default-image

কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী ৮ ও ৯ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দীর্ঘ ছয় ঘণ্টার অগ্নিকাণ্ডে নিভে গেছে ১১টি প্রাণ। ঘর পুড়েছে তিন হাজারের বেশি। বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সবচেয়ে বড় মার্কেট বলিবাজারে ৫০ কোটি টাকার মালামাল পুড়েছে। ক্যাম্পের ঝুপড়িগুলোর মালামালও ভস্মীভূত হয়েছে। পুড়েছে ৪ নম্বর এপিবিএনের পুলিশ ব্যারাক, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এনজিওর অফিসও। বাস্তুহারা রোহিঙ্গারা কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কে আশ্রয় নিয়েছে।

আগুন কীভাবে লাগল, কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। রোহিঙ্গাদের দেওয়া একজনের তথ্যের সঙ্গে আরেকজনের কোনোই মিল নেই। বাংলা ট্রিবিউন লিখেছে, ‘এমনকি রোহিঙ্গারাই একে অপরকে দোষারোপ করছে।’ আগুন লেগেছে, নাকি লাগানো হয়েছে—এমন প্রশ্ন তোলাটা এই মুহূর্তে মানবিক হবে না। আমরা সন্দেহ করতে চাই না। মানুষগুলোর মহাবিপদ। দ্রুত যা যা করা দরকার, আন্তর্জাতিক সাহায্য–সহযোগিতা নিয়ে হলেও সব নিয়ে এগিয়ে আসাটাই জরুরি। কিন্তু এই একটি অগ্নিকাণ্ড যে এক ভয়াবহ সামাজিক দুর্যোগ বয়ে আনতে পারে, সেই আশঙ্কাটি বিস্মৃত হলেও চলবে না।

বিজ্ঞাপন

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর কোনোটিতে একবার আগুন লাগলে বড়সড় মানবিক বিপর্যয় হবে—এই ভয় সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি-আন্তর্জাতিক কর্মী বাহিনীর সবার মধ্যেই ছিল। ২০১৮ সালের শুরু থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ক্যাম্পে আগুন প্রতিরোধের ব্যবস্থায় সহায়তা করার অনুরোধ পেতে থাকে। ২০১৮ সালের ২২ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ইউরোপীয় ইউনিয়নকে একটি অনুরোধ করে। ক্যাম্পগুলোতে দুর্যোগ প্রস্তুতি, প্রতিরোধ এবং কার্যকর মোকাবিলায় ইমার্জেন্সি ও রেসপন্স কো-অর্ডিনেশন সেন্টার যেন সহায়তা দেয়।

ইউরোপীয়রা দেরি করেনি। ইতালি, সুইডেন এবং যুক্তরাজ্যের তিনজন বিশেষজ্ঞ দুই সপ্তাহের একটি মিশনে ২০১৮ সালের ৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশে আসেন। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ও উন্নয়ন সংস্থা, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ও ক্যাম্পগুলোর দায়িত্বে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে মাঠ-জরিপ, আলোচনা, কর্মশালা—সবই করে। ক্যাম্পের একটি অংশে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ফায়ার ড্রিলও করে। ইউরোপীয় কমিশনের অর্থায়নে এই প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যমান অগ্নিদুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ও কৌশলকে কীভাবে আরও কার্যকর ও সঠিক করা যায়, সেই পরামর্শ দেওয়া। ২১ ডিসেম্বর চূড়ান্ত সভায় বিশেষজ্ঞরা ২৯টি পরামর্শও দেন। তিন পর্যায়ের দুর্যোগ-সাড়াদানের একটি ছকও তৈরি করে দেওয়া হয়।

ক্যাম্পগুলোতে আগুন লাগলে কী কী কারণে নেভানো খুবই কষ্টসাধ্য হবে, তার একটা তালিকাও বিশেষজ্ঞরা দেন। যেমন স্যাটেলাইট ফায়ার স্টেশন তখনো কার্যকর না থাকা (দুটি ক্যাম্পের প্রস্তাব রাখা হয়েছিল), অগ্নিনির্বাপণ গাড়ি ঢুকতে না পারা, স্যাটেলাইট ফায়ার স্টেশনে যন্ত্রপাতি-সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত কর্মী না থাকা, ফায়ার এক্সটিংগুইশারসহ অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহারোপযোগী না থাকা, প্রতিদিন নিয়মিত দাহ্য পদার্থ পরীক্ষা না করা, নির্বাপণকর্মী চাকুরে না থাকা, নতুন সরঞ্জাম থাকলেও নির্বাপণকর্মীদের প্রশিক্ষিত না রাখা, পানিস্বল্পতা, নির্বাপণ-দক্ষতার ছক (কম্পিটেন্সি ফ্রেমওয়ার্ক) না থাকা এবং আগুন বাগে আনার জন্য গমন-বহির্গমনের সবচেয়ে মোক্ষম পথগুলোর কোনো মানচিত্র না থাকা ইত্যাদি। ২৯টি পরামর্শ এবং বিশেষজ্ঞদের চেষ্টায় অগ্রগতি কত দূর কী হয়েছে, এখন হয়তো সাংবাদিকেরা এবং এনজিওসহ সাধারণ নাগরিকেরা সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নামবেন।

বিজ্ঞ পরামর্শক ও বিশেষজ্ঞরা বুঝতে এবং পরামর্শ দিতে নিশ্চয়ই ভুল করেননি। এমনকি তাঁরা সরু পথে কোন যানবাহন ব্যবহার করে অগ্নিনির্বাপণ করা যাবে, সেই ভাবনাও করেছেন। একটি উদাহরণ, অগ্নিনির্বাপক মোটরসাইকেল বহর ব্যবহার করার বুদ্ধিদীপ্ত পরামর্শ। তাঁরা উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কথা বলতেও ছাড়েননি। যেমন জিপিএস ব্যবহার, ড্রোন এবং হেলিকপ্টার দিয়ে আগুনের গতিবিধি পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া ইত্যাদি। এগুলো অনেক সময় উলুবনে মুক্তা ছড়ানোর মতো বিষয়।

সব ক্ষেত্রে কৃৎকৌশল যে কার্যকর হয় না, অনেক সময় বিশেষজ্ঞরা সত্যটি মানেন না। বিশেষজ্ঞরা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, বনে আগুন লাগার যে পরিণতি হয়, ক্যাম্পগুলোতে একই ধরন লক্ষ করা গেছে। উন্নত দেশে বনে আগুন লাগলে হেলিকপ্টারে ওপর থেকে পানি এবং রাসায়নিক নির্বাপক-পাউডার ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের জন্য সেটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে ভেবে হয়তো তাঁরা সেই পরামর্শটিই দেননি। কিন্তু বাংলাদেশের বস্তি, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের গা-লাগোয়া ঝুপড়ি এবং বড় শহরগুলোর গা লাগোয়া সুউচ্চ দালানের অবস্থান বিবেচনায় বলা যায়, যত খরচই হোক, বাংলাদেশকে একসময় নির্বাপণ হেলিকপ্টারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি ভাবতেই হবে।

পরামর্শক দলে সম্ভবত কোনো যোগ্য সমাজবিজ্ঞানীই ছিলেন না। কৃৎকৌশলগত দক্ষতার চেয়ে রোহিঙ্গা সমস্যা অনেক বড় সামাজিক ও মানবিক সমস্যা। আগুন লাগা-নেভাও মোটেই ব্যতিক্রম নয়। আগুন লাগলে যে ভৌত ক্ষতি হবে, তার চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি হবে সামাজিক ক্ষতি। কক্সবাজার টেকনাফ মহাসড়কে যে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে, তাদের অনেকেই ক্যাম্পে আর না-ও ফিরতে পারে। পালিয়ে যেতে পারে। শিশু-কিশোরী-তরুণীরা মানব পাচারকারী এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচারকারীদের শিকারে পরিণত হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

ক্যাম্পে মিয়ানমার সরকারের কিছু গুপ্তচরের রোহিঙ্গা ছদ্মবেশে বসবাসের জোরালো কানাঘুষা আছে। আছে বিভিন্ন কর্তৃত্ববাদী দল-উপদল। ধর্মের নামে-বেনামে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি এবং সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়ার নয়। তারা পরিস্থিতিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য অগ্নিকাণ্ডকে যে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, সেই আশঙ্কা অগ্নি-দুর্যোগ ব্যবস্থাপকেরা ভাবনায়ও নেননি। নেওয়ার কথাও নয়, যদি না তাঁদের সামাজিক বাস্তবতা মাথায় রাখার পরামর্শটি আগেভাগেই দিয়ে রাখা হয়। রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরে যেতে না দেওয়ার কতশত চেষ্টাই না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তাদের তো নিশ্চয়ই ভাববার কথা, একবার আগুন লাগলে এসব নিয়ন্ত্রিত দুর্গ তাসের দেয়ালের মতো ভেঙে পড়বে। এবারের অগ্নিকাণ্ডের পর নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বুঝবেন, চলতি নিয়ন্ত্রণ-পদ্ধতি কতটা ‘বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো’।

স্থানীয় অধিবাসী ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে শত্রুতা, বিদ্বেষ, সংঘর্ষের সম্ভাবনা প্রভৃতি বিস্ফোরক রূপ নিয়েই আছে। বড়সড় বিস্ফোরণ শুরু হবে রোহিঙ্গাদের লোকালয়ে প্রবেশের এবং সমাজে মিশে যাওয়ার চেষ্টার মাধ্যমে। চুরি-ডাকাতি-রাহাজানিতে জড়াক বা না জড়াক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হলেও রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বাড়বেই। সেটি থেকে গণপিটুনি, জীবনহানি, অঙ্গহানি ও নানা রকম সংঘর্ষ উত্তরোত্তর বাড়তে পারে। এসব কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অগ্নিকাণ্ডনিরোধী প্রস্তুতি ও সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নইলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আগুন বাইরেও লাগবে।

ড. হেলাল মহিউদ্দীন অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান। সদস্য, সিপিএস, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন