বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমার মনে আছে, ঠিক এ রকম একটি প্রসঙ্গ নিয়ে লিখেছিলাম ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে রাষ্ট্রপতির সংলাপের সময়ও। তখন এই সংলাপ আশাবাদ সৃষ্টি করেছিল। ভাবা হয়েছিল, ২০১৪ সালের নির্বাচনের কালিমা কাটানোর লক্ষ্যে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনে ভূমিকা রাখবে এই সংলাপ। এর পরের ইতিহাস আমাদের জানা আছে। এই সংলাপের মধ্য দিয়ে গঠিত প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সার্চ কমিটি নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের নাম প্রস্তাব করেছিল। নিদারুণভাবে অকর্মণ্য ও দায়িত্বহীন সেই নির্বাচন কমিশনের আমলে বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এমনকি স্থানীয় নির্বাচনগুলোতেও এখন প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীর সরে যেতে ও এলাকার জনগণকে ভুয়া ভোট দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির সংলাপে তাহলে আশাবাদের কিছু আছে কি? বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে অচিরেই। বিদায়বেলায় তিনি কি একটি দায়িত্বশীল সার্চ কমিটি গঠনের লক্ষ্যে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবেন? সেই সুযোগ কি আছে ওনার? শুধু নির্বাচন কমিশন গঠনসংক্রান্ত বিষয় নয়, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে কিছু করার ক্ষমতাই–বা ওনার কতটুকু?

সুষ্ঠু নির্বাচনের অসীম গুরুত্ব দেশের মানুষ উপলব্ধি করেছিল নানান সময়ে। নির্বাচনের রায় অগ্রাহ্য করার কারণে এই দেশের মানুষ স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ঠিক এ কারণেই বাংলাদেশে ১৯৯০, ১৯৯৬ এবং ২০০৮ সালে রাজনৈতিক পর্যায়ে ব্যাপক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সুষ্ঠু নির্বাচনের গুরুত্ব বর্তমানেও কমে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।

২.

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান, কিন্তু সরকারপ্রধান নন। সংসদীয় সরকারব্যবস্থার এই মডেল অন্য বহু দেশের মতো হলেও তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কম। যেমন ভারতের সংবিধানে রাষ্ট্রপতি কাজ করবেন মন্ত্রিপরিষদের পরামর্শ অনুসারে, কিন্তু এটিকে পুনর্বিবেচনা করতে বলার অধিকার তাঁকে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে এই অধিকার দেওয়া হয়নি, এখানে তাঁকে কাজ করতে হয় শুধু একজন অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে। ভারতের উচ্চ আদালতে রাষ্ট্রপতি বা সাংবিধানিক প্রধানের ক্ষমতার যে সম্প্রসারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে (যেমন মধ্যপ্রদেশ স্পেশাল পুলিশ এস্টাবলিশমেন্ট মামলা) বাংলাদেশে তা–ও হয়নি। বাংলাদেশের দু–একটি মামলায় বরং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে আরও সংকীর্ণভাবে দেখা হয়েছে বলে মনে হতে পারে (যেমন বাংলাদেশ বনাম মো. হাবিবুর রহমান)।

এত সীমাবদ্ধতার পরও রাষ্ট্রপতির যে ক্ষমতা রয়েছে, তা প্রয়োগ করে অনেক কিছু করা সম্ভব। যেমন সংবিধান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করার ক্ষমতা দিয়েছে। তিনি স্বাধীনভাবে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করে প্রধান বিচারপতি পদে একজন সুযোগ্য, ব্যক্তিত্ববান ও স্বাধীনচেতা ব্যক্তিকে নিয়োগ দিলে তাঁর পক্ষে বিচার বিভাগকে সুচারুভাবে পরিচালনা করে দেশে আইনের শাসন ও মানবাধিকার পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। এমন একটি বিচারব্যবস্থা এমনকি নির্বাচনের শুদ্ধতা ও সরকারের বৈধতার বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবিধানের ৪৮(৫) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। সেখানে বলা আছে যে রাষ্ট্রপতি অনুরোধ করলে যেকোনো বিষয় মন্ত্রিসভায় বিবেচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী পেশ করবেন। ঠিক এই বিধান অনুসারেই বর্তমান নির্বাচন কমিশনসংক্রান্ত বিষয়ে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা পালনের অবকাশ রয়েছে বলে আমি ২০১৬ সালের লেখায় লিখেছিলাম। গতকালের একটি বিবৃতিতে দেশের কয়েকজন নাগরিক এই অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতিকে শুধু নির্বাচন নয়, আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভূমিকা রাখার অনুরোধ করেছেন। তিনি চাইলে অবশ্যই তা করা সম্ভব।

রাষ্ট্রপতি এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে আলোচনা করছেন। আলোচনা সমাপ্ত হলে তাঁর পক্ষ থেকে যে বিষয়গুলো যৌক্তিক মনে হয়, সেগুলো অনুসারে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়টি তিনি মন্ত্রিসভায় আলোচনা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে বলতে পারেন। তিনি বিষয়টি তাঁর দপ্তরের মাধ্যমে দেশের মানুষকেও জানাতে পারেন, কোনো আইনেই এটি করার ক্ষেত্রে বাধা নেই।

অতীতে নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ঠিক কী চেয়েছিলেন, তা আগেই সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে তিনি যেভাবে ও যাঁদের নিয়ে সার্চ কমিটি গঠন করতে বলেছিলেন, তা যে পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি, তা সবাই জানতে পেরেছিল।

রাষ্ট্রপতির নির্দেশ, তাই বলে প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রিসভা মানতে বাধ্য নন। হতে পারে তাঁর পরামর্শের বিচ্যুতি ঘটিয়েই সরকার নির্বাচন কমিশন বা এটি গঠনের জন্য সার্চ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু তিনি জনগণকে জানিয়ে কোনো পরামর্শ দিলে, সেটি বিবেচনা করার নৈতিক দায়দায়িত্ব সৃষ্টি হয়। এর গুরুত্ব কম নয়।

নির্বাচন নিয়ে দেশে যে নৈরাজ্য চলছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে এটি মানুষের মনে কিছুটা হলেও আশাবাদ তৈরি করতে পারে।

৩.

সুষ্ঠু নির্বাচনের অসীম গুরুত্ব দেশের মানুষ উপলব্ধি করেছিল নানান সময়ে। নির্বাচনের রায় অগ্রাহ্য করার কারণে এই দেশের মানুষ স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ঠিক এ কারণেই বাংলাদেশে ১৯৯০, ১৯৯৬ এবং ২০০৮ সালে রাজনৈতিক পর্যায়ে ব্যাপক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সুষ্ঠু নির্বাচনের গুরুত্ব বর্তমানেও কমে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।

আজকাল অবশ্য কাউকে কাউকে বলতে শুনি, নির্বাচনই সবকিছু নাকি! বিরোধী দল সংসদে না গেলে, দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন না করলে, সরকার সুশাসন না দিলে সুষ্ঠু নির্বাচনে কী লাভ। এ ধরনের ব্যাখ্যা সুষ্ঠু নির্বাচনের উপযোগিতাকে আড়াল করার চেষ্টা কিনা জানি না! তবে এসব যুক্তি সামরিক শাসন, স্বৈরতন্ত্র বা ফ্যাসিজমের জন্য সহায়ক, ভালো কিছুর জন্য নয়।

সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ক্ষমতাসীন দলের হেরে যাওয়ার ভয় থাকে। হেরে যাওয়ার পর মামলা ও হয়রানির ভয় থাকে, তাদের অপকর্মের ব্যাপক প্রচারের আশঙ্কা থাকে। এ কারণে ক্ষমতাসীনেরা তখন কিছুটা হলেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখেন, অপকর্ম কিছুটা হলেও রেখেঢেকে করেন। ভুয়া নির্বাচনে ক্ষমতায় থাকা সুনিশ্চিত হয়ে গেলে সেই ভয়ও থাকে না, অপকর্ম, অন্যায় ও নিপীড়ন হয়ে ওঠে লাগামহীন।

সুষ্ঠু নির্বাচনে বিজয় আসে জনগণের সমর্থনে। ফলে যিনি নির্বাচিত হন, তাঁর জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ ও দায়বদ্ধতা থাকে। ভুয়া নির্বাচনে বিজয় আসে সন্ত্রাসীদের হুমকিতে, পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তায়। ফলে এই নির্বাচনে বিজয়ীরা শুধু তাদের সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করেন। সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠে প্রভাবশালীদের নিপীড়নের শিকার।

শুধু এসব কারণে হলেও সুষ্ঠু নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি আমাদের রাষ্ট্রপতির না জানার কথা নয়। যে গণপরিষদ আমাদের সংবিধান রচনা করেছিল, তিনি তার সক্রিয় সদস্য ছিলেন। সেখানে নির্বাচন বলতে সুষ্ঠু নির্বাচনকে বোঝানো হয়েছে, জনগণের ভোটাধিকারকে বোঝানো হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এরপর জনগণের প্রতিটি সংগ্রামেও বর্তমান রাষ্ট্রপতি ছিলেন নেতৃত্বের অবস্থানে।

সুষ্ঠু নির্বাচন দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রত্যাশিত ভূমিকা তিনি রাখবেন—এই প্রত্যাশা ওনার কাছে করা যেতে পারে।

আসিফ নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন