পাশাপাশি অনেক গর্হিত কাজও করেছে এই প্রজন্ম। এরাই স্রেব্রেনিতসা আর রুয়ান্ডা ঘটিয়েছে, দুর্নীতিতে নিমজ্জিত করেছে বিশ্বকে, মিথ্যা অজুহাতে দেশ আক্রমণ করেছে, ‘কোল্যাটেরাল ড্যামেজ’ ঘটিয়েছে আবাসিক এলাকায় গুচ্ছবোমা ছুড়ে। তবে সবচেয়ে খারাপ যে কাজ এই প্রজন্ম করেছে এবং করে যাচ্ছে এখনো, তা হলো প্রকৃতিকে বিনাশ করা।

আজ যা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, স্বাধীনতার আগে এটা ছিল রেসকোর্স, ঘোড়দৌড় হতো এখানে। ৭ মার্চের সেই যুগান্তকারী জনসভা হয়েছিল রেসকোর্স মাঠেই। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত নিলেন ঘোড়দৌড় থাকবে না বাংলাদেশে। গাছ লাগানো হলো অনেক, ঘাসে ঢাকা সবুজও অনেক থাকল, আর থাকল কিছু ফুলের বেড। গাছগুলো বেড়ে উঠলে আস্তে আস্তে, আর অপরিকল্পিত ঢাকার এক সুন্দরতম স্থানে পরিণত হলো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। এর উত্তর-পশ্চিম কোনার খানিক অংশ চলে গেল পুলিশ নিয়ন্ত্রণকক্ষ বানাতে, আরও কিছুটা গেল শিশুপার্ক বানাতে। তারপরও যা রইল, রমনা পার্ককে সঙ্গে নিয়ে শহরের মধ্যভাগের ফুসফুসে পরিণত হলো বৃক্ষশোভিত এই উদ্যান। লাল ইটের হাঁটাপথ স্বাস্থ্যসচেতনদের (বা ডায়াবেটিস রোগীদের) সকাল-বিকেল হাঁটার জন্য দিল অবারিত সুযোগ।

আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছিল আমাদের নিয়মিত গন্তব্য। এসএম হল বা মুহসিন হল থেকে বেরিয়ে টিএসসির পাশের গেট দিয়ে ঢুকে পড়লেই হলো। কয়েকজন একসঙ্গে গোল হয়ে বসতাম নরম ঘাসের ওপর, অন্য কোনো গ্রুপ থেকে ‘সামাজিক’ দূরত্ব বজায় রেখে। কারও হয়তো রোকেয়া হলনিবাসী কোনো বান্ধবীও যোগ দিত কখনো, আড্ডায় তাতে বৈচিত্র্য আসত আরও। শীতের দিনে কোনো দিন যদি দুপুরের পর ক্লাস থাকত, ক্লাস শেষে শরীফ মিয়া বা পেড্রোর দোকানে চা খেয়ে সোজা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। গল্পগুজব সেরে একবারেই হলে ফেরা। হলে থাকত না যে বন্ধুরা, তাদের জন্য এটাই ছিল সুবিধাজনক। আমাদের বেশির ভাগেরই রিকশাভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। তাই রমনা পার্ক বা ওদিকে আরও দূরে কোথাও যেতে হলে টিএসসির পাশের গেট দিয়ে ঢুকে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেলে পথ কমে যেত অনেক।

এরশাদের আমলে হরতাল যখন নৈমিত্তিক ঘটনা, অফিসে হাজিরা তখন নিরীক্ষা করা হতো। আর তখন হরতাল মানে হরতাল। কিছু রিকশা ছাড়া কোনো যানবাহন পথে বের হতো না, সরকারি যানবাহনও না। আমরা তখন চাকরি করি। অফিসে পৌঁছাতে হবে যে করেই হোক। শাহবাগ পর্যন্ত যদি রিকশা পেতাম তো এরপর জাদুঘরের উল্টোপাশে অবস্থিত ছোট একটা প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকে পড়তাম উদ্যানে, বের হতাম যথারীতি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের পাশ দিয়ে। সকালের এই সবুজে বিচরণ হাঁটার ক্লান্তি দূর করে দিত অনেকটাই।

স্বাধীনতা স্তম্ভ হলো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। স্তম্ভ বানাতে খুব বেশি জায়গা লাগার কথা নয়। কিন্তু উদ্যানের প্রায় অর্ধেক জায়গা বেড়ার ভেতর পড়ে গেল প্রায় অনন্তকালের জন্য। স্তম্ভের কাজও সহজে শেষ হয় না, বেড়াও আর সরে না। অবশেষে কাজ শেষে বেড়া সরেছে, স্তম্ভের আশপাশে সবুজও আছে বেশ। এর মধ্যে আমার বাসা সরে গেছে অন্যদিকে, দেশের বাইরেও ছিলাম সরকারি দায়িত্বে, তাই বহুদিন যাওয়া হয়নি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। বছর আড়াই আগে টিএসসিতে ইতিহাস বিভাগের পুনর্মিলনীতে যোগ দিয়ে উদ্যানে ঢুকে পড়লাম বিকেলে। পরিচিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে খোঁজার চেষ্টা করলাম, নেই সে কোথাও। ইট-পাথরের ‘উন্নয়ন’-এর ধাক্কায় সে হারিয়ে গেছে। ইটের দেয়াল, গ্যালারির গোলকধাঁধা পার হয়ে রমনা পার্কের দিকে বেরোনোর পথ খুঁজে পেতে কষ্ট হলো অনেক।

সেদিন পত্রিকায় দেখলাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছ কাটা হচ্ছে রেস্তোরাঁ আর গাড়ি পার্কিং বানাতে! পরিবেশবাদীরা চেঁচামেচি জুড়েছেন, তাই কাজ আপাতত বন্ধ আছে। কত দিন বন্ধ রাখা যাবে, তা অবশ্য অনিশ্চিত। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এ ধরনের অপকর্ম শেষ অবধি ঠেকানো যায় না প্রায়ই। এক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন, কোনো চিন্তা করবেন না, যা কাটা হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি গাছ লাগানো হবে। তা কোথায় লাগাবেন গাছ? শুনলাম সাতটা রেস্তোরাঁ হবে ৫০ হাজার অতিথির জন্য! আর সেটা প্রায় সারা উদ্যানে।

বস্তুত এই পরিমাণ মানুষ যদি খেতে আসে এখানে, এরপর এর বাইরের আর কোনো মানুষ এখানে ঢোকার জায়গা পাবে না। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সত্যিকার অর্থে একটি ফুড কোর্টে পরিণত (বা পর্যবসিত) হবে। বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করতে চাই, যুক্তি দিয়ে কি কর্তারা বোঝাতে পারবেন, কেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সবুজ সরিয়ে সেখানে রেস্তোরাঁ আর গাড়ি পার্কিং বানাতে হবে? লাঞ্চ, ডিনার বা পার্টি করার জন্য কেন এই উদ্যানকেই বেছে নিতে হবে? ঢাকা শহরে কি রেস্তোরাঁর অভাব পড়েছে? নাকি আমাদের শহরে পার্ক, উদ্যান এত বেশি যে তা কিছুটা কমে গেলেও কোনো ক্ষতি নেই?

ইট, কাঠ, পাথরে নগরের সৌন্দর্য বা বাসযোগ্যতা বাড়ে না, বাড়ে সবুজে। অরণ্যে রোদন হয়তো, তবু অনুরোধ করছি, যেটুকু অবশিষ্ট আছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের, তাকে সে রকমই থাকতে দিন, এই ভয়ংকর প্রকল্প বন্ধ করুন। জানি, প্রতিটি অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বড় বড় আর্থিক স্বার্থ জড়িত থাকে। এই শহর খানিকটা বাসযোগ্য করতে নিতান্ত প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই করার আছে। প্রকল্পগুলো না হয় সেসব নিয়েই করুন। আর্থিক স্বার্থ তো সেখানেও হাসিল করা যায়।

মো. তৌহিদ হোসেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব