বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কয়েক দশকের সশস্ত্র ক্ষয়ক্ষতি শেষে মিজোরাম এ মুহূর্তে উত্তর-পূর্ব ভারতের সবচেয়ে শান্তির জায়গা, আর জোরামথাঙ্গা সেখানে তৃতীয়বারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আছেন। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অনেক গেরিলা সংগঠক অস্ত্র ছেড়ে রাজনীতিতে এসেছেন অতীতে। জোরামথাঙ্গা সেই তালিকাতেও ব্যতিক্রম। সাধারণ রাজনীতিবিদদের চেয়েও অধিক শান্তিবাদী তিনি। আইজলে এমএনএফের দপ্তরে গান্ধীর ছবিও আছে। শান্তির জন্য প্রকাশ্যে এবং পর্দার আড়ালে নানাভাবে ভূমিকা রাখেন ও রাখতে আগ্রহী দেখা যায় জোরামথাঙ্গাকে। ঢাকাও চাইলে সেই সুযোগ নিতে পারে বৈকি।

যাঁর কাছে ঢাকা-চট্টগ্রাম অতি চেনা জনপদ

উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজনীতিবিদদের মধ্যে জোরামথাঙ্গাই সম্ভবত ঢাকা, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভালো জানেন। এসব এলাকার অন্তত ৫০ বছর আগের বর্ণনা ভালোই দিতে পারবেন তিনি। ১৯৭২ সালের আগে ঢাকা ও পার্বত্য চট্টগ্রামে দুই দফায় এমএনএফের দপ্তর ছিল, এটা এখন ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে আর লুকিয়ে রাখা হয় না। বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় লালডেঙ্গা ও জোরামথাঙ্গা প্রথমে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম; তারপর পালিয়ে প্রথমে আকিয়াব এবং পরে তৃতীয়-চতুর্থ বহু দেশে থেকেছেন। শিগগির প্রকাশিত জোরামথাঙ্গার দুই খণ্ডের আত্মজীবনীতে হয়তো ঢাকা ও চাটগাঁয়ের আরও বিস্তারিত বিবরণ আমরা পাব। সেসব তিনি বলবেন মিজো নতুন প্রজন্ম এবং দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসচর্চার অংশ হিসেবে। আজকের প্রশাসনিক অবস্থানের সঙ্গে ইতিহাসচর্চাকে মেলাতে চান না আর এই মিজো-মুরব্বি।

কেন জোরামথাঙ্গা ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ

ভারতের সবচেয়ে কম জনসংখ্যার রাজ্যগুলোর একটা মিজোরাম। মাত্র ১০ থেকে ১১ লাখের মতো মানুষ আছে বনাঞ্চলময় এই রাজ্যে। তবে ছোট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হলেও ৭৭ বয়সী জোরামথাঙ্গার বাড়তি গুরুত্ব মেনে চলে উত্তর-পূর্ব ভারতের সবাই; এমনকি নয়াদিল্লিও। ভারত-মিয়ানমারসহ আশপাশের সব জনপদের বিভিন্ন জনজাতি এবং সেসব জায়গার গেরিলাদের সম্পর্কে জোরামথাঙ্গার অভিভাবকসুলভ জানাশোনা আছে বলে মনে করা হয়। নিজে তিনি কোনো অবস্থাতেই সশস্ত্র আন্দোলনে ফিরতে চান না। কিন্তু মিজো জনপদের চারদিকে বহুদূর পর্যন্ত জোরামথাঙ্গার রাজনৈতিক প্রভাব আঁচ করা যায়। তাঁর এই দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের কদর করে অনেকে। প্রয়োজনমতো সাহায্য নেয়। বাংলাদেশও এ সুযোগ নিতে পারে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ও আরাকান প্রশ্নে।

বাংলাদেশকে কীভাবে তিনি সাহায্য করতে পারেন

বাংলাদেশ-মিজোরাম সীমান্ত দৈর্ঘ্য ২০০ মাইলের কম। কিন্তু তা দিয়ে জোরামথাঙ্গার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার হিসাব-নিকাশ করলে ভুলই হবে। বরকলের ছোট হরিণা বা ঠেগামুখ দিয়ে সেতু করে বাণিজ্য বাড়ানোর গতানুগতিক চিন্তা থেকে এ সম্পর্ক অনেক বড় কিছু দিতে সক্ষম বাংলাদেশকে।

সাবেক এই গেরিলা নেতার ব্যক্তিগত একটা শক্তির জায়গা হলো মিজোরামের সীমান্তের বাইরেও তিনি রাজনৈতিক ভূমিকা রাখতে সমর্থ এবং রাখেন। বিশেষ করে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী তাতমাদাসহ ওদিকের সব গেরিলা দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ঐতিহ্য আছে তাঁর। আরাকান আর্মি (এএ) বা চীন ন্যাশনাল আর্মির গেরিলাদের সঙ্গে তাতমাদার বিবাদে মধ্যস্থতাকারীর হিম্মত দেখান তিনি। ভারতের কেউ মিয়ানমারে অপহৃত হলে উদ্ধার করে দিতে পারেন দায়িত্ব নিয়ে। উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যান্য গেরিলা গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও জোরামথাঙ্গার একই রকম প্রভাব অনুমান করা হয়।

বান্দরবান ও মিজোরামের পাশে মিয়ানমারে চিন স্টেট ও উত্তর আরাকানের পালেতওয়া, থানতালাং, মংডু, বুথিডং, রাথিডং ইত্যাদি অঞ্চলে ইতিমধ্যে আরাকান আর্মির ব্যাপক সশস্ত্র উপস্থিতি ঘটে আছে বলে অনেকেরই পর্যবেক্ষণ। অথচ শেষের তিনটি এলাকার প্রধান এক জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা সমাজ; উদ্বাস্তু হয়ে যারা প্রত্যাবর্তনের প্রত্যাশায় আছে কক্সবাজার ও বান্দরবানে। স্বভাবত উত্তর আরাকান ও আকিয়াবে রোহিঙ্গাদের ফিরতে হলে তাতমাদার অনুমতির পাশাপাশি আরাকান আর্মির সদয় সহযোগিতা লাগবে। অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনার সুযোগ নেই। অথচ রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের স্বার্থে এ রকম যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তার কথা দেশে-বিদেশে অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করছেন অনেকে।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন প্রশ্নে বাংলাদেশের সে রকম মরিয়া প্রচেষ্টায় জোরামথাঙ্গার ভূমিকা যাচাইয়ের সুযোগ আছে। আঞ্চলিক শান্তির স্বার্থে ভারতের পটভূমিতে প্রায়ই তাঁকে সাহসী, স্বতন্ত্র ও স্বাধীন রাজনৈতিক ভূমিকা নিতে দেখা যায়।

আরাকান প্রশ্নে বিকল্প পথ খোঁজা যে কারণে জরুরি

আরাকানের পরিস্থিতি গত এক বছরে নাটকীয়ভাবে অনেক বদলে গেছে এবং আরও যাবে। অথচ ওখানকার ১০ থেকে ১২ লাখ মানুষ বাংলাদেশে। এসব মানুষকে ফেরত পাঠানোর জন্য চীন-ভারতসহ বহু আন্তর্জাতিক হেভিওয়েটের ভূমিকা দেখেছে বাংলাদেশ। তাতমাদাকে চটিয়ে তারা রোহিঙ্গা স্বার্থে আপাতত কিছু করতে পারছে না। এ সময় দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে কিছু ছোটখাটো অনুঘটকের সহায়তা নেওয়ার সময় হয়েছে। এ রকম প্রথাভাঙা বিবেচনায় বাংলাদেশের হাতে অন্তত দুটি উপায় স্পষ্ট দেখা যায়। একটা হলো বাংলাদেশের রাখাইন রাজনীতিবিদ ও গোষ্ঠীপ্রধানদের সঙ্গে আরাকানের যোগাযোগ তৈরি। এএর সঙ্গে তারা ভালোভাবেই আলাপের সূচনা ঘটাতে সক্ষম। দ্বিতীয় বিকল্প হতে পারেন বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে জোরামথাঙ্গা। এমনও হতে পারে, এএও অনানুষ্ঠানিক এসব মতবিনিময়কে স্বাগত জানাবে এবং ভারতেরও নীরব সায় থাকবে তাতে; যেহেতু নয়াদিল্লিও চায় রোহিঙ্গারা দ্রুততম সময়ে আরাকানে ফিরুক।

আঞ্চলিক শান্তির স্বার্থে এবং স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনে অহিংস আলাপ-আলোচনার বিকল্প নেই। তাতমাদার সঙ্গে এএর বিধ্বংসী যুদ্ধ দেখেছে সবাই গত বছর। অথচ এখন আরাকান বিস্ময়করভাবে শান্ত। রাষ্ট্রীয় বনাম অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র শক্তি হয়েও তাতমাদা এবং এএ এখন এত বেশি আলাপ-আলোচনা ও লেনদেনে মত্ত, যা রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের আঁচ-অনুমান ছাড়িয়ে গেছে। কূটনীতির জগৎটি এখন এভাবেই আঞ্চলিক জাতীয় স্বার্থে আচ্ছন্ন। পুরোনো, গৎবাঁধা, একরোখা, দীর্ঘস্থায়ী কোনো অবস্থানের চেয়ে নমনীয়, নিজস্ব স্বার্থতাড়িত সতত পরিবর্তনযোগ্য অবস্থান বেশি কার্যকর।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন প্রশ্নে বাংলাদেশের সে রকম মরিয়া প্রচেষ্টায় জোরামথাঙ্গার ভূমিকা যাচাইয়ের সুযোগ আছে। আঞ্চলিক শান্তির স্বার্থে ভারতের পটভূমিতে প্রায়ই তাঁকে সাহসী, স্বতন্ত্র ও স্বাধীন রাজনৈতিক ভূমিকা নিতে দেখা যায়। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ভারতের সীমান্ত বন্ধের আহ্বানের মধ্যেও মিজোরামে মিয়ানমারের তাতমাদাবিরোধী গণতন্ত্রপন্থীদের আশ্রয় দেওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। এ রকম পদক্ষেপের যৌক্তিক ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। সম্প্রতি স্থলবেষ্টিত মিজোরাম আসামের সঙ্গে দ্বন্দ্বে পণ্য সরবরাহে বিপদে পড়ে। তখন জোরামথাঙ্গা হুমকি দিয়েছিলেন, আসাম অবরোধ তুলে না নিলে তিনি বাংলাদেশের সহায়তা চাইবেন। আপাতত এ রকম ‘হুমকি’ দর-কষাকষির অংশ হলেও মিজো মুখ্যমন্ত্রীকে বাংলাদেশ যে আরও কাছে পেতে পারে, তার আরও প্রমাণ আছে।

আসামের বাসিন্দাদের সঙ্গে মিজোদের বিরোধের মুখে গত বছরের অক্টোবরেও জোরামথাঙ্গা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বাড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। মিয়ানমারের সঙ্গে এ রকম যোগাযোগ তিনি একাই ভালোভাবে করতে সমর্থ। আর বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কতটা বিকশিত হতে পারে, সেটা ঢাকার চাওয়া-পাওয়ার ওপরই অনেকখানি নির্ভর করে। উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্য যেকোনো মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ এই মিজো নেতার কাছ থেকে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক সহায়তা পাওয়ার যে নীরব সম্ভাবনা আছে, সেই অধ্যায়ের ভালো সূচনা হতে পারে তাঁকে বাংলাদেশে স্বাগত জানিয়ে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, এ রকম স্পর্শকাতর দায়িত্ব নিয়ে মিজো মুখ্যমন্ত্রীর লাভ কী। এর উত্তর কঠিন নয়। বাংলাদেশ ঝুঁকিমুক্ত হলে মিজোরামের চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারে অনায়াসে। জোরামথাঙ্গার চেয়ে আর ভালো কে বুঝবেন এটা।

আলতাফ পারভেজ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ের গবেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন