default-image

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের দ্বিতীয় প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমেই রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবনযাপন এবং তাদের অবস্থার বিষয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। বাংলাদেশেও এখন আলোচনার কেন্দ্রে ফিরে এসেছে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ। ২২ আগস্ট এই ব্যর্থ প্রত্যাবাসনের প্রচেষ্টা এবং এই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ তিনটি বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে। এগুলোর অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক দ্যোতনা বা ইমপ্লিকেশন আছে, এগুলোর প্রভাব ভবিষ্যতে আরও বেশি অনুভূত হবে। তিনটি বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যর্থতা, রোহিঙ্গাদের সাংগঠনিক শক্তির উদ্ভব এবং বাংলাদেশে উগ্র যুধ্যমান বিদেশিভীতি (বেলিজারেন্ট জেনোফোবিয়া) তৈরি। 

মিয়ানমার কর্তৃক রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ‘জাতিগত নিধনের’ সর্বশেষ পর্যায়ের সূচনার দ্বিতীয় বার্ষিকীতে যেভাবে ঘটা করে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, তা অবশ্যম্ভাবী পরিণতিই বরণ করেছে, স্বেচ্ছায় কোনো রোহিঙ্গা ফেরত যেতে রাজি হয়নি। একদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যখন বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আসন্ন বৈঠকে যখন মিয়ানমারের সমালোচনার লক্ষণ সুস্পষ্ট রূপ নিচ্ছে, সেই সময়ে মিয়ানমারের শাসকেরা কূটকৌশলের মাধ্যমে বিশ্বজনমতকে তার অনুকূলে আনার জন্যই এই ধরনের পদক্ষেপে উদ্যোগী হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের ওপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনাও ঘটেছে। ২০১৭ সালের নভেম্বরে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ জেনে অথবা না জেনে মিয়ানমারের কূটচালের ফাঁদে পা দিয়েছে। সম্ভবত এর কোনো বিকল্পও বাংলাদেশের হাতে ছিল না। 

সাম্প্রতিক কালে চীন ও জাপানের পক্ষ থেকে যে ধরনের আচরণ করা হয়েছে, তাতে করে এই ধারণার সৃষ্টি করা হয়েছিল যে তারা মিয়ানমারকে হয়তো রোহিঙ্গা প্রশ্নে কিছু ছাড় দিতে রাজি করিয়েছে। কূটনৈতিক চ্যানেলে বাংলাদেশ সরকারকে এই নিয়ে কোনো রকম প্রতিশ্রুতি বা নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা আমাদের অজ্ঞাত। কিন্তু চীন ও জাপান সমস্যা সমাধানে কিছু একটা করছে, এই রকম ধারণা কোনো না কোনোভাবে প্রচার পেয়েছে—তাদের পক্ষ থেকে সেই ধারণা ভাঙানোর কোনো চেষ্টা করা হয়নি। রোহিঙ্গাদের মৌলিক দাবিগুলো—নিরাপত্তা প্রদান, নাগরিকত্বের স্বীকৃতি এবং গণহত্যার বিচারের ব্যবস্থা—ছাড়া স্বেচ্ছায় রোহিঙ্গারা ফিরে যাবে বলে যাঁরা ভেবেছিলেন, তাঁরা আসলেই সমস্যার মূল বিষয়টি বোঝেন না; এই নিয়ে তাঁরা যত বাক্য ব্যয়ই করুন না কেন, তাতে তাঁদের এই অজ্ঞতা ঢাকা পড়ে না। 

মিয়ানমার এবং তার ঘোরতর সমর্থক চীন সম্ভবত এই আশা করেছিল যে অন্ততপক্ষে যদি ৫০ জনও ফেরত যাওয়ার জন্য পাওয়া যায়, তবে বলা সম্ভব হবে যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে; ফলে এই নিয়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে আলোচনার দরকার নেই। এই ধরনের বক্তব্যে রাশিয়া ও ভারতের সমর্থন এখন আগের চেয়ে বেশি নিশ্চিত। মিয়ানমারের প্রতিরক্ষা প্রধানকে ভারতে লালগালিচা সংবর্ধনা এবং দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা স্মারক স্বাক্ষর তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। সংকটের গোড়া থেকেই চীন-ভারত-রাশিয়া মিয়ানমারের পক্ষে থেকেছে। বাংলাদেশের কূটনীতি তাদের একচুল নড়াতে পারেনি, উপরন্তু জাপান ক্রমাগতভাবে মিয়ানমারের পক্ষেই সরে গেছে। চীনের পরামর্শে করা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি কোনোভাবেই কার্যকর হয়নি। এই দফায় চীনের অদৃশ্য মধ্যস্থতা থেকেও বাংলাদেশ কিছু লাভ করেছে বলে মনে হয় না। উপরন্তু এখন মিয়ানমার সর্বত্র বলতে সক্ষম হবে যে তারা প্রত্যাবাসনে প্রস্তুত ছিল। দ্বিতীয় দফা প্রত্যাবাসনের চেষ্টার ব্যর্থতা বাংলাদেশের গত দুই বছরের কূটনৈতিক ব্যর্থতাকে প্রমাণ করছে তা নয়, কেননা গত দুই বছরে এই নিয়ে বিস্তর আলোচনায় বলাই হয়েছে যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সঠিক হয়নি এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা প্রায় অনুপস্থিত। বন্ধুদের কথিত আশ্বাসে আস্থার কারণ ছিল রাজনৈতিক, বাস্তবসম্মত নয়। ফলে এই ব্যর্থতার বিষয় নতুন নয়। নতুন যা তা হচ্ছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক কমিশন করা হোক, যারা দেখবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অবস্থা কী। বাংলাদেশ সরকারের এই অবস্থানের অর্থ পরোক্ষভাবে এটা মেনে নেওয়া যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির কাঠামোতে ভুল আছে। এই কমিশন করতে চাইলে বাংলাদেশকে সমস্যার আন্তর্জাতিকীকরণ করতে হবে—বাংলাদেশ তা করতে আদৌ প্রস্তুত কি না, সেটাই প্রশ্ন। এই পদক্ষেপ নেওয়ার সময় একবার বাংলাদেশ হারিয়েছে (এ কে এম জাকারিয়া, ‘যাঁরা ভেবেছিলেন রোহিঙ্গারা ফিরবে, প্রথম আলো, ২৯ আগস্ট ২০১৯), সেখানে ফিরে যাওয়ার যে সরু পথ আছে, তা নেওয়া কেবল কূটনীতিকদের কাজ নয়, সেই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক এবং তা বাংলাদেশের বিরাজমান ব্যবস্থায় একমাত্র প্রধানমন্ত্রীই নিতে পারেন। 

দ্বিতীয় বিষয় যেটি সেটি হচ্ছে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিশাল সমাবেশ। ‘গণহত্যার দ্বিতীয় বার্ষিকী’ উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশের আকার এবং তা সংগঠিত করার প্রক্রিয়া থেকে এটা স্পষ্ট যে শরণার্থীরা এখন একটি সংগঠনে সমবেত হয়েছে। এই নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের বাইরে কোনো গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে বিস্তারিত জানার চেষ্টা এখনো দৃশ্যমান নয়। এটা একদিনে হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি, কিন্তু এর ভেতরে ‘ষড়যন্ত্র’ খোঁজার চেষ্টা করা হবে ভয়াবহ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা কোনোরকমের অ্যাজেন্ডার বশবর্তী না হয়ে এই নিয়ে আলোচনা করছেন বলেও মনে হয় না। এই সাংগঠনিক রূপের ইতিবাচক দিক হচ্ছে শরণার্থীদের মধ্যে বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত সংগঠন গড়তে চাইলে এই সংগঠনের নেতারাই তাতে বাধা দেবেন। রোহিঙ্গাদের কার্যক্রমের দায়িত্ব এখন এই সংগঠনের, তারা এটা উপলব্ধি না করে থাকলে তাদের এটা বোঝানো সম্ভব এবং দরকার। ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিষয়ে আলোচনা করতে চাইলে এই সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করাই যথেষ্ট হবে বলেই মনে হয়। শরণার্থীরা তাদের নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার জন্য শরণার্থীশিবিরে রাজনৈতিকভাবে সংগঠন গড়ে তুলেছে, এমন ঘটনা এই প্রথম ঘটল, তা নয়। অন্য দেশে, অন্য সময়ে সেই সব সংগঠনের গতি–প্রকৃতি কী হয়েছিল, আশ্রয়দাতা দেশগুলো কী ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কী ধরনের ভুলভ্রান্তি হয়েছিল, তার শিক্ষা কী—এই সব বিষয়ে পঠনপাঠন করা এখন খুবই জরুরি। মনে রাখা দরকার যে এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু সেটা মোকাবিলা করার নামে যদি ভুল পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে তার পরিণতি হবে মারাত্মক, হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। 

দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে যে তৃতীয় বিষয় সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। কয়েক মাস ধরেই লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে যে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে একধরনের নেতিবাচক ধারণাই প্রচারিত হচ্ছে তা নয়, একধরনের উগ্র যুধ্যমান বিদেশিভীতিও (বেলিজারেন্ট জেনোফোবিয়া) প্রচার করা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ-আশঙ্কা তৈরি করেছে, পরিবেশের জন্য ক্ষতি হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরে চাপ সৃষ্টি করেছে, এগুলো অনস্বীকার্য; কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় শরণার্থী হয়েছে। স্বেচ্ছায় কেউ শরণার্থী হয় না, অন্যের আশ্রয়ে ভবিষ্যৎহীন জীবনযাপন কারও কাঙ্ক্ষিত জীবন মনে করার পেছনে যুক্তি বা উদাহরণ নেই। যাঁরা দুই বছর আগেই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে প্রশংসা করেছিলেন, তাঁরাই এখন যখন জেনোফোবিয়া প্রচার করেন, তখন বুঝতে হয় যে এটির পেছনেও রাজনীতি বিদ্যমান। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য—‘রোহিঙ্গাদের আমরা আর বসিয়ে খাওয়াতে পারব না’—এই ধরনের মনোভাবকে উসকে দেওয়ার উপাদান হিসেবেই কাজ করে। 

২২ আগস্টের পর মিয়ানমারে না ফেরার সব দায় রোহিঙ্গাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা এতটাই প্রকাশ্য হয়ে পড়েছে যে এটাকে উদ্বেগজনক বলেই বিবেচনা করা উচিত। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত না যাওয়ার প্রথম এবং প্রধান দায় মিয়ানমারের; যখনই এই জন্য রোহিঙ্গাদের দায়ী করা হচ্ছে, তখন আসলে মিয়ানমারের যুক্তিকেই বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। যদি কেউ গণহত্যাকারী মিয়ানমারের সরকারের পক্ষে দাঁড়াতে না চান, তবে তাঁর পক্ষে এই জন্য রোহিঙ্গাদের দোষারোপ করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, গত দুই বছরে বাংলাদেশ কেন তার মিত্র এবং বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে এর সুরাহার পথে কার্যকর অগ্রগতি করতে সক্ষম হয়নি, সেই প্রশ্ন না তুলে নির্যাতিতদের ওপরে দায় চাপিয়ে দেওয়ার পেছনে কি নিজ দেশের প্রতি ভালোবাসাই একমাত্র কারণ? 

উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং বিদেশিভীতি (জেনোফোবিয়া) একে অপরের পরিপূরক, দেশে দেশে সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। এই ধরনের প্রচারণা শেষ পর্যন্ত কেবল ‘শত্রু’ তৈরি করে। এই বিপদের দিকে দেশকে ঠেলে দেওয়ার আগেই সচেতন এবং সক্রিয় হওয়া দরকার। 

আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন