বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কেবল উড়ালসড়ক নয়, আমাদের দেশে গ্রামীণ সড়ক-সেতু থেকে শুরু করে মহাসড়ক, বসতবাটি থেকে সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা নির্মাণে নানা ত্রুটি দেখা যায়। কখনো নকশায় ত্রুটি, কখনো নির্মাণকাজে। আবার এসব নির্মাণপ্রক্রিয়ার সঙ্গে একাধিক সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকলে একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে নিজেকে দায়মুক্ত রাখার চেষ্টা করে।

আমাদের দেশে কোথায় ফাটল নেই? এই যে আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে গৃহহীন দরিদ্র মানুষের জন্য ঘর তৈরি করে দিল সরকার, হস্তান্তরের আগেই পত্রিকায় সচিত্র খবর এল, অনেক ঘরে ফাটল দেখা দিয়েছে। সাতক্ষীরার এক উপজেলায় ফাটল ধরা ঘরের চিহ্ন মুছে ফেলতে দায়িত্বপ্রাপ্তরা পুরো প্রকল্পটিই মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে গৃহহীনদের জন্য নতুন ঘর তৈরির পরিকল্পনা নিলেন।

কয়েক দিন আগে পাটুরিয়া ঘাটে আমানত শাহ নামে যে একটি ফেরি ডুবে গেল, তা–ও কিন্তু ফাটলের কারণে। মেয়াদোত্তীর্ণ ফেরিটি অতিরিক্ত ভার বহন করতে গিয়ে পাটাতন ফেটে পানি উঠে ডুবে যায়। এসব ফেরির মেয়াদ থাকে ৩৩ বছর। আমানত শাহর বয়স ৪০ বছরের বেশি। উড়ালসেতু ও জলপথ থেকে সড়কে এলে আমরা কী দেখি? জালের মতো ছড়িয়ে থাকা আমাদের সড়ক-মহাসড়কগুলো পিচঢালাই না করতেই খানাখন্দ সৃষ্টি হয়। গাজীপুরের ব্যবসায়ীরা সড়ক সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন কয়েক দিন আগে। প্রতিবছর বাজেটে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয় সড়ক-সেতু ও স্থাপনা মেরামতের কাজে। অনেকে ঠাট্টা করে বলেন, যত বেশি সংস্কার, তত বেশি কমিশন, তত বেশি ঠিকাদারের লাভ।

আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে যে ভয়ংকর ফাটল দেখা দিয়েছে, তা দূর করার উপায় কী? এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগ খুব একটা কাজে আসবে না। এর জন্য বিভেদের বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে এসে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। আমি ভালো থাকি, তুমিও ভালো থাকো নীতি নিয়ে অনুসরণ করতে হবে ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় জীবনে।

কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে যে ফাটল দেখা দিয়েছে, তা মেরামতের উপায় কী? সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির, ঘরবাড়িতে যে সহিংস হামলা হলো, তার পেছনেও আছে ওই সামাজিক ফাটল। একজন মুসলমান যুবক একটি পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন রেখে এলে তাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের অপরাধ কোথায়? ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তো হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছ থেকেই আসার কথা। কিন্তু হামলা হলো সংখ্যালঘুদের ওপরই। এই সামাজিক ফাটলটি এমনই প্রকট যে সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী কতিপয় দুর্বৃত্ত এই অপকর্ম করলেও প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা পুলিশ র‌্যাব, বিজিবি নামিয়েও তাদের নিবৃত্ত করা গেল না। সবকিছু ঘটে যাওয়ার পর সরকারি ও বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরাও মাঠে নামলেন। যতবার সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে, তত বেশি তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ের সন্দেহ-অবিশ্বাস বাড়ে; সামাজিক ফাটলটি আরও প্রশস্ত হয়।

বাংলাদেশে সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে যে ফাটল তৈরি হয়েছে, তা নয়। রাজনৈতিকভাবেও আমরা নানা দলে–উপদলে বিভক্ত। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ফাটলটা হয়তো বেশি চোখে পড়ে। এবারের ইউপি নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। তাই তাদের মধ্যকার ফাটলটি দৃশ্যমান নয়। আওয়ামী লীগ পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাটি নিজের করায়ত্তে এনেও শতকরা ৯৮টি পদে জিতেও নিজেদের মধ্যকার ফাটলটি ঘোচাতে পারেনি। মন্ত্রীর বিরুদ্ধে সাংসদ, সাংসদের বিরুদ্ধে উপজেলা চেয়ারম্যান বা পৌরসভার মেয়র। আবার তাঁদের বিরুদ্ধে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা। সবাই নিজের পাল্লা ভারী করতে ব্যস্ত। আখের গোছাতে মরিয়া। দলের কথা, নীতি–আদর্শের কথা কেউ ভাবেন না।

বাংলাদেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ বাংলা ভাষাভাষী। নৃতাত্ত্বিক পরিচয়েও তারা অভিন্ন। ধর্মীয় পরিচয়ে ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলমান। বাকি যে ১০ শতাংশ মানুষ অন্যান্য ধর্মের অনুসারী, তারা নিজেরা কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে না। ন্যায্য অধিকারটুকু চায়। তারপরও ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান, সংগঠন—সবখানেই কেন ফাটল তার কারণ খুঁজে বের করা দরকার।

সম্প্রতি একটি মামলার ঘটনায় আদালত, উচ্চ আদালত দুটি পরিবারের মধ্যকার ফাটল মেরামতের চেষ্টা করেছেন। পারিবারিক ফাটলের কারণে বাঙালি স্বামী দুই সন্তানকে নিয়ে জাপান থেকে বাংলাদেশে চলে এসেছিলেন স্ত্রীকে না জানিয়ে। সন্তানের সন্ধানে জাপানি নারী ঢাকায় এসে মায়ের অধিকার ফিরে পেতে উচ্চ আদালতে মামলা করেন। এই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত নির্দেশ দেন, স্বামী ও স্ত্রী ভাগাভাগি করে সন্তানদের নিজেদের কাছে রাখতে পারবেন। তবে স্ত্রী বেশি সময় পাবেন। অপর মামলাটি করেছেন এক নারী তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে, যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগে। এ কারণে স্বামী চাকরিও হারান। এরপর ওই ব্যক্তি উচ্চ আদালতে স্ত্রীর ওপর নির্যাতন করবেন না বলে অঙ্গীকার করেন। তিনি ১০ শতাংশ জমিও স্ত্রীর নামে লিখে দেন। আদালত তাঁর আবেদন গ্রহণ করে তাঁদের সুখে–শান্তিতে থাকার পরামর্শ দেন। সেই সঙ্গে তিনি চাকরিও ফেরত পাবেন।

আদালতের রায়ে কিংবা হস্তক্ষেপে হয়তো পরিবারের ফাটল দূর করা যায়। বন্ধু–স্বজনদের মধ্যস্থতায় স্বামী-স্ত্রীর কিংবা প্রেমিক–প্রেমিকার ঝগড়া মিটিয়ে ফেলা যায়। এর বহু উদাহরণ আমাদের চারপাশে আছে।

কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে যে ভয়ংকর ফাটল দেখা দিয়েছে, তা দূর করার উপায় কী? এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগ খুব একটা কাজে আসবে না। এর জন্য বিভেদের বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে এসে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। আমি ভালো থাকি, তুমিও ভালো থাকো নীতি নিয়ে অনুসরণ করতে হবে ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় জীবনে। একাত্তরে আমরা জাতিগতভাবে ঐক্যবদ্ধ ছিলাম বলে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি। এরপরই ফাটল শুরু হয়। আমরা প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে, চীনসহ সারা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে চাই। কিন্তু দেশের ভেতরে, সমাজের অভ্যন্তরে যে মস্ত বড় ফাটল ধরেছে, তা মেরামত করার কথা ভাবি না। আমরা মুখে জাতীয় ঐক্যের কথা বলি, কিন্তু কাজ করি সেই ঐক্যের বিরুদ্ধে।

২০১৮ সালে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে এসেছিল নিরাপদ সড়কের দাবিতে। সে সময় তারা একটি স্লোগান দিয়েছিল, ‘রাষ্ট্রের মেরামতকাজ চলছে।’ কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, রাষ্ট্রের ও সমাজের মেরামতকাজটি একেবারই হচ্ছে না। সবাই অপরের মুখ ম্লান করে দিয়ে নিজের জয় ছিনিয়ে নিতে চাইছে। এ অবস্থায় ফাটল মেরামত করতে আবারও কোনো দিন তরুণদেরই মাঠে নামতে হবে। দেশের উপেক্ষিত জনগণ সেই দিনের অপেক্ষায় আছে।

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন