতে বাধ্য। বিরোধী দল ধ্বংস মানে রাজনৈিতক প্রক্রিয়া ধ্বংস করা। মগডালে বসে গাছ থেকে ডাল কেটে ফেলার শামিল। ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে না বলে সোজাসাপ্টা বললে দাঁড়ায়, বিএনপি ধ্বংস মানে আওয়ামী লীগকেও ধ্বংস করা। আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্র ও বহুদলীয় গণতন্ত্রে না পোষালে অন্য রাজনৈতিক বিকল্প নিয়ে কথা বলতে হবে। কিন্তু কোনো বিচারেই বিএনপিকে জনসভা করতে না দেওয়ার নীতি অনুসরণ করা যাবে না। প্রয়োজনে বঙ্গবন্ধুসহ প্রয়াত নেতাদের নিয়ে কটূক্তি বন্ধে আইন হতে পারে।
গণতন্ত্রের প্রধান হুমকি কী? ক্ষমতাসীন দল যদি তার ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকে বেপরোয়াভাবে কাবু করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে।
৫ জানুয়ারি বিএনপি হয়তো তেমন কিছুই করতে পারবে না। কারণ, তারা সাংগঠনিকভাবে দুর্বল। গাজীপুরে জনসভার কর্মসূচি পরিত্যাগ করেও তারা সেই ছাপ রেখেছে। এর অর্থ এই নয় যে বিএনপিকে ন্যুব্জ করতে হবে। কোনো গণতান্ত্রিক দলের শক্তি অর্জনের মাপকাঠি হলো, ক্ষমতার বাইরে থাকতেও তারা ন্যূনতম মর্যাদার সঙ্গে বিরোধী দলের মর্যাদা ভোগ করতে পারে কি না। আরেকটি মাপকাঠি হলো একই মাত্রায় বা কাছাকাছি মর্যাদাসম্পন্ন একাধিক নেতার সহাবস্থান নিশ্চিত করা। একই দলে সমমানের একাধিক নেতার ঘাটতি থাকা সুলক্ষণ নয়।
সাবেক সিইসি শামসুল হুদা বলেছেন, নির্বাচন বর্জন করে কোনো দল কখনো লাভবান হতে পারেনি। এই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে হিসাবনিকাশ নিশ্চয়ই উল্টে যেতে পারে। আর তখন কি আমরা তাহলে প্রতিহিংসার বদলা নেওয়ার ‘নির্বাচিত গণতন্ত্র’ দেখব?
বিজয় দিবসে আমরা অনেক অর্জনের কথা বলেছি। সেসব সত্য। কিন্তু একটি অপ্রিয় সত্য স্বীকার করতে হবে যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া আবারও ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে ফিরে গেছে কি না। সত্তরের আগের পাকিস্তানের বড় সংকট ছিল সমগ্র পাকিস্তানে কোনো একটিও সাধারণ নির্বাচন করতে না পারা। পাকিস্তান লুই কানের স্থাপত্যের মতো অনেক বিস্ময়কর উন্নয়ন কীর্তি দেখেছে কিন্তু সমগ্র পাকিস্তানের মানুষের অংশগ্রহণে একটি সাধারণ নির্বাচনও দেখেনি। ড. আকবর আলি খানের সঙ্গে আমরা একমত যে বিতর্কিত বিষয়ে গণভোট দরকার। মানুষকে ভোটের স্বাদ পেতে দিন। দেশ পরিচালনায় মানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করুন। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুতে গণভোট হতে পারে।
বিশ্বের দুই বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশে দুই প্রধান ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল দল বিরোধী দল হিসেবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় টিকে আছে। একটি ভারতের কংগ্রেস, অন্যটি ব্রিটেনের লেবার পার্টি। বিরোধী দলে তাদের বর্তমান সম্মানজনক অবস্থান তারা কিন্তু ক্ষমতায় থাকতেই সৃষ্টি করে রেখেছে। ক্ষমতায় থাকতে তারা তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে এমন আচরণ করেনি, যাতে ক্ষমতা হারানোর পরে তাদের প্রবাসে জীবন কাটাতে হয়। পাকিস্তান ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরে এটা ঘটে।
বিএনপিও কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতার মনোভাব দেখাচ্ছে না। তারা যেন অফেন্স ইজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স খেলছে। সরকার কতটা নির্দয় ও অগণতান্ত্রিক, সেটা প্রমাণ করা নিশ্চয় তাদের রাজনীতির মধ্যে পড়ে। কিন্তু সরকারি দলের ব্যর্থতা চিহ্নিত করাসর্বস্ব রাজনীতি থেকে তাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ঘৃণার জবাবে ঘৃণা ছড়ানোর রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। বঙ্গবন্ধুকে তারেক রহমানের রাজাকার বলার মধ্যে ঘৃণা উপচে পড়ছে। আওয়ামী লীগও জিয়াকে সমীহ করে কথা বলতে অপারগ। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বলব, দয়া করে তারেকের এই অমার্জনীয় বক্তব্যকে ‘বইপুস্তকের আলোকে ইতিহাস চর্চা’ বলে লোক হাসাবেন না। তারেক রহমানের ওই উক্তির চেয়ে মির্জার এই মনোভাব অধিকতর বিপজ্জনক।
ছয় বছরের শাসনামলে বিডিআর বিদ্রোহের মতো মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ ছাড়া শেখ হাসিনাকে তেমন বড় দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়নি। ৫ জানুয়ারির মতো তারিখ আরও আসবে। আওয়ামী লীগের মতো বিএনপি দেশ অচল করে দিতে না পারলেও সেটি রাজনৈতিক যোগ্যতার মাপকাঠি হতে পারে না। দেখতে হবে তাদের দাবিটি ন্যায্য কি না। ছাত্রলীগ নেতার কণ্ঠে বিএনপিকে নেড়ি কুত্তার মতো পেটানোর প্রকাশ্য ঘোষণা এবং সে জন্য দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের কারও ভর্ৎসনা করতে না পারা আওয়ামী লীগের জন্যই বিরাট অশনিসংকেত। সরকার বিরোধী দলকে দমন করতে তৎপরতা দেখালেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণের কোনো চেষ্টাই করেনি।
তবে আশাবাদ এই যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের দুর্বলতার বিষয়টি বিস্মৃত হননি। কিছুদিন আগেও সংসদকে ‘মন্দের-ভালো’ বলেছেন। এই পলায়নপর মনোভাব নিয়েও আমরা চলতে পারি। তবে বর্তমান ‘নির্বাচিত একনায়কতন্ত্র’ সম্ভবত ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে চলেছে। অপেক্ষাকৃত বেশি সুশাসন ও সহিষ্ণুতা দিয়ে তার দুর্বলতার ঘাটতি পূরণ করতে হবে, বিরোধী দলকে পর্যুদস্ত করে নয়।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
[email protected]

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন